আজকের ফুটবলে সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় সেই, যে একাধিক ভূমিকায় পারদর্শী। ভালভার্দে ঠিক সেই ধরনের ফুটবলার। তিনি মিডফিল্ডার, ডিফেন্ডার এবং আক্রমণভাগের সহায়ক—সব কিছুর একত্র প্যাকেজ।

ফেদেরিকো ভালভার্দে
শেষ আপডেট: 13 March 2026 12:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সূচ হয়ে ঢুকলেন, ফাল হয়ে বেরলেন!
ফেদেরিকো ভালভার্দের ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে পারফরম্যান্সকে এর চেয়ে অব্যর্থ উপমায় বোধ হয় বোঝানো যায় না! হাইভোল্টেজ ম্যাচ শুরুর আগে সমস্ত স্পটলাইট শুষে নেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র৷ এমনকি মাঠের বাইরে থাকা কিলিয়ান এমবাপেকে নিয়েও বোধ হয় তাঁর চেয়ে বেশি মাতামাতি ছিল৷ কিন্তু মাঠে নেমে উরুগুয়ের মিডফিল্ডার বুঝিয়ে দেন, কেন তিনি তুল্য সমীহ ও সম্ভ্রম পাওয়ার যোগ্য!
এমনিতে টনি ক্রুস, লুকা মদ্রিচের বিদায়ের পর মাদ্রিদের মিডফিল্ড রক্তাল্পতায় ভুগচে। ফরাসি চুয়ামেনি প্রতিভাবান, কিন্তু এখনও তেমন পরিপক্বতা আসেনি৷ স্তম্ভ বলে যদি কেউ থাকেন, তিনি ভালভার্দে। ফিক্সড কোনও পজিশন নেই৷ কখনও একটু গভীরে—নাম্বার সিক্সে খেলেন৷ দল আক্রমণে গেলে ওঁত পেতে থাকা শিকারী বাঘের মতো নি:শব্দে থাবা ফেলে ঢুকে পড়েন প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে। একটু আগেই যিনি জান কবুল করে ট্যাকল করছিলেন, সেই তিনিই অনায়াস দক্ষতায়, পাকা স্ট্রাইকারের মতো নিখুঁত ফিনিশে বল জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়েও দেন!
রক্ষণ আর আক্রমণের জল অচল বিভেদরেখা কার্যত ঘুচিয়েছেন ভালবার্দে। তিনি শ্রমিকের মতো ডিফেন্সে যতটা মজবুত, ঠিক ততটাও শিল্পীসুলভ দক্ষতায় গোল করতে পারঙ্গম৷ এই ব্যাপ্তি আধুনিক ফুটবলে বিরল৷ রিয়ালের হয়ে খেলার অস্মিতা মুছে যেভাবে ম্যানচেস্টার সিটির গোটা টিমকে পাক্কা নব্বই মিনিট ত্রস্ত করে রাখলেন, তার ভিডিও উদীয়মান যে কোনও ফুটবলারের বারবার দেখা জরুরি৷ এর চেয়ে কার্যকরী ট্রেনিং হয়তো মাঠেও জুটবে না!
শুরুতে সিটির দাপট
গত বুধবারের ম্যাচের স্কোরলাইন দেখে মনে হতে পারে, শুরু থেকে একতরফা লড়াই হয়েছে। কিন্তু বাস্তব একেবারেই আলাদা। প্রথম ১৫ মিনিটে নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি ম্যানচেস্টার সিটির (Manchester City) হাতে। পেপ গুয়ার্দিওলার (Pep Guardiola) দল তখন আক্রমণের ধার বাড়াতে তিনজন উইঙ্গারে খেলছে—জেরেমি ডোকু (Jeremy Doku), সাভিনিয়ো (Savinho) এবং আঁতোয়ান সেমেনিও (Antoine Semenyo)। পরিকল্পনা স্পষ্ট—রিয়াল মাদ্রিদের (Real Madrid) ডান দিকের ডিফেন্সকে চাপে ফেলা।
বিশেষ করে বলতে হয় ডোকুর কথা। বারবার বল পেয়ে উঠছিলেন বাম প্রান্ত বেয়ে। সিটির মিডফিল্ডার নিকো ও’রাইলি (Nico O’Reilly) মাঝমাঠে উঠে এসে জায়গা তৈরি করছিলেন। ফলে রিয়ালের ডান দিকটা কিছুটা অগোছালো হয়ে পড়ছিল। ফলে বড় সমস্যায় পড়ছিলেন ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড (Trent Alexander-Arnold) জন্য। তিনি বুঝতে পারছিলেন না—ডোকুর দিকে এগোবেন, নাকি ভেতরে থেকে ডিফেন্স সামলাবেন। ফলে মাঝামাঝি অবস্থানে লটকে গিয়ে খাবি যাচ্ছিলেন বারবার।
সিটি সেই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা চালায়। ডোকু কয়েকবার দারুণ ড্রিবল করে বক্সে ঢুকে পড়েন। কিন্তু শেষ পাসটা ঠিকঠাক হয়নি। গোলের সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হালান্ডরা।
সমাধান করলেন ভালভার্দে
এই জায়গাতেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন ফেদেরিকো ভালভার্দে (Federico Valverde)। প্রথম দিকে তিনি মাঝমাঠে থেকে নিকো ও’রাইলিকে অনুসরণ করছিলেন। কিন্তু এতে ডোকুকে আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে।
কিছুক্ষণ পর রিয়াল কৌশল বদলায়। ভালভার্দে তখন মাঝমাঠ ছেড়ে আরও বেশি করে ডান প্রান্তে সরে আসতে শুরু করেন। ডোকুর সামনে সরাসরি গিয়ে দাঁড়ান। আর এই পরিবর্তনের ফল তৎক্ষণাৎ হাতেনাতে পাওয়া যায়। ভালভার্দে একজন ডিফেন্ডারের মতো শক্তিশালী ট্যাকল করতে পারেন। আবার দৌড়ে জায়গা বন্ধ করতেও দক্ষ। ফলে অনেকটাই কমে যায় ডোকুর গতির ঝাঁঝ। রিয়ালের ডিফেন্স স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এই সময়েই বোঝা যায়, ভালভার্দে শুধু মিডফিল্ডার নন—প্রয়োজনে তিনি কার্যত রাইট-ব্যাকের ভূমিকাও নিতে পারেন।
ডিফেন্স সামলাতে সামলাতেই হ্যাটট্রিক
এই ম্যাচের সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এখানেই। ভালভার্দে শুধু ডিফেন্স সামলাননি—গোলও করেছেন তিন-তিনটে! প্রথমটি আসে গোলরক্ষক থিবো কুর্তোয়ার (Thibaut Courtois) লম্বা পাস থেকে। বল পেয়ে দৌড়ে উঠে গিয়ে নিখুঁত ফিনিশ করেন ভালভার্দে। তার কয়েক মিনিট পরই দ্বিতীয় গোল। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের (Vinicius Junior) পাস পেয়ে ডিফেন্সের ফাঁক গলে ঢুকে পড়েন তিনি। তারপর ঠান্ডা মাথায় ফিনিশ। হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ হয় প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে। ব্রাহিম দিয়াজ (Brahim Diaz) দারুণ একটি বল বাড়ান। ভালভার্দে সেটি নিয়ন্ত্রণ করে ডিফেন্ডার মার্ক গেহির (Marc Guehi) মাথার উপর দিয়ে তুলে জালে জড়িয়ে দেন।
এই তিনটি গোলের মধ্যেই তাঁর খেলোয়াড়ি চরিত্র স্পষ্ট। একদিকে ডিফেন্সে কঠিন ট্যাকল। অন্যদিকে আক্রমণে দক্ষতা। এই দুইয়ের মিশেলই উরুগুয়ের ফুটবলারকে আলাদা করে তুলেছে।
‘সবচেয়ে আন্ডাররেটেড ফুটবলার’?
ম্যাচ শেষে ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড (Trent Alexander-Arnold) একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, ভালভার্দে হয়তো বিশ্বের সবচেয়ে ‘আন্ডাররেটেড’ ফুটবলার। আর্নল্ডের কথায়, ‘যখন কেউ ওর সঙ্গে খেলে, তখন বোঝা যায়, ও দলের জন্য কতটা কাজ করে। মাঠের প্রতিটি ঘাসের উপর দৌড় লাগায়!’
আসলে ভালভার্দের মতো খেলোয়াড়দের গুরুত্ব অনেক সময় পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। কারণ শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট দিয়ে অবদান মাপা দুষ্কর। একদিকে মাঝমাঠে জায়গা বন্ধ করেন। অন্যদিকে ডিফেন্সে সাহায্য করেন। আবার দরকারে ঘাপটি মেরে আক্রমণেও উঠে আসেন। অর্থাৎ, পুরো দলকে ভারসাম্য জোগান ভালভার্দে।
আধুনিক ফুটবলের ‘পূর্ণাঙ্গ’ ফুটবলার
আজকের ফুটবলে সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় সেই, যে একাধিক ভূমিকায় পারদর্শী। ভালভার্দে ঠিক সেই ধরনের ফুটবলার। তিনি মিডফিল্ডার, ডিফেন্ডার এবং আক্রমণভাগের সহায়ক—সব কিছুর একত্র প্যাকেজ। একই ম্যাচে ডোকুর মতো দ্রুত উইঙ্গারকে আটকানো এবং আবার হ্যাটট্রিক করা—এই দুই কাজ একসঙ্গে করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ভালভার্দে সেটাই করে দেখিয়েছেন, আরও একবার! যে কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, তিনি আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে সম্পূর্ণ মিডফিল্ডারদের একজন। কথাটা মোটেও অতিরঞ্জন নয়।