আজকের ডার্বি শুধু দুই দলের ম্যাচ নয়—দুই দর্শনের লড়াই, দুই আলাদা ফুটবল-ঘরানার সংঘর্ষ।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 23 November 2025 14:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইংল্যান্ডের ময়দান ভর্তি ডার্বি৷ একদিকে লিভারপুল বনাম এভার্টন৷ অন্যদিকে নিউক্যাসল বনাম সান্ডারল্যান্ড৷ মার্সিসাইড হয়ে টাইন–ওয়্যার ডার্বি—টানটান উত্তেজনার কমতি নেই৷ সেই তালিকার উপরের দিকেই থাকবে আর্সেনাল—টটেনহ্যাম হটস্পারের দ্বৈরথ৷ নর্থ লন্ডনের দুই ক্লাব। গানার্সদের একচেটিয়া আধিপত্য সত্ত্বেও লড়াইয়ের তেজ এতটুকু ফিকে হয়নি! যত সময় গড়িয়েছে, ঐতিহাসিকতাকে স্বীকার করেই গ্ল্যামার বেড়েছে কয়েক গুণ।
নর্থ লন্ডন ডার্বি আসলে একটা ম্যাচের নাম নয়—এটা দুই পাড়ার ইতিহাস, দুই সমাজের অহঙ্কার আর দুই ক্লাবের বহু দশক ধরে জমে থাকা ক্ষোভ ও প্রতিশোধের গল্প। আর্সেনাল যখন ১৮৮৬ সালে উলউইচে জন্ম নিল, তখন তাদের সঙ্গে টটেনহ্যামের দূরত্ব ছিল ভৌগোলিক, মানসিকও। গানার্সরা তখন দক্ষিণ লন্ডনের দল, মিলিটারি–টাউন পরিবেশে থিতু হওয়া ফুটবল ক্লাব।
সে সময় টটেনহ্যাম (Hotspur FC), সহজ বাংলায় বললে, কিশোর-বাহিনী। অল্প বয়সীদের হাতে গড়া এক মজার দল, যারা শীতকালের ক্রিকেট–বিরতির ফাঁকে ফুটবল খেলত টটেনহ্যাম মার্শেসে। ছোট টিম, সীমিত পরিকাঠামো—কিন্তু পরিচয় স্পষ্ট: এই জায়গায়ই তাদের জন্ম, এখানেই তারা বড় হবে!
সমস্যা বাঁধল ১৯১৩ সালে। যেদিন আর্সেনাল মালিকানাধীন ক্লাব সিদ্ধান্ত নিল উলউইচ ছেড়ে সরাসরি নর্থ লন্ডনে চলে আসার। টটেনহ্যামের পাড়ায়, হাইবুরিতে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সম্পর্কে বিচ্ছেদ। গানার্সদের মনে হয়েছিল—বড় ক্লাব হওয়ার জন্য ভিড়, অর্থ আর অভিজাত দর্শক দরকার। স্পার্সদের নজরে—তাদের এলাকায় অনধিকার প্রবেশ! এর পরের ১০০ বছরের যুদ্ধের বীজ যেন বোনা হয়ে গেল ওই একটি সিদ্ধান্তে।
এখানেই শেষ নয়। সংঘাত আরও তীব্র হল ১৯১৯ সালে। প্রথম ডিভিশন বাড়ল দুই দল। জায়গা ধরে রাখল চেলসি। বাকি স্লট নিয়ে দৌড় ছিল টটেনহ্যাম, বার্নসলি আর আর্সেনালের মধ্যে! গানার্সরা দ্বিতীয় ডিভিশনে ষষ্ঠ, তবু তারা রীতিমতো ভোট চেয়ে কোমর বেঁধে নামল। সভাপতি জন ম্যাককেনা আর্সেনালকে সমর্থন জানালেন—আর তাতেই ভোটাভুটির ফলাফল দাঁড়াল ১৮–৮! স্পার্স রেগে আগুন। তারা এই ঘটনা ভুলল না। যার পর থেকে ডার্বির প্রতিটি ম্যাচ হয়ে উঠল এক একটি ঋণশোধের দিন!
প্রথম ম্যাচ? ১৮৮৭—টটেনহ্যাম মার্শেসে। আলো কমে যাওয়ায় লড়াই বাতিল। পরে ৬–২ ব্যবধানে জিতল আর্সেনাল। প্রথম অধ্যায়ে সুর চড়া! এরপর কয়েক দশক জুড়ে দু’দলের প্রতিটি ম্যাচ যেন আলাদা সংঘাতের গল্প। ১৯৯১–এর এফএ কাপ সেমিফাইনালে পল গ্যাসকইনের সেই দুরন্ত ফ্রি–কিক আর গ্যারি লিনেকারের ডাবল—স্পার্স সমর্থকদের কাছে এখনও স্মৃতিমেদুর, একই রকম রোম্যান্টিক!
অন্যদিকে ২০০১ সালে সল ক্যাম্পবেলের ক্লাব ছেড়ে আর্সেনালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত—টটেনহাম অনুরাগীদের হৃদয়ে ভাঙচুর চালানোর ইতিহাস। ‘জুডাস’—এই একটিমাত্র শব্দে তাঁকে ব্যানারে ব্যানারে গালি দেওয়া হয়েছিল। অথচ ক্যাম্পবেল নির্বিকার! নিজের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তেই পেলেন প্রিমিয়ার লিগ ও এফএ কাপ—বাড়তি সাফল্য আর্সেন ওয়েঙ্গারের ‘ইনভিন্সিবলসে’র অমর অংশীদারিত্ব।
ডার্বি কালে কালে তেতে ওঠে খেলোয়াড়দের ইঙ্গিতে, আচরণে। থিও ওয়ালকটের সেই ‘২–০’তোলা বিখ্যাত স্ট্রেচার–ইশারায়, যেখানে স্ট্যান্ড থেকে উড়ে আসে বোতল–মুদ্রা। ওই এক মুহূর্তেই বোঝা যায়—নর্থ লন্ডন ডার্বি কতটা প্যাশনেট, কতটা ব্যক্তিগত। অনুরাগীদের স্মৃতিতে সজীব ২০১৭–তে হোয়াইট হাট লেনের শেষ ডার্বি—ডেলি আলি ও হ্যারি কেনের গোল—টটেনহ্যাম সমর্থকদের কাছে এক যুগান্তকারী দিন। ২২ বছর বাদে প্রথমবার তারা আর্সেনালের উপরে লিগ অভিযান শেষ করল। ভেঙে গেল ‘সেন্ট টটারিংহ্যাম্স ডে’। লেনের প্রতিটি দেয়ালে অমোঘ লিখন: ‘এই জায়গা আমাদেরই!’
কিন্তু ইতিহাসের চিত্রনাট্য একমেটে নয়। বাঁক আছে। মিকেল আর্তেতার তরুণ, ব্যালান্সড, নির্মম বাহিনী আজ লিগের সেরা অন্যতম দল। অন্যদিকে টটেনহ্যাম দ্রুতগতির, সাহসী, চাপ সামলানো ফুটবল খেলছে। হ্যারি কেন না থাকলেও নতুন কাঠামোয় বদলে গিয়েছে দলের আইডেন্টিটি। আজকের ডার্বি তাই শুধু দুই দলের ম্যাচ নয়—দুই দর্শনের লড়াই, দুই আলাদা ফুটবল-ঘরানার সংঘর্ষ।