কেউ খেল ৫, কেউ ৩৷ মোদ্দা বিষয়: সেকেন্ড লেগের আগেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিল বেশিরভাগ ক্লাব। যাদের আশা টিকে রইল, তারাও অদূরে কতটা ভাল ফলাফল করবেন, বলা মুশকিল!

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 12 March 2026 15:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বফুটবলে, মূলত সমর্থক মহলে, 'কৃষকদের লিগ' (Farmer's League) বলে একটা ব্যাঙ্গাত্মক তকমা দীর্ঘদিন প্রচলিত। মূলত জার্মানি আর ফ্রান্সের ঘরোয়া লিগ, যেখানে প্রতিযোগিতা কম, হাতেগোনা দু-তিনটে ক্লাবই অন্যদের উপর ছরি ঘোরায়, আবার সেই তারাই চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো এলিট প্রতিযোগিতায় এসে ব্যর্থ হয়—এই বৈপরীত্যকেই সমর্থকরা নিশানা করে এসেছেন৷ এখনও তাতে ভাটা পড়েনি৷ যতই গেলবার পিএসজি ইউরোপ দখল করুক না কেন, বক্রোক্তি আজও আছড়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্সে।
আত্মগর্বী এই সমর্থক, বেশ কিছু বিশেষজ্ঞও রয়েছেন এই তালিকায়, যাঁদের বিশ্বাস ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দুনিয়ার পয়লা নম্বর ফুটবল প্রতিযোগিতা। দলের গুণমান, কম্পিটিশনের উচ্চাবচতা, অনুমানের বাইরে ফলাফল একে আলাদা গ্ল্যামার দিয়েছে। তাই চ্যাম্পিয়নস লিগে ইপিএল ক্লাবগুলির এত রমরমা। সাম্প্রতিক অতীতেও তারা হয় প্রতিযোগিতা জিতেছে, নয়তো নক আউটে দল বেঁধে টিকিট কেটেছে।
কথাটা যে অংশত ঠিক, পুরোটা নয়, তার প্রমাণ মিলল গতকাল৷ বলা উচিত৷ গত দু'দিন ধরে। চেলসি, ম্যান সিটি, স্পার্স, নিউক্যাসল, আর্সেনালের মতো বাঘা বাঘা টিম হয় হোঁচট খেল, নয়তো বেইজ্জত হল। কেউ খেল ৫, কেউ ৩৷ মোদ্দা বিষয়: সেকেন্ড লেগের আগেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিল বেশিরভাগ ক্লাব। যাদের আশা টিকে রইল, তারাও অদূরে কতটা ভাল ফলাফল করবেন, বলা মুশকিল!
ইউরোপের মঞ্চে একসঙ্গে হোঁচট
গত দু’দিন ধরে চ্যাম্পিয়নস লিগের (UEFA Champions League) শেষ ষোলোর প্রথম লেগ যেন ইংলিশ লিগের (Premier League) দলগুলির কাছে হিমশীতল রাতে ঠান্ডা জলের ঝাপটা হয়ে এল। একসঙ্গে এতগুলো ক্লাবের ব্যর্থতা সচরাচর দেখা যায় না। একদিকে ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City)। যারা স্পেনে গিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের (Real Madrid) কাছে ৩–০ গোলে হারল। চেলসিও (Chelsea) সমসংখ্যক গোলের ফারাকে পিএসজি-র (PSG) হাতে বিধ্বস্ত। টটেনহ্যাম হটস্পার (Tottenham Hotspur) প্রত্যাশিতভাবেই আতলেতিকো মাদ্রিদের (Atletico Madrid) ময়দানে ৫–২ গোলে অপদস্থ।
লিভারপুল (Liverpool) তুলনায় সম্ভ্রম বাঁচাল। তুরস্কে গিয়ে গালাতাসারের (Galatasaray) কাছে হারল, কিন্তু এক গোলে। আর্সেনাল (Arsenal) বেয়ার লেভারকুজেনের (Bayer Leverkusen) মাঠে শেষ মুহূর্তের পেনাল্টিতে পরাজয় ঠেকাল। নিউক্যাসল ইউনাইটেড (Newcastle United) আবার সেন্ট জেমস পার্কে বার্সেলোনার (Barcelona) বিরুদ্ধে জয় পাব পাব করলেও শেষ মুহূর্তের পেনাল্টিতে ম্যাচ শেষ হল ড্রয়ে। অর্থাৎ, ইংল্যান্ডের সেরা ছ’টি ক্লাবের সকলেই প্রথম লেগে জিততে ব্যর্থ। গত কয়েক বছরের চ্যাম্পিয়নস লিগে এমন দৃশ্য খুব কম দেখা গিয়েছে।
আত্মবিশ্বাস থেকে বাস্তবের ধাক্কা
এই ফলাফলগুলো আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ নতুন লিগ-স্টেজ ফরম্যাটে প্রিমিয়ার লিগের সমস্ত দল বেশ ভালো পারফর্ম করেছিল। ছ’টি ইংলিশ টিম শেষ ষোলোয় জায়গা পাকা করে। তখন অনেকের বক্তব্য ছিল—ইউরোপে আবার ইংরেজ-আধিপত্য শুরু হতে চলেছে। কিন্তু নকআউট পর্বে এসে উলটপুরাণ। স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্স বা তুরস্কের ক্লাবগুলো অনেক বেশি সংগঠিত, অনেক বেশি কার্যকর ফুটবল খেলেছে।
আসল অনেকে ভুলে যান, ঘরোয়া টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগে একেকটা ম্যাচই ভাগ্য নির্ধারণ করে। ছোট ভুল, সামান্য অমনোযোগ বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেই মূল্যই চুকিয়ে এসেছে সমস্ত শীর্ষ ইংলিশ ক্লাব।
রিয়ালের বিরুদ্ধে গুয়ার্দিওলার ঝুঁকি
ম্যানচেস্টার সিটির ম্যাচটাই সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কোচ পেপ গুয়ার্দিওলা (Pep Guardiola) আক্রমণাত্মক দল সাজিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য রিয়াল মাদ্রিদকে চাপে রাখা। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ব্যুমেরাং হল। দ্রুত কাউন্টার আক্রমণে সুযোগ নিলেন ভিনিসিয়াস, ভালভার্দেরা (Federico Valverde)। একটা হ্যাটট্রিকে ম্যাচের মোড় ঘুরে গেল।
রিয়ালের প্রথম গোলটাই দেখুন। গোলরক্ষক থিবো কুর্তোয়ার (Thibaut Courtois) লম্বা ক্লিয়ারেন্স সিটির ডিফেন্সের মাথার উপর দিয়ে চলে যায়। আর সেই বলেই গোল। এই ধরনের মুহূর্তগুলোই প্রমাণ, ইউরোপের বড় ম্যাচে সামান্য স্খলন কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
প্রিমিয়ার লিগের তীব্রতাই কি আসল সমস্যা?
একটা প্রশ্ন উঠছে—প্রিমিয়ার লিগের তীব্রতা কি দলগুলোর জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? প্রতি সপ্তাহেই কঠিন ম্যাচ। টেবিলের মাঝামাঝি দলও বড় ক্লাবকে হারিয়ে দিতে পারে। ফলে সবাই প্রায় সারা বছরই হাই ইন্টেনসিটিতে খেলতে বাধ্য। চ্যাম্পিয়নস লিগে এসে সেই ক্লান্তি প্রভাব ফেলছে?
কিছু বিশেষজ্ঞদের নজরে এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ ইউরোপের অন্য লিগে অনেক সময় বড় ক্লাবগুলো তুলনামূলক সহজ ম্যাচ খেলে। ফলে তারা ইউরোপে লড়ার আগে বেশি বিশ্রাম পায়।
দ্বিতীয় লেগে কি বদলাবে ছবি?
এখন অবশ্যও সব শেষ হয়ে যায়নি। দ্বিতীয় লেগ বাকি। আর্সেনাল নিজেদের মাঠে খেলবে। লিভারপুলও ফিরবে অ্যানফিল্ডে (Anfield)। ঘুরে দাঁড়াতে পারে নিউক্যাসলও। চেলসি, সিটি এবং স্পার্সের জন্য কাজটা বেশ কঠিন। তিন গোলের ব্যবধান মুছে ফেলা সহজ নয়। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ যখন রিয়াল মাদ্রিদ বা পিএসজি।
সব মিলিয়ে ছবিটা পরিষ্কার—গত ২৪ ঘণ্টা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিয়েছে। যে লিগকে অনেকেই ‘দুনিয়ার সেরা’ বলেন, সেই দাবির ভিতটা এখন পরীক্ষার মুখে। দ্বিতীয় লেগে ইংলিশ ক্লাবগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারলে ন্যারেটিভ বদলাবে। তা না হলে এই দু’দিনের ফলাফলই হয়তো মনে করিয়ে দেবে—ইউরোপে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট একটা নির্দিষ্ট লিগের মাথায় তুলে দেওয়াটা বাতুলতা, শিশুসুলভ।