ফর্মের হিসেব মিলিয়ে কেউ বলবেন, লিডস রেলিগেশন বাঁচলেই খুশি। কেউ আবার খোলাখুলি জানাচ্ছেন—এই সিজন সফল হবে যদি ইউনাইটেডকে হারানো যায়।

ছবি: গুগল
শেষ আপডেট: 4 January 2026 14:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইংল্যান্ডে ফুটবলের ময়দানে একগাদা ডার্বি। উত্তর লন্ডন, ম্যানচেস্টার, মার্সিসাইড—সবই পরিচিত। কিন্তু লিডস ইউনাইটেড বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড—এই লড়াই এতশত ডার্বির ভিড়ে আজও আলাদা। উত্তেজক দ্বৈরথ কালের চক্রেও এতটুকু জৌলুস হারায়নি। বিশ্লেষকরা এর রহস্য উদ্ধারে জানিয়েছেন, এই সংঘাতে শুধু ফুটবল নেই। আছে স্মৃতি, ক্ষত, রাগ, ঈর্ষা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমে থাকা তিক্ততা। সব মিলিয়ে এই ম্যাচ হয়ে উঠেছে জেতা–হারার চেয়েও অনেক বেশি কিছু।
শিকড় অনেক গভীরে: ইতিহাস, অপমান আর ‘বিশ্বাসঘাতকতা’
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার উৎস কোথায়—তা নিয়ে তর্ক আছে। কেউ বলেন পনেরো শতকের ‘ওয়ার অব দ্য রোজেস’, কেউ শিল্পবিপ্লবের সময় দুই শহরের আর্থিক–সামাজিক প্রতিযোগিতা সামনে টানেন। বাস্তব সম্ভবত আরও জটিল। ফুটবল মাঠে এই শত্রুতা তীব্র হয় মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর।
একদিকে ম্যাট বাসবির ‘বাসবি বেবস’, অন্যদিকে ডন রেভির লিডস—যাদের নিয়ে ইংল্যান্ডের ফুটবলে দানা বাঁধে একরাশ ন্যারেটিভ। ইউনাইটেড মানেই রোমান্টিক ট্র্যাজেডি, লিডস মানেই ‘ডার্টি লিডস’: এই লেবেলিং আগুনে ঘি ঢেলেছিল।
তারপর এল ‘বিশ্বাসঘাতকতা’। জনি জাইলস (Johnny Giles), জো জর্ডন (Joe Jordan), গর্ডন স্ট্র্যাচান (Gordon Strachan) থেকে শুরু করে এরিক ক্যান্টোনা (Eric Cantona)—এক ক্লাব ছেড়ে আরেক ক্লাবে গিয়ে সাফল্যের মুখ দেখলেন একের পর এক তারকা। বিশেষ করে ক্যান্টোনার ট্রান্সফার লিডস–ইউনাইটেড ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত। ১৯৯২ সালে লিগ জেতার আনন্দের ঠিক পরের বছরই সেই ফোনকল, যা ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেয় এবং লিডস সমর্থকদের মনে স্থায়ী ক্ষোভ ঘনিয়ে তোলে।
এল্যান্ড রোড: যেখানে ডার্বি মানেই যুদ্ধ
এই ম্যাচের দিন এল্যান্ড রোড (Elland Road) অন্য চেহারা নেয়। রাস্তা বন্ধ, পুলিশি ব্যারিকেড, অস্বস্তিকর উত্তেজনা—সব মিলিয়ে একটা যুদ্ধক্ষেত্রের আবহ। প্রাক্তন লিডস গোলকিপার পল রবিনসন পরিস্থিতি বোঝাতে এক কথায় বলেন, ‘এটা কোনও বন্ধুত্বপূর্ণ ডার্বি নয়!’
আর সত্যিও ঠিক এটাই। লিডস ইউনাইটেড সমর্থকদের কাছে ম্যানচেস্টার মানেই ‘লাল’। এমনকি শহরের ব্যবসায়িক সংস্কৃতিতেও ঢুকে পড়েছে এই ঘৃণা। আজও লিডসে এমন মানুষ আছেন, যাঁরা প্রতীকীভাবে লাল রঙ ব্যবহার না করার গর্বে গরীয়ান। মাঠে তার প্রতিফলন আরও ভয়ংকর। ইউনাইটেড এলে এল্যান্ড রোডে বিদ্বে আর সংঘাতের স্মৃতিভার—সব মিলিয়ে খেলোয়াড়দেরও মানসিক পরীক্ষা হয়ে ওঠে। এখানেই ডার্বির বিশেষত্ব। শুধু প্রতিপক্ষ নয়, উল্টোদিকের টিমের সবাই শত্রু। তাই প্রিমিয়ার লিগে বহু বছর পর মুখোমুখি হলেও আগুন একটুও ঠান্ডা হয়নি।
বর্তমান বনাম অতীত: ফর্ম বদলালেও ঘৃণা অটুট
চলতি সিজনের হিসেব বলছে, লিডস ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। সামান্য হলেও আত্মবিশ্বাসী। সাম্প্রতিক সময়ে লিভারপুল, চেলসির বিরুদ্ধে মাঠে নেমে লড়াকু ইমেজ দেখিয়েছে। কোচ ড্যানিয়েল ফার্কে জানেন, এই ম্যাচ শুধু তিন পয়েন্ট নয়—সমর্থকদের ‘স্বপ্নপূরণের’ সুযোগ। অন্যদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড নতুন অধ্যায়ে। কোচ রুবেন আমোরিম বুঝেছেন, সংস্কৃতি আলাদা, ইতিহাস আলাদা। তাঁর কথায়, ইউনাইটেডের জার্সি পরলে শত্রু পরিবেশের জন্য প্রস্তুত থাকতেই হয়।
ফর্মের হিসেব মিলিয়ে কেউ বলবেন, লিডস রেলিগেশন বাঁচলেই খুশি। কেউ আবার খোলাখুলি জানাচ্ছেন—এই সিজন সফল হবে যদি ইউনাইটেডকে হারানো যায়। যে মানসিকতাই বলে দেয়, কেন লিডস–ম্যানচেস্টার লড়াই অন্য সব ডার্বির থেকে আলাদা। এই ম্যাচে গোল, পয়েন্ট বা লিগ টেবিল শেষ কথা নয়। শেষ কথা স্মৃতি। ইতিহাস। আর সেই পুরনো প্রশ্ন—কে কাকে হারিয়ে দাপট দেখাল। সব মিলিয়ে লিডস বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড নিছক ফুটবল-যুদ্ধ নয়। ইংল্যান্ডের সবচেয়ে তীব্র ফুটবল-ঘৃণার জীবন্ত দলিল।