কীভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা টেনে আনলেন? কোন প্রসঙ্গ শুনেই বা লিও-র মতি ফিরল? তুষ্ট হলেন ফুটবল-ঈশ্বরের একনিষ্ঠ বরপুত্র?
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 12 December 2025 19:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ এসেছিলেন ২০১১ সালে। তখনও তিনি নায়ক নন। স্রেফ উদীয়মান প্রতিভা। ২০২৫-এ এসে গরিমা আর গ্ল্যামার—দুই-ই কয়েক গুণ বেড়েছে। এখন স্রেফ একগাল হেসে ‘চলুন না স্যার, ও দেশে আপনার প্রচুর ফ্যান’—বললে ভবি ভোলবার নয়! এমন লাখো অনুরাগীদের উষ্ণ অনুরাগ জগৎ ঘুরে পুরোদস্তুর সেঁকে ফেলেছেন। ফলে অন্য কোনও গন্তব্যে তাঁকে (Lionel Messi) নিয়ে যেতে হলে কাঠ ও খড় দুই-ই পোড়াতে হবে বিস্তর!
কথাগুলো যে হাওয়ায় ভাসানো নয়, হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন ‘গোট ট্যুর' (GOAT Tour) নামক কার্নিভালের আয়োজক যিনি, শতদ্রু দত্ত। মেসি-সমীপে যখন প্রথম প্রস্তাবটি পাড়েন, তাঁকে কলকাতা (messi in kolkata) সুদ্ধ খানকয়েক শহরে এনে হাজির করার পরিকল্পনা (messi india tour schedule) গুছিয়ে জানান, পত্রপাঠ খারিজ করে দেন আর্জেন্তিনীয় তারকা। ‘টাইমস নাও'-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি৷ অনেক ফন্দিফিকির এঁটে, এটা-সেটা বলে, একগুচ্ছ বন্দনাগীতির পরেও যখন বরফ গলছে না, হঠাৎ বিপদোদ্ধারে এগিয়ে আসেন তিনি, যিনি ‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়ে’র মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন আপামর বাঙালিকে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কোনও ‘ঠাকুরে’র অষ্টোত্তর শতনাম জপেননি শতদ্রু৷ পরিকল্পনাটা যে মাস্টারস্ট্রোক ছিল, আগামিকাল গোটা কলকাতা (messi kolkata) সমেত সারা দেশ তার সাক্ষী থাকতে চলেছে!
কীভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা টেনে আনলেন? কোন প্রসঙ্গ শুনেই বা লিও-র মতি ফিরল? তুষ্ট হলেন ফুটবল-ঈশ্বরের একনিষ্ঠ বরপুত্র? শতদ্রুর কথায়, ‘প্রথমেই বুঝেছিলাম, মেসিকে সাধারণ যুক্তি দিয়ে বোঝানো যাবে না। উনি এমন মানুষ, যাঁকে টাকা, ভিআইপি আতিথেয়তা বা প্রচারের লোভ দেখিয়ে রাজি করানো যায় না। নিজের মুড আর বিশ্বাস দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। তাই ভাবলাম, ওঁর সঙ্গে এমন কোনও আবেগের সুতো বাঁধতে হবে, যা খেলার গণ্ডি ছাপিয়ে যায়।’
এই ভাবনা থেকেই রবীন্দ্রনাথের ওয়াইল্ড-এন্ট্রি!
শতদ্রুর কথায়, ‘আমি ওঁকে বললাম, আর্জেন্তিনা আর বাংলার মধ্যে এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক সেতু রয়েছে। আর সে সেতুর স্থপতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯২৪ সালে গুরুদেব যে আতিথেয়তা পেয়েছিলেন আপনার দেশে, সেটা ভোলার নয়। তখনই আর্জেন্তিনার জনগণ বাংলা সংস্কৃতিকে আপন করে নেন। আমি বললাম—‘মেসি, তুমি কোনও নতুন দেশে আসছ না। পা রাখতে চলেছে এমন এক ভূখণ্ডে, যার সঙ্গে তোমাদের দেশের ইতিহাসের অচ্ছেদ্য বাঁধন!’
কথাগুলো মেসি নাকি বিস্মিত হয়ে শুনছিলেন। তারপর রাখলেন প্রশ্ন, ‘রবীন্দ্রনাথ কি ফুটবল খেলতেন?’ হাসতে হাসতে শতদ্রুর জবাব—‘না, না। সেটা খেলতেন না। কিন্তু উনি ছিলেন এমন এক বাঙালি, যাঁকে আর্জেন্তিনা একান্তভাবে নিজেদের বলে মনে করেছিল!’
তারপর কথায় কথায় উঠে এল গুরুদেবের ‘ভিলা ওকাম্পো’র (‘Villa Ocampo’) দিনগুলি, অসুস্থতা থেকে আরোগ্যলাভের গল্প, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর স্নেহ, দু’মাসের সাহিত্য ও সংস্কৃতির দেওয়া-নেওয়ার কাহিনি। নিবিড় শ্রোতার মতো সবকিছু শুনলেন লিও। তারপর কথা শেষে মাথা নেড়ে সম্মতি এবং হাসিমুখে জবাব, ‘আমায় এই কথাগুলো বলার জন্য অজস্র ধন্যবাদ!’
সেই ধন্যবাদ-ই শতদ্রুর টার্নিং পয়েন্ট। তাঁর ভাষায়—‘ওই মুহূর্তেই বুঝলাম, মেসির মন গলেছে। আসলে যিনি গোটা দুনিয়ায় পূজিত, তাঁকে নিজের দেশের সঙ্গে গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধনে বেঁধে ফেলতে পারলে, তিনি তার সমাদর করেন। রবীন্দ্রনাথের নাম মেসির কাছে দরজাটা খুলে দিল!’
সেই ছিল উৎসমুখ। এরপর আস্তে আস্তে জুড়ে গেল রোনাল্ডিনহোর উৎসাহ, মার্টিনেজের পূর্ব অভিজ্ঞতা, ২০২৩ সালের দুর্গাপুজোয় মেসির মূর্তি নিয়ে আমবাঙালির উন্মাদনা আর ভারতীয় দর্শকদের আবেগ নিয়ে অসংখ্য ভিডিও। শতদ্রু বলেন, ‘ওঁকে বোঝালাম, ভারতের অনুরাগীরা শুধু ফুটবল দেখেন না—মেসিকে অনুভব করেন। আমার কথা শেষ হতে না হতেই তিনি বললেন, ‘ওকে, লেটস ডু ইট!’ বিংগো! শতদ্রুর ভাষায়, ঠিক এভাবেই কবিগুরু হয়ে উঠলেন মেসির কলকাতা-সফরের অদৃশ্য অনুঘটক।
বেশ অনেক বছর আগে ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ বই লিখেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। কয়েক দশক পেরিয়ে নিশ্চিতভাবেই ‘মেসির রবীন্দ্রনাথ’ (Rabindranath Tagore) নামে নিবন্ধগ্রন্থ লিখবেন কেউ। লেখকের নাম? সেটা আপাতত সত্তর ফুট উঁচু মূর্তির (messi statue kolkata) নিহিত নন্দনতত্ত্বের মতোই ধোঁয়াশায় থাক!