রাজনীতি সব সময় বেজায় গোলমেলে। কিন্তু ভুললে চলবে না, কখনও কখনও একটি ম্যাচ বলই সবচেয়ে নিখুঁত পাস বাড়িয়ে দিয়ে দিতে পারে।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 30 January 2026 14:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজনীতির মঞ্চে কথাবার্তা সাধারণত ভারী থেকে অতিভারী হয়ে থাকে। শব্দে বোনা কূটনৈতিক চাল, বাক্যে গোনা হিসেব।
কিন্তু কখনও কখনও একটি সাধারণ, নগণ্য জিনিস—হতে পারে সেটা ফুটবল—সমস্ত হিসেব ভেঙে দেয়। এ সপ্তাহে বেজিংয়ে ঠিক সেটাই হল। আট বছর পর প্রথমবার চিন সফরে গিয়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার (Keir Starmer) চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের (Xi Jinping) হাতে তুলে দিলেন একটি প্রিমিয়ার লিগ বল। যা গড়িয়েছে আর্সেনাল (Arsenal) বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (Manchester United) ম্যাচে, আপাতত উড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার মাইল দূর লন্ডন থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উপহার নিছক সৌজন্য নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আধুনিক কূটনীতির নতুন ভাষা—‘সফট পাওয়ার’। যেখানে কঠিন রাজনৈতিক মতপার্থক্যের আগে জায়গা পায় সংস্কৃতি, খেলা আর আবেগ।
ছোট বল, বড় বার্তা: ফুটবল দিয়ে বরফ গলানোর কৌশল
আন্তর্জাতিক বৈঠকে ‘আইস ব্রেকার’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে প্রথম কয়েক মিনিটে যদি সম্পর্কের সুরটা ঠিক না বাঁধে, তাহলে পরের কঠিন আলোচনা হয়ে ওঠে আরও জটিল। এই জায়গাতেই ফুটবলকে কাজে লাগাল ব্রিটেন।
রিপোর্ট বলছে, রবিবার এমিরেটস স্টেডিয়ামে হওয়া আর্সেনাল–ম্যান ইউ ম্যাচে হাজির ছিলেন স্টারমার নিজে। তিনি যে আর্সেনালের আজীবন সমর্থক, সেটাও নতুন নয়। সেই ম্যাচের হলুদ পুমা বল—খেলোয়াড়দের সই করা—তিনি নিয়ে যান বেজিংয়ে। শি জিনপিং যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বড় ভক্ত, জানতেন বিলক্ষণ!
ফলে মুখোমুখি সাক্ষাতে যা হওয়ার তাই হল! রাজনৈতিক টানাপড়েনের আবহে দু’জন রাষ্ট্রনেতার সামনে ভেসে উঠল এক টুকরো ফুটবল ইতিহাস। মাঠের লড়াইয়ের স্মৃতি দিয়ে শুরু হল বৈঠক। বিতর্কিত ইস্যুর আগে মিল খুঁজে নেওয়ার এক স্মার্ট চেষ্টা!
.@aguerosergiokun: "Thank you for the selfie, President Xi" 感谢能与您自拍,习主席!#CFAStateVisit pic.twitter.com/4du2zIaacY
— Manchester City (@ManCity) October 23, 2015
যদিও ইতিহাস লিখিয়েরা বলছেন, এই কৌশল নতুন নয়। কিন্তু এত প্রতীকী কায়দায় প্রিমিয়ার লিগকে (Premier League) ব্যবহার—এই বৈঠককে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। একটা নিরেট বল। অথচ ভেতরে নিহিত স্পষ্ট বার্তা: ‘আমাদের মতপার্থক্য আছে, কিন্তু আমরা কথা বলতে পারি… অন্তত খেলাকে কেন্দ্র করে।’
শি জিনপিং আর ইংলিশ লিগের পুরনো সম্পর্ক
শুধু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড নয়—এই সফরে স্টারমার শুনে অবাক হয়েছেন, শি জিনপিং আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City) এবং ক্রিস্টাল প্যালেস (Crystal Palace) নিয়েও নাকি সমানভাবে আগ্রহী। পেছনে লুকনো রয়েছে ইতিহাস। এর আগে ম্যানচেস্টার সফরের সময় তিনি ঘুরে দেখেন এতিহাদ ক্যাম্পাস। দেখা করেন ক্লাব চেয়ারম্যান খালদুন আল মুবারকের (Khaldoon Al Mubarak) সঙ্গে। এমনকি ফুটবল জাদুঘরেও যান। সেই সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হয় তদানীন্তন কোচ ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি (Manuel Pellegrini), অধিনায়ক ভিনসেন্ট কোম্পানির (Vincent Kompany) সঙ্গে।
আর ক্রিস্টাল প্যালেস? তার গল্প আরও প্রাচীন। ১৯৯৮ সালে সান জিহাই (Sun Jihai) আর ফান ঝিয়ি (Fan Zhiyi)— দুই চিনা ফুটবলার লন্ডনের ক্লাবের হয়ে খেলতে নামেন। তখনকার দিনে এমন ঘটনা ঐতিহাসিক! তাঁদের প্রথম ম্যাচ নাকি চিনে বসে দেখেছিল প্রায় ৩০ কোটি মানুষ! এই সূত্র ধরে ইংল্যান্ডের ফুটবল ধীরে ধীরে চিনা জনমানসে জায়গা করে নেয়। একের পর এক ইংলিশ ক্লাবে আসতে থাকে বিনিয়োগ। ম্যান সিটির মূল সংস্থা সিটি ফুটবল গ্রুপে (City Football Group) সে দেশের মিডিয়া গ্রুপের শেয়ার কেনা—সবই প্রবলম্বিত ধারাবাহিকতার অংশ।
ফলে স্টারমার যখন ফুটবল নিয়ে কথা তোলেন, সেটা শি জিনপিংয়ের কাছে একেবারেই অপরিচিত প্রসঙ্গ ছিল না। বরং, পুরনো স্মৃতির দরজা হাট করে খুলে দেয়।
প্রিমিয়ার লিগ: ব্রিটেনের উজ্জ্বল অস্ত্র
এবারের সফরে ব্রিটেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী প্রায় ৬০ জনের এক প্রতিনিধি দল। জানা গিয়েছে, সেই টিমে জায়গা পেয়েছেন প্রিমিয়ার লিগের কর্তাব্যক্তিদের কেউ কেউ। ২০২৪ সালে বেজিংয়ে প্রিমিয়ার লিগের অফিস খোলা যে নিছক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, বরং কৌশলগত পদক্ষেপ ছিল—এ প্রসঙ্গে তা মনে রাখাটা জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রিমিয়ার লিগ, ব্রিটেনের অন্যতম বড় ‘এক্সপোর্ট ব্র্যান্ড’, সম্প্রচারস্বত্ব থেকে শুরু করে ক্লাবের জনপ্রিয়তা—সব মিলিয়ে এটি এমন এক সাংস্কৃতিক পণ্য যে রাজনীতির কঠিন দরজাও খুলে দিতে পারে—প্রমাণ করলেন স্টারমার।
সত্যি বলতে বাণিজ্য আলোচনা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি—এই সব জটিল ইস্যুর মাঝখানে ফুটবল একটা ‘নিরাপদ কমন গ্রাউন্ড’। যেখানে জাতীয়তাবাদ কম, আবেগ বেশি। তাই ব্রিটিশ সরকার আগেও বিদেশ সফরে প্রিমিয়ার লিগকে সামনে এনেছে। চিন সফরে সেটা আরও স্পষ্ট। একটা ম্যাচ বল দিয়ে বোঝানো হল, ব্রিটেন শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়—সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী। চিনের মতো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক মসৃণ করতে এই ‘সফট পাওয়ার’অনেক সময় ‘হার্ড পলিটিক্সে’র চেয়েও বেশি কার্যকরী!
শেষ পর্যন্ত হয়তো কোনও চুক্তি সই হল, কোনওটা হল না। কিন্তু ইতিহাসে থেকে যাবে এই দৃশ্য—গ্রেট হল অফ দ্য পিপল-এ দাঁড়িয়ে দুই রাষ্ট্রনেতা, মাঝখানে অদৃশ্য সুতোয় ঝুলছে ফুটবল। রাজনীতি সব সময় বেজায় গোলমেলে। কিন্তু ভুললে চলবে না, কখনও কখনও একটি ম্যাচ বলই সবচেয়ে নিখুঁত পাস বাড়িয়ে দিয়ে দিতে পারে।