চ্যাম্পিয়নস লিগে ইংল্যান্ডের জয়জয়কার কোনও ‘ফ্লুক’ নয়। এটা শক্তি, অর্থনীতি আর প্রতিযোগিতার সম্মিলিত ফল।

ছবি: গুগল
শেষ আপডেট: 29 January 2026 14:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষপর্যন্ত জিতবে একটাই টিম৷ ফাইনাল হবে দু’দলের মধ্যে। সেটা কারা, এখনই বলা অসম্ভব। তবু একটা অনুমান করা যেতে পারে। আর সেই অনুমানের ভিত্তিতে বলা যায়, ইংল্যান্ডের কোনও ক্লাব যদি ফাইনালিস্ট না হয় তাহলে সেটা চরম বিস্ময়কর, অস্বাভাবিকও! খেতাব তো মুহূর্তের ম্যাজিক ঠিক করে দিতে পারে। কিন্তু তা জেতার জোর দাবিদার আর্সেনাল–লিভারপুল–চেলসি–টটেনহ্যাম–ম্যান সিটির মধ্যে যে কেউ।
কারণটা খুব সহজ৷ যে কায়দায় এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগের জার্মান, স্পেনীয় ক্লাবকে ঘোল খাইয়ে নকআউটে উঠেছে এই পাঁচ টিম, লিডেও আর্সেনাল (Arsenal) (৮ ম্যাচে ২৪ পয়েন্ট), তাতে এই ধারণা অতিরঞ্জন নয়।
ইংল্যান্ডের এই দাপট যদিও হঠাৎ করে আসেনি। এটা কয়েক বছরের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল। একদিকে প্রিমিয়ার লিগের (Premier League) আর্থিক শক্তি, অন্যদিকে প্রতিযোগিতার তীব্রতা—এই দুইয়ের যুগলবন্দি ইউরোপের মঞ্চে ইংরেজ ক্লাবগুলিকে অন্য মাত্রায় তুলে এনেছে।
টাকা-পয়সার প্রশ্ন এড়ানো চলে না। প্রিমিয়ার লিগের সম্প্রচারস্বত্ব থেকে যে বিপুল আয়, তা ইউরোপের অন্য যে কোনও লিগের তুলনায় অনেক বেশি। ডেলয়েট মানি লিগে (Deloitte Football Money League) শীর্ষ দশে ছ’টি ইংলিশ ক্লাব—এটা নিছক আপতিক হতে পারে না! গত গ্রীষ্মে দলবদলের মরশুমে ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলি তিন বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি খরচ করেছে। এই অঙ্কটা বুন্দেসলিগা (Bundesliga), লা লিগা (La Liga), সেরি আ (Serie A) এবং লিগ আঁ (Ligue 1)—এই চার লিগ মিলিয়েও ছুঁতে ব্যর্থ।
এই আর্থিক ক্ষমতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্কোয়াড ডেপথে। আর্সেনাল বা চেলসির (Chelsea) বেঞ্চে বসে থাকা খেলোয়াড়রাও অনেক দেশের প্রথম একাদশে অনায়াসে ঢুকে যেতে পারেন। ফলে চ্যাম্পিয়নস লিগের (Champions League) মতো দীর্ঘ টুর্নামেন্টে রোটেশন করেও মান নামছে না। আর এখানেই পিছিয়ে পড়ছে রিয়াল মাদ্রিদ (Real Madrid) বা প্যারিস সাঁ জার্মাঁর (Paris Saint-Germain) মতো ক্লাব, যাদের প্রথম একাদশ দুর্দান্ত হলেও ব্যাকআপ অপশন সীমিত।
তবে শুধু টাকা থাকলেই সব হয় না। ইংলিশ ক্লাবগুলির আসল শক্তি লুকিয়ে তাদের সাপ্তাহিক লড়াইয়ে। প্রিমিয়ার লিগে শীর্ষ মানের শারীরিক ও মানসিক চাপ সামলাতে হয়। নিচের সারির দলগুলিও ভয়ংকর গতিতে প্রেস করে, সেট-পিসে মারাত্মক আর ডুয়েলে এক ইঞ্চিও ছাড়ে না। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের (Newcastle United) অ্যান্থনি গর্ডন (Anthony Gordon) যেটা বলেছেন—প্রিমিয়ার লিগ অনেকটা ‘বাস্কেটবল ম্যাচে’র মতো, নিরবচ্ছিন্ন দৌড় আর সংঘর্ষে ভরা—সেটাই আসল পার্থক্য।
আর এই কারণে ইউরোপে গিয়ে ইংলিশ দলগুলো খানিকটা ‘স্বস্তি’ পায়। চ্যাম্পিয়নস লিগে বেশিরভাগ দল বল ধরে খেলার চেষ্টা করে, গেম কন্ট্রোল রাখতে চায়। ফলে জায়গা মেলে। সেই জায়গায় ইংলিশ ক্লাবগুলির গতি আর ট্রানজিশনে ভয়ংকর। ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City) বা লিভারপুলের (Liverpool) মতো দল তাই এই খোলা ম্যাচে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।
অবশ্য এটাও ঠিক, এবারের ড্র কিছুটা হলেও সহায়ক ছিল। অপটা-র (Opta) পরিসংখ্যান বলছে, আর্সেনাল ও টটেন্যাম হটস্পারের (Tottenham Hotspur) সূচি তুলনামূলক সহজ। লিভারপুলও প্রথম দিকে খুব কঠিন প্রতিপক্ষ পায়নি। কিন্তু শুধু ড্র-এর জোরে পাঁচটা দল একসঙ্গে টপ এইটে ঢুকে পড়বে—এটা মানতে একটু সমস্যা হয়। কারণ নিউক্যাসলের মতো দল, যারা কঠিন গ্রুপ পেয়েছিল এবং পিএসজি-র মুখোমুখি হয়েছে, শেষ পর্যন্ত প্লে-অফে জায়গা করে নিয়েছে।
আসলে আসল প্রশ্নটা এখন অন্য জায়গায়—এই দাপট কতদূর যাবে? ইতিহাস বলছে, নকআউট পর্ব যত এগোয়, ততই প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলির উপর ধকল বাড়ে। একই সঙ্গে লিগ, ইউরোপ, ঘরোয়া কাপ—সব সামলাতে গিয়ে অনেক সময় জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারির ফুরফুরে ফুটবল মার্চ–এপ্রিলে ভারী হয়ে যায়। স্টিফেন ওয়ার্নকের (Stephen Warnock) কথায়, ‘প্রিমিয়ার লিগে প্রতি সপ্তাহের যুদ্ধটাই ইংলিশ ক্লাবগুলির সবচেয়ে বড় শত্রু।’
তবু এবার একটা ব্যতিক্রমী সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যেহেতু পাঁচটি দল সরাসরি টপ এইটে, তারা শেষ ষোলোয় একে অপরের মুখোমুখি হবে না। ফলে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের চার, এমনকি পাঁচ বা ছ’টি দলও উঠে যাওয়ার রাস্তা খোলা। এটা হলে চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটতে চলেছে!
উল্টো দিকে ইউরোপের একগুচ্ছ ‘বড় নাম’ চাপে। রিয়াল, পিএসজি, জুভেন্তাস (Juventus), ইন্টার মিলান (Inter Milan), বরুসিয়া ডর্টমুন্ড (Borussia Dortmund), আতলেতিকো মাদ্রিদ (Atletico Madrid)—এরা সবাই প্লে-অফের লটারিতে। এক ম্যাচে সব শেষ হয়ে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তা ইংলিশ ক্লাবগুলিকে মানসিকভাবে এগিয়ে রাখছে।
সব মিলিয়ে ছবিটা পরিষ্কার। এই মুহূর্তে ইউরোপীয় ফুটবলের কেন্দ্র লন্ডন–ম্যানচেস্টার অক্ষে ঘুরছে। ট্রফি কে জিতবে, সেটা খোলা প্রশ্ন। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগে ইংল্যান্ডের জয়জয়কার কোনও ‘ফ্লুক’ নয়। এটা শক্তি, অর্থনীতি আর প্রতিযোগিতার সম্মিলিত ফল।