এই হার শুধু একটা মর্মান্তিক পরাজয় নয়। এর জেরে পরপর তিনবার বিশ্বকাপ মিস করল ইতালি—২০১৮, ২০২২, আর এবার ২০২৬। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের নজিরবিহীন পতন।

বিশ্বকাপে নেই ইতালি
শেষ আপডেট: 1 April 2026 07:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কখন ঘনিয়ে আসে ট্র্যাজেডি? কীসের জেরে কোনও চরিত্র তলিয়ে যায় দু:স্বপ্নের নিহিত পাতালছায়ায়? অ্যারিস্টটল পোয়েটিকসে লিখছেন, অদৃষ্ট বা নিয়তি নয়। মানুষের কর্মেই বোনা থাকে পতনের বীজ। একটা ভুল, একটা ছোট্ট বিচ্যুতিই ঠেলে দিতে পারে অতলান্ত খাদে। তিনি এই স্খলনের নাম দেন ‘হামার্শিয়া’ (Hamartia)।
বসনিয়ার মাঠে ফ্লাডলাইটের নীচে ১০ হাজার সমর্থকদের গমগমে স্লোগানে মুখরিত ময়দানে অ্যারিস্টটলের সেই প্রবচনই যেন মঞ্চস্থ হল৷ ট্রাজেডিকে থাবা ফেলে ঘনিয়ে আসতে দেখল ইতালি। ট্র্যাজিক নায়কের নাম? আলেসান্দ্রো বাস্তোনি।
বিশ্বকাপে যাওয়ার চূড়ান্ত লড়াই। দল এগিয়ে এক গোলে। তরুণ ডিফেন্ডারের কোনও প্রয়োজনই ছিল না অহেতুক অবৈধ ট্যাকল করে মাঠের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার! কিন্তু তিনি মুহূর্তের সিদ্ধান্তহীনতায় ঠিক সেটাই করলেন৷ আর এই একফালি হামার্শিয়া-ই ছিটকে দিল আজুরিদের। দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় অন্তিম লগ্নে সমতা ফেরাল বসনিয়া ও হারজেগোভিনা। এরপর মরণপণ রক্ষণে এডিন জেকোদের ঠেকিয়ে রাখলেও লাভের লাভ হল না। খেলা গড়াল পেনাল্টি শুটআউটে। যেখানে বাস্তোনির বিপর্যয়ের অনিবার্য পরিণাম একে একে, ধাপে ধাপে প্রদর্শিত হল। দু-দুটো পেনাল্টি মিস! যে শুট আউটে বিশ্বকাপ ছিনিয়ে নেওয়া (২০০৬), ইউরো-জয়… সেই বাণই শেল হয়ে বিঁধল (Italy Fails to Qualify World Cup)! পরপর তিনবার বিশ্বফুটবলের চূড়ান্ত মঞ্চে নামার সুযোগ হারাল ইতালি। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এবারও আমেরিকা-মেক্সিকোর টুর্নামেন্টে দেখা যাবে না।
এগিয়ে থেকেও ভাঙন
ম্যাচের শুরুটা খারাপ হয়নি ইতালির (Italy)। স্ট্রাইকার মোইসে কিন (Moise Kean) গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। সেই মুহূর্তে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি আজুরিদের হাতে। কিন্তু প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে বদলে যায় চিত্রনাট্য। আলেসান্দ্রো বাস্তোনি (Alessandro Bastoni) লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। ১০ জনে নেমে আসে ইতালি। আর সেখান থেকেই ম্যাচের মোড় ঘোরা শুরু।
শেষ মুহূর্তে ধাক্কা
পুরো দ্বিতীয়ার্ধে চাপ ধরে থাকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (Bosnia and Herzegovina)। শেষ পর্যন্ত ৭৯ মিনিটে হারিস তাবাকোভিচ (Haris Tabakovic) সমতা ফেরান। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। কিন্তু তাতেও জয়সূচক গোল আসেনি। ইতালি ‘কাতানেচিও’ ঘরানা মেনে প্রাণপণে রক্ষণ চালিয়ে যায়, যদিও ১০ জনে পাহাড়প্রমাণ চাপ সামলানো মোটেও সহজ ছিল না।
পেনাল্টিতে বিপর্যয়
বিজয়ীর খোঁজে নিয়ম মেনে টাইব্রেকার। কিন্তু সেখানে পৌঁছতেই অতীতের ভূত ফিরে আসে। পিও এসপোসিতো (Pio Esposito) ও ব্রায়ান ক্রিস্তান্তে (Bryan Cristante)—দু’জনেই পেনাল্টি মিস করেন। অন্যদিকে বসনিয়া নিখুঁত, অভ্রান্ত। যাঁরা ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন, মায় বছর আঠারোর তরুণও, সকলেই দোনারুমাকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ালেন। শেষমেশ ৪-১ ব্যবধানে শুটআউট জিতে নিলেন এডিন জেকোরা।
ইতিহাসে কলঙ্ক
এই হার শুধু একটা মর্মান্তিক পরাজয় নয়। এর জেরে পরপর তিনবার বিশ্বকাপ মিস করল ইতালি—২০১৮, ২০২২, আর এবার ২০২৬। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের নজিরবিহীন পতন। অন্যদিকে বসনিয়ার কাছে স্বপ্নপূরণ! বড় সাফল্য! ২০১৪-র পর আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলতে নামার সুযোগ৷
কিংবদন্তি গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফোঁ জানিয়েছিলেন, এবারও ছিটকে গেলে দেশের ঘরোয়া ফুটবলকে ঢেলে সাজানো, সবকিছু শূন্য থেকে আরম্ভ করা জরুরি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, পাওলো মালদিনি-পাওলো রোসিদের দেশকে এবার সেই লম্বা, সুদীর্ঘ পথ ধরেই হাঁটা শুরু করতে হবে৷