যাঁর পরিচয় তৈরি হয়েছিল কর্তৃত্ব, সাফল্য আর নিয়ন্ত্রণ দিয়ে—গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে আলাদা কিসিমের এক সহনশীলতা। এখানে জয় মানে ট্রফি নয়। বেঁচে থাকা।

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন
শেষ আপডেট: 31 December 2025 18:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন (Sir Alex Ferguson) ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সমর্থকদের কাছে কর্তৃত্বের প্রতীক। টাচলাইনে দাঁড়িয়ে যাঁর চোখের চাহনিতেই বদলে যেত ম্যাচের গতি। কিন্তু ২০১৩ সালে অবসরের পর ফুটবল যেসব পরীক্ষা কখনও নিতে পারেনি, জীবন সেসবই সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
হঠাৎ বিপর্যয়: ব্রেন হেমোরেজ
২০১৮-র মে মাস। আচমকাই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। জরুরি অস্ত্রোপচার না হলে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব ছিল না। স্যালফোর্ড রয়্যাল হাসপাতালে পৌঁছনোর সময় চিকিৎসকদের ধারণা—বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা মাত্র ২০ শতাংশ। পরে ২০২১–এর ডকুমেন্টারি ‘নেভার গিভ ইনে’ (Never Give In) স্যার অ্যালেক্স বলেছিলেন, ‘সেদিন পাঁচ জনের ব্রেন হেমোরেজ হয়েছিল। তিন জন বাঁচেননি। দু’জন বেঁচে যান। বুঝতে পারেন, আপনি ভাগ্যবান।’
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মনে হয়েছিল—আর কবে রোদ্দুরের দিন দেখবেন? সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। সুস্থ হওয়ার পথে এক সময় কথা বলার ক্ষমতাও প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলেন। ‘কথা বেরোচ্ছিল না। চেষ্টা করছিলাম, পারছিলাম না। কেঁদে ফেলেছিলাম—নিজেকে অসহায় লাগছিল!’ মন্তব্য অ্যালেক্সের।
সেদিন বাড়িতে লুটিয়ে পড়ার মুহূর্তে একাকিত্ব আর মৃত্যুভয়ের অনুভূতিও গ্রাস করেছিল তাঁকে। বলেন, ‘একলা হলে ভয়টা ঢুকে পড়ে। আপনি মরতে চান না। এই ভাবনাগুলো মাথায় এসেছিল!’
জীবনের স্তম্ভ ভেঙে যাওয়া: ক্যাথির বিদায়
শরীর সেরে উঠলেও ব্যক্তিগত জীবনে আঘাত আসে আরও বড়। ২০২৩–এর শেষ দিকে প্রয়াত হন তাঁর ৫৭ বছরের সঙ্গী ক্যাথি ফার্গুসন (Cathy Ferguson)। স্যার অ্যালেক্স যাঁকে বলতেন তাঁর জীবনের ‘বেডরক’। ১৯৬৪ সালে টাইপরাইটার কারখানায় কাজ করতে গিয়ে আলাপ, দু’বছর পর বিয়ে। ক্যাথি ছিলেন সেই মানুষ, যাঁর কথার উত্তর তিনি কখনও দেননি—হেয়ারড্রায়ার ট্রিটমেন্টের জন্য বিখ্যাত একজন ম্যানেজারের ক্ষেত্রে যা বিস্ময়কর। এমনকি ২০০২ সালে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত বদলাতেও বড় ভূমিকা ছিল তাঁর।
ক্যাথির মৃত্যুর পর স্যার অ্যালেক্স স্বীকার করেন—বাড়ি ছাড়তে পারছিলেন না। শোক কাটাতে বেরিয়ে পড়েন ভ্রমণে—সৌদি আরব, হংকং, বাহরিন। ফিরে এসে ডিমেনশিয়া সাপোর্ট গ্রুপে যোগদান। পরে বিক্রি করে দেন ৩.২৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বাড়ি। এখন থাকেন গুসট্রি গ্রামে, ছেলে ড্যারেনের পাশের বাড়িতেই।
ইউনাইটেডের সঙ্গে দূরত্ব, তবু সম্পর্ক অটুট
ম্যানেজমেন্ট ছেড়ে দিলেও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (Manchester United) কখনও তাঁর জীবন থেকে সরে যায়নি। আজও নিয়মিত ম্যাচ দেখেন, ডিরেক্টরস বক্সে বসে। তবে গত বছর ক্লাব অ্যাম্বাসাডর হিসেবে তাঁর পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ভূমিকায় ইতি টানা হয়—খরচ কমানোর সিদ্ধান্তে। ক্লাবের নতুন আংশিক মালিক জিম র্যাটক্লিফ (Jim Ratcliffe) ও তাঁর সংস্থার (INEOS) অধীনে নেওয়া হয় একাধিক কঠোর সিদ্ধান্ত। বছরে প্রায় ২০ লক্ষ পাউন্ড পারিশ্রমিক পেতেন স্যার অ্যালেক্স।
র্যাটক্লিফ নিজেই জানান, প্রথমে ‘একটু গম্ভীর’ ছিলেন স্যার অ্যালেক্স। কিন্তু তিন দিন পর ফিরে এসে বলেন, ‘আমি সরে যাচ্ছি। এটা আমার সিদ্ধান্ত।’ র্যাটক্লিফের কথায়, ‘ক্লাবকে নিজের আগে রেখেছেন—এটাই অ্যালেক্স।’
টাচলাইনের বাইরে সবচেয়ে বড় জয়
যাঁর পরিচয় তৈরি হয়েছিল কর্তৃত্ব, সাফল্য আর নিয়ন্ত্রণ দিয়ে—গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে আলাদা কিসিমের এক সহনশীলতা। এখানে জয় মানে ট্রফি নয়। বেঁচে থাকা। প্রিয় মানুষকে হারিয়ে সামনে এগোনো। ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে শেখা। সমর্থকদের চোখে চিরকালই টাচলাইনের সেই অদম্য অবয়ব। কিন্তু হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইগুলো তিনি জিতেছেন ক্যামেরার আড়ালে—অসুখের বিরুদ্ধে, শোকের ভেতর দিয়ে… নিঃশব্দ দৃঢ়তায়।