রবার্তো পরে বৌদ্ধধর্মে আশ্রয় পেয়েছিলেন। কুড়িয়েছিলেন সমর্থকদের ভালোবাসাও। ব্যর্থতার চেয়ে প্রতিভা বড় হয়ে উঠেছিল শেষমেশ। বাস্তোনিও হয়তো সেই পথেই হাঁটবেন। ইউরো ২০২৮ আসছে। পুনর্জন্মের সুযোগ পাবেন। কিন্তু সেই পথ কণ্টকিত, সুদীর্ঘ, কঠিন। ইতালির ট্র্যাজিক নায়কদের কেউই কিন্তু সহজে মুক্তি পাননি।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 1 April 2026 16:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘বিধির বিধি কে পারে খণ্ডাতে?’
মেঘনাদবধ কাব্যের অন্তিম সর্গে সারথি সারণের সামনে এই সওয়াল রেখেছিলেন রাবণ… হতশ্বাস রাবণ, স্বর্ণলঙ্কা বেহাত হচ্ছে দেখে বিমূঢ় ‘রাবণরাজা’! পুত্রশোকের যন্ত্রণা, রাজচ্যুত ও অনিবার্য মৃত্যুকে ধীরপায়ে আসতে দেখার হতাশাকে বিধির লিখন ভেবেই বিনাশকালে সান্ত্বনা পেতে চেয়েছিলেন মধুসূদনের নায়ক। কিন্তু গ্রিক নিয়তিবাদ তো স্রেফ অদৃষ্টের কথা বলে না৷ চরিত্রের সমূহ ধ্বংসের অন্তরালে কাজ করে যে বিনাশী শক্তি, যা কিনা তারই বিশেষ আচরণে সুপ্ত (অ্যারিস্টটল যাকে হামার্শিয়া বলবেন), তাকেও পিঠোপিঠি এনে হাজির করেছেন মধুকবি। এর ঘোষক, স্বাভাবিকভাবে, বিভীষণ। যিনি মৃত্যুপথযাত্রী বীর ভ্রাতষ্পুত্র ইন্দ্রজিৎকে জানিয়ে দেন তাঁকে গঞ্জনা দেওয়া বৃথা৷ তিনি ‘জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি’ ভুলেছেন বলে সবকিছু রসাতলে গেল, এমনটা ভাবা মূঢ়তা মাত্র। পতনের বীজ লুকিয়ে অন্যত্র। কোথায়? বিভীষণের মন্তব্য, ‘নিজ কর্ম দোষে হায় মজাইলা/ এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি।’
অর্থাৎ, বিধির বিদ্বেষ নয়… চিরন্তন স্খলনের আসল কারণ কর্মদোষ৷ নায়কের নৈতিক বিচ্যুতি নয়… সিদ্ধান্তগ্রহণের বিশেষ কোনও চ্যুতি। যা ধাপে ধাপে চরম পতন ঘনিয়ে আনে৷
ইতালির বিশ্বকাপে খেলতে না পারার (ক্রমান্বয়ে তিন বার) সূত্রে ধান ভানতে শিবের গীত গাইলাম কেন, তার আড়ালে আসলে একটাই প্রশ্ন: আজুরিদের এই ট্র্যাজিডির উৎস কোথায়? চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন টিমের এহেন নিষ্ক্রমণ স্রেফ ভাগ্যবিড়ম্বনা? নাকি কর্মদোষ? কর্তব্যে বিচ্যুতি? কোনও এক বিশেষ ভ্রান্তি, যা চূড়ান্ত বিপর্যয়ের ভেরীঘোষ ফুঁকেছে? ইন্টার মিলানের মতো শীর্ষস্তরের ক্লাবের হয়ে খেলা ডিফেন্ডার বাস্তোনি গতরাতে যে ‘ভুল’ করলেন, শিশুসুলভ সেই ‘ভুল’, যা আখেরে সমূহ সর্বনাশ ঘনিয়ে আনল, তা থেকে থেকে কেন নতশির, হতবীর্য রবার্তো বাজ্জিও-র স্মৃতি উসকে চলেছে? ভেসে উঠছে একবারও বিশ্বকাপ না জেতা পাওলো মালদিনির অশ্রুসজল মুখ? এ কি শুধুই বিধির বিধি? নাকি কর্মদোষেই আখেরে মজে যাওয়ার অনিঃশেষ ঘূর্ণায়মান চক্র?
ট্র্যাজেডির জন্মমুহূর্ত: একটি ট্যাকল, একটি লাল কার্ড
গতরাতের বিপর্যয়ের কেন্দ্রে আলেসান্দ্রো বাস্তোনি (Alessandro Bastoni)। আধুনিক ডিফেন্ডার—শান্ত, বিচক্ষণ, বল পায়ে খেলতে পারদর্শী। ইতালির (Italy) ভবিষ্যৎ রক্ষণভাগের স্তম্ভ হিসেবেই ধরা হচ্ছিল তাঁকে। কিন্তু ফুটবল, বিশেষ করে নকআউট ম্যাচ, কখনও কখনও একটি মুহূর্ত সমস্ত হিসেব বদলে দেয়। বসনিয়ার (Bosnia and Herzegovina) বিরুদ্ধে প্লে-অফ ফাইনালে ঠিক সেটাই হল।
প্রথমার্ধের প্রায় অন্তিম লগ্নে কাউন্টার অ্যাটাক। বাস্তোনি শেষ প্রহরী। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নেই। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে ট্যাকল করে বসলেন। আলগা ট্যাকল, কিন্তু জোরালো ভুল। বাঁশি বাজালেন রেফারি। কালক্ষেপ না করেই লাল কার্ড।
ট্র্যাজেডির সূচনা এখানে। কারণ এই মুহূর্তটাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইতালি প্রাণপণ লড়েও শেষমেশ হারতে বাধ্য হয়। সমূহ বিনাশের লক্ষণই তাই। নায়ক ঠিক ইন্দ্রজিতের মতো লড়ে যাবে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে। কিন্তু আখেরে পতন অবধারিত, অনিবার্য! দোনারুমা, বারেল্লাদের সঙ্গেও ঠিক সেটাই হল। পেনাল্টি তক পৌঁছেও লাভের লাভ হল না। মর্মান্তিক পরাজয়ে বিশ্বকাপের দরজা ফের একবার বন্ধ।
এই ট্র্যাজিক পরিণতির ময়নাতদন্তে সামনে চলে আসছে বাস্তোনির ‘ভুল’। একজন ডিফেন্ডারের বিচ্যুতি হতেই পারে। কিন্তু সেই ভ্রান্তিই যদি বিপর্যয়ের সূত্রধর হয়ে ওঠে, পূর্বতন বিপর্যয়ের স্মৃতি ঘনিয়ে তোলে, তাহলে তা সর্বার্থে প্রতীকময় নয় কি?
বাজ্জিওর ছায়া: ব্যর্থতার চেয়েও বড় প্রতীক
এই জায়গাতেই প্রতীকের অন্যতম সূচনামুখ হয়ে ফিরে আসছে রবার্তো বাজ্জিওর নাম (Roberto Baggio)। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 1994), পাসাডেনার ময়দানে। সেবার ইতালিকে প্রায় একা হাতে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস তাঁর অনন্য গোল মনে রাখেনি। মনে রেখেছে শেষ পেনাল্টিটুকু। ট্র্যাজিক স্পটকিক! যিনি হাসতে হাসতে বল জালে জাড়ান, তিনিই সেদিন আকাশে ওড়ালেন! তারপর চারপাশে ব্রাজিল খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাসের মধ্যে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেন… সেকেন্ড পেরিয়ে মিনিট। নতমুখ উঠল না!
বাস্তোনির লাল কার্ডও ঠিক তেমনই। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের ভুল। কিন্তু বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনপর্বে একমাত্র নরওয়ের বিরুদ্ধে দু-লেগের ম্যাচ বাদ দিলে রক্ষণকে কার্যত মার্শালের মতো পরিচালনা করেছেন যিনি, তিনিই কিনা কাণ্ডজ্ঞানহীন ট্যাকল করে দলকে ভরাডুবির কিনারে ঠেলে দিলেন। তাড়াহুড়োয় নেওয়া একটা সিদ্ধান্ত পুরো জাতির স্বপ্ন ভেঙে দিল।
রক্ষণের ট্র্যাজেডি: মালদিনি, বারেসি থেকে বাস্তোনি
ইতালির ফুটবল সংস্কৃতির মূল ভিত রক্ষণভাগ। শৈলীর পোশাকি নাম ‘কাতেনাচ্চিও’ (Catenaccio)। মোদ্দা দর্শন: বিপক্ষের চাপ সহ্য করো, প্রাণপণ ঠেকিয়ে চলো, তারপর সুযোগ বুঝে আক্রমণ শানাও। এই তত্ত্বে ‘ভুলে’র জায়গা নেই। একবারের ত্রুটি মানেই চরম শাস্তি।
কিন্তু ‘কাতেনাচ্চিও’ ঘরানা-র অন্যতম পোস্টার বয় যিনি, সেই ফ্রাঙ্কো বারেসি (Franco Baresi) ১৯৯৪ ফাইনালে অসাধারণ খেলেও শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি মিস করেছিলেন। পাওলো মালদিনি (Paolo Maldini), এই প্রস্থানের আরেক সুযোগ্য ছাত্র, কোনও দিন বিশ্বকাপ জেতেননি। এই ধারাবাহিকতায় গতরাতের পর হয়তো বাস্তোনিও ঢুকে গেলেন। গোটা কোয়ালিফায়ারে প্রায় অজেয়, যেমন ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছিলেন পাওলো মালদিনি। কিন্তু সেটা কে মনে রেখেছে? স্মৃতিতে থাকবে ক্লিয়ারেন্সের ভুল আর এক শিশুসুলভ ট্যাকল!
চক্রবৎ পতন
এই বিপর্যয় একদিনে তৈরি হয়নি। ২০২২ বিশ্বকাপেও ইতালি বাদ পড়ে। নেপথ্যে জর্জিনহোর (Jorginho) পেনাল্টি মিস। যিনি স্পটকিক থেকে প্রশ্নাতীত সফল, তিনিও লক্ষ্যচ্যুত! অর্থাৎ, একই গল্প বারবার। একজন তারকা খেলোয়াড়, একটি তুঙ্গ মুহূর্ত আর সেই মোক্ষম প্রহরে নির্মম ভ্রান্তি—সব মিলিয়ে চূড়ান্ত বিপর্যয়। এই পতন শুধু বিধির বিধান নয়। সিদ্ধান্তের ভুল, কাঠামোর ফাঁক, দলের মানসিকভাবে ভেঙে পড়া—সব মিলিয়ে চক্রবৎ জেগে ওঠে ঘোরতর ট্র্যাজেডির প্লট।
বাস্তোনির লাল কার্ড একটি ব্যক্তির ভুল, কিন্তু সংকট অনেক গভীরে। ঘরোয়া ক্লাব ফুটবলে ধীরগতি, তরুণ প্রতিভা তৈরিতে ব্যর্থতা, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ক্রম অবনতি—সবকিছু মিলিয়ে একটা পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়েছে। অর্থনীতি যখন দুর্বল হয়, শুধু মন্ত্রীকে দায়ী করা যায় না। ইতালির ফুটবলের এই মুহূর্তের দুর্দশা ঠিক তেমনই।
বাস্তোনির সামনে এখন কী?
২৬ বছর বয়স। ইন্টার মিলানে দুর্দান্ত। বার্সেলোনার মতো বড় ক্লাব তাঁকে নিতে চাইছে। কিন্তু ইতালির সমর্থকদের স্মৃতিতে লাল কার্ডটা গেঁথে থাকবে—বাজ্জিওর মিসড পেনাল্টির পাশে। রবার্তো পরে বৌদ্ধধর্মে আশ্রয় পেয়েছিলেন। কুড়িয়েছিলেন সমর্থকদের ভালোবাসাও। ব্যর্থতার চেয়ে প্রতিভা বড় হয়ে উঠেছিল শেষমেশ। বাস্তোনিও হয়তো সেই পথেই হাঁটবেন। ইউরো ২০২৮ আসছে। পুনর্জন্মের সুযোগ পাবেন। কিন্তু সেই পথ কণ্টকিত, সুদীর্ঘ, কঠিন।
ইতালির ট্র্যাজিক নায়কদের কেউই কিন্তু সহজে মুক্তি পাননি।