রিও এনগুমোহা! যাঁর এই বয়সে স্কুলের বেঞ্চে বসে থাকার কথা, সেই তিনিই কিনা লিভারপুলকে এনে দিলেন শেষ মুহূর্তের জয়। মরশুমের বাকি ম্যাচগুলোয় সবার চোখ থাকবে রিও-র দিকে।

রিও এনগুমোহা
শেষ আপডেট: 26 August 2025 10:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দু’গোলে পিছিয়ে ছিল দল। তাও দশজনে। স্ট্রাইকার নেই। আলেকজান্ডার ইসাক (Alexander Isak) গোঁ ধরে বসে… তিনি লিভারপুলেই (Liverpool) যাবেন। উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডনকে (Anthony Gordon) ফলস নাইন বানিয়ে কোনওমতে জোড়াতালি দিয়ে টিম সাজিয়েছেন ম্যানেজার এডি হাউ (Eddie Howe)। সেই গর্ডনও কিনা লাল কার্ড দেখে মাঠের বাইরে!
দ্বিতীয়ার্ধে তাবড় নিউক্যাসল ইউনাইটেডের (Newcastle United) ভক্তও যখন বুঝে গেছেন, হার নিশ্চিত। স্রেফ ব্যবধান যাতে লজ্জাজনক না হয়, সেই উদ্দেশ্যে সেকেন্ড হাফ খেলতে হবে, তখনই উলটপুরাণ! সবার দুশ্চিন্তা থামিয়ে, জল্পনায় জল ঢেলে অলৌকিক কামব্যাক করল ‘ম্যাগপাই’রা। ঘরের মাঠে ফ্লাডলাইটের তলায় অবিস্মরণীয় প্রত্যাবর্তন। ৮৬ মিনিটেই দু’গোলে পিছিয়ে থাকা নিউক্যাসল সমতা ফেরাল।
যখন জয় আর ড্রয়ের সম্ভাবনা ও যৌক্তকতা নিয়ে তরজা চলছে, গেলবারের চ্যাম্পিয়নদের দুর্দশা নিয়ে চাঁচাছোলা প্রতিবেদন নামব নামব প্রায়… ঠিক তখনই দুর্দান্ত ক্রস, বুদ্ধিদীপ্ত ডামি এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ফের একবার পট পরিবর্তন ঘটিয়ে ম্যাচ ও তিন পয়েন্ট পকেটে পুরল লিভারপুল। সালাহ পারলেন না, একিটিকেও ব্যর্থ। হাজারো তারার মালায় জ্যোতিষ্ক হয়ে জ্বলে উঠলেন যিনি, তাঁর নাম রিও এনগুমোহা (Rio Ngumoha)! চেলসির অ্যাকাডেমি খেলোয়াড়। মাত্র ১৬ বছর বয়স। সই করাতে কানাকড়িও খসাতে হয়নি লিভারপুলকে। সেই তিনিই কিনা সবাইকে ছাপিয়ে দলের ত্রাতা হয়ে উঠলেন। সেন্ট জেমস’ পার্কের গর্জন থেমে গেল শেষ মুহূর্তে। ১০০তম মিনিটে লিভারপুলের নবাগত রিও তাঁর অভিষেকে একা হাতে নিউক্যাসলের ভরাডুবি ঘটালেন। তাঁর গোলেই গেলবারের চ্যাম্পিয়নরা টানটান থ্রিলার জিতে নিল ৩-২ ব্যবধানে!
ম্যচের শুরুটা অবশ্য অন্যরকম ছিল। ৫০ হাজারেরও বেশি দর্শকের সামনে প্রথম আধঘণ্টা দাপট দেখাল নিউক্যাসল। কিন্তু গোলের দেখা মিলল না। উল্টে ৩৫ মিনিটে প্রত্যাঘাত হানল লিভারপুল। মাঝমাঠ থেকে এগিয়ে দুরন্ত শটে পোস্ট ঘেঁষে বল জালে পাঠালেন রায়ান গ্রাভেনবার্গ।
এরপরই বিপত্তি। আর সেটা আচমকা। হতাশ নিউক্যাসল উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডন ভয়ঙ্কর লেট ট্যাকল করে বসলেন ভার্জিল ভ্যান ডাইককে। প্রথমে হলুদ, তারপর ভিএআর দেখে রেফারির লাল কার্ড। যে কারণে প্রথমার্ধেই ১০ জনে নেমে গেল হোম টিম।
সেকেন্ড হাফ শুরু হতেই ব্যবধান বাড়াল লিভারপুল। মাত্র ২০ সেকেন্ডে হুগো একিটিকে, যিনি একদা নিউক্যাসলের কাঙ্ক্ষিত টার্গেট ছিলেন, শেষমেশ কেড়ে নিয়েছে লিভারপুল, গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। যখন মনে হচ্ছে জয় অবধারিত, স্রেফ মার্জিন বাড়ানোর খেলা শুরু হতে চলেছে, তখনই সবাইকে চমকে দিয়ে ৫৬ মিনিটে ব্রুনো গিমারায়েস ব্যাক পোস্ট হেডে ব্যবধান কমান। লড়াইয়ে ফিরে আসে নিউক্যাসল।
বোঝাই যাচ্ছিল না, তারা একজন কম খেলোয়াড় নিয়ে মাঠে খেলছে। লিভারপুলের ট্রেডমার্ক উইং প্লে কার্যত বন্ধ, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ উধাও, সালাহ নিশ্চুপ, গ্রাভেনবার্গ বুঝে উঠতে পারছেন না কী করবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে, ৮১ মিনিটের মাথায় ড্যান বার্নের হেড থেকে বল রিসিভ করে দ্বিতীয় গোল করেন উইলিয়াম ওসুলা। ১০ জনের নিউক্যাসল তখন সমতায়।
কিন্তু ভাগ্যের চাকা ফের একবার ঘুরে গেল সংযুক্ত সময়ে। ঘুরিয়ে দিলেন এক কিশোর। কিছু একটা বদলের আশায় ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে মাঠে নামান ম্যানেজার। সেই বিশ্বাসের মান রাখেন এনগুমোহা। মো সালাহর পাস ডোমিনিক সোবস্লাই সুকৌশলে ছেড়ে দিতেই আনমার্কড এনগুমোহা নিখুঁত বাঁকানো শটে দূরের কোণায় বল পাঠান। অসহায় দর্শকের মতো তা জালে জড়িয়ে যেতে দেখা ছাড়া গোলরক্ষক নিক পোপের আর কিছু করার ছিল না!
মাত্র তিন দিন বাদেই যাঁর সতেরোতম জন্মদিন, তাঁকে কুর্নিশ জানিয়ে ম্যাচ শেষে লিভারপুল অধিনায়ক ফান ডাইক বললেন, ‘রিওর জন্য আমি সত্যিই খুশি। ওকে কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হবে, বিনয়ী থাকতে হবে। আমি নিশ্চিত, ও সেটা করবে। নিউক্যাসল সবসময় কঠিন প্রতিপক্ষ, এখানে খেলা সহজ নয়। আজও তাই হয়েছে। আমরা আরও সহজে জিততে পারতাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিন পয়েন্ট পেয়েছি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ!’
এই জয়ের সুবাদে লিভারপুল দ্বিতীয় ম্যাচ জিতে টটেনহ্যাম ও আর্সেনালের সঙ্গে সমান ছয় পয়েন্টে। পরের ম্যাচেই মুখোমুখি গানার্স বাহিনী। অন্যদিকে দুই ম্যাচে জয়হীন নিউক্যাসল এখনও তিন পয়েন্টের খোঁজে। ট্রান্সফার উইন্ডো বন্ধ হওয়ার আগে আলেকজান্ডার ইসাকের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
যদিও আর সবকিছু ছাপিয়ে সোমবারের রাত মনে থাকবে এক কিশোরের নামেই। রিও এনগুমোহা! যাঁর এই বয়সে স্কুলের বেঞ্চে বসে থাকার কথা, সেই তিনিই কিনা লিভারপুলকে এনে দিলেন শেষ মুহূর্তের জয়। মরশুমের বাকি ম্যাচগুলোয় সবার চোখ থাকবে রিও-র দিকে।