সোবস্লাই নিজে হয়তো এখনও জুনিনিয়ো বা বেকহ্যামের মতো শিল্পীর স্তরে পৌঁছননি। কিন্তু আর্সেনালের বিরুদ্ধে তাঁর শট মৃতপ্রায় শিল্পকে এক ঝলকে জীবন্ত করে তুলেছে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 1 September 2025 14:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুহূর্তটা সিনেম্যাটিক। ফ্রিজ ফ্রেমে ফুটবলের অনুপম ভাস্কর্য!
৮২ মিনিটে অ্যানফিল্ড স্তব্ধ, টানটান রুদ্ধশ্বাসে গ্যালারিজুড়ে পিনপতনের নীরবতা। দূরত্ব প্রায় ৩২ গজ। সামনে দাঁড়িয়ে কড়া শৃঙ্খলায় সাজানো রক্ষণের দেওয়াল। গোলের তোরণ পাহারায় ডেভিড রায়া—এই মুহূর্তে প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোলকিপারদের একজন।
এমন ঘেরাটোপ ডিঙিয়ে ডমিনিক সোবস্লাই (Dominik Szoboszlai) যে বাঁকানো শটে বল জড়ালেন ক্রসবারের ভেতর ঘেঁষে, তা নিছক গোল নয়, বহু ব্যবহারে জীর্ণ হলেও একে ‘শিল্পকর্ম’ ছাড়া অন্য কিছুর তকমা দেওয়া চলে না। রায়ার কিছু করার ছিল না… অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া। চেয়ে রইলেন, তারপর করুণ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে স্বীকার করলেন—এটা আটকানো তাঁর পক্ষে কার্যত অসম্ভব।
Sit back and enjoy every angle of THAT Dominik Szoboszlai free-kick 😮💨 pic.twitter.com/XadhY8wuB9
— Premier League (@premierleague) August 31, 2025
লিভারপুল-আর্সেনালের হেভিওয়েট লড়াইয়ে ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াল একটি দুর্দান্ত ফ্রি-কিক… যেখান থেকে এল ম্যাচের একমাত্র গোল। ফ্রি-কিকের সৌন্দর্য অনেক দেখেছে ফুটবল দুনিয়া। কিন্তু অ্যানফিল্ডে রবিবার রাতে যা ঘটল, তা সাম্প্রতিক জমানার নিরিখে ‘বিরল’। এই মন্তব্যে এতটুকু অতিরঞ্জন নেই। যে সাবলীল কায়দায় শট মারলেন, সেই একই সুর ম্যাচ শেষে সোবস্লাইয়ের গলায় ঝরে পড়ল, ‘ভাবলাম রিস্কটা নেই। আত্মবিশ্বাস ছিল, তাই চেষ্টা করলাম!’
কথাটা শুনতে যত সহজ, বাস্তবে ততটাই কঠিন। শটটা আদতে নিখুঁত স্টাডি আর ভরপুর প্র্যাকটিসের ফসল। রায়া যে সাধারণত একদিকে লাফ দেন, তা আগেভাগেই হিসেব কষে রেখেছিলেন হাঙ্গেরীয় মিডফিল্ডার। বলের বাঁক, ডিপ আর গতি—সব মিলিয়ে নিখুঁত।
ফ্রি-কিক আসলে অঙ্ক আর শিল্পের মিশেল। কেউ মাপে কোণ, কেউ ভরসা রাখে অনুশীলনে। কেউ আবার অন্তর্দৃষ্টিতে খুঁজে নেয় নতুন পথ। সোবস্লাইয়ের শটটাও এই ত্রিভুজের নিখুঁত হাতেগরম উদাহরণ।
আর এখানেই উঠে আসেছে আসল প্রশ্ন—সোবস্লাইয়ের গোল কি এই সেট পিস কলাকে ফের বাঁচিয়ে তুলতে পারে? কারণ, আজকের জমানায় সরাসরি ফ্রি-কিক আক্ষরিক অর্থে বিলুপ্তপ্রায় শিল্প। যার পরিসংখ্যান রীতিমতো ভয়ংকর। ২০১৮–১৯ মরশুমে প্রিমিয়ার লিগে সরাসরি ফ্রি-কিক হয়েছিল ৩৮৪ বার। গত মরশুমে নেমে এল ২৮৩–তে। কনভার্শন রেটও কমেছে: ৬.৪৯ শতাংশ থেকে ৩.৮৮ শতাংশে। হিসেব বলছে, প্রতি কুড়িবারের চেষ্টায় সাকল্যে একটা গোল হয়। তাই অনেক দলই নিরাপদ রাস্তা বেছে নিচ্ছে—বক্সে বল তোলো, হেডে ভরসা রাখো বা ডিফ্লেকশনের অপেক্ষা করো।
লিভারপুলেরই উদাহরণ নেওয়া যাক। ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ডের মতো ‘মাস্টার’ হাতে থাকা সত্ত্বেও গত মরশুমে সরাসরি একবারও ডিরেক্ট ফ্রি-কিকে গোল হয়নি। আর্সেনালের অবস্থাও তথৈবচ। মার্টিন ওডেগার্ড ২০২১ সালে বার্নলির বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার লিগে শেষ সরাসরি ফ্রি-কিক গোল করেন।
যদিও সবসময় এমন পরিস্থিতি ছিল না। নয়ের দশক থেকে বিশের দশক—প্রতি দলে থাকত একাধিক ফ্রি-কিক স্পেশালিস্ট। জুনিনিয়ো পারনামবুকানো (৭৭ গোল), জিদান, জোলা, পিরলো, বেকহ্যাম—নাম নিতে গেলে তালিকা ফুরোয় না। লিওনেল মেসির ৬৯ গোল কিংবা রোনাল্ডোর ৬৪ গোলও দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক যুগে ফ্রি-কিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
ধীরে ধীরে সেট-পিস কৌশলে দলগুলো মাথা ঘামালেও সরাসরি ফ্রি-কিকে বিনিয়োগ কমিয়েছে। ‘সেফার বেট’হিসেবে কর্নার-ভিত্তিক স্ট্র্যাটেজি বেছে নেওয়া হয়েছে। ফল? ফ্রি-কিক শিল্পীরা কার্যত ফুটবলের বিপন্ন প্রজাতি। হাতেগোনা কয়েকজন রয়েছেন—জেমস ওয়ার্ড-প্রাউস (James Ward-Prowse) তাঁদের সেরা উদাহরণ। যিনি ইতিমধ্যে বেকহ্যামের প্রিমিয়ার লিগ রেকর্ডের (১৮ গোল) কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন। এখন নটিংহ্যাম ফরেস্টে লোনে। তাই আলোচনার কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে।
এই পরিস্থিতিতে সোবস্লাইয়ের গোল ছিনিয়ে আনা শটকে নিছক তিন পয়েন্টে আটকে রাখা যায় না। এটি মনে করিয়ে দিয়েছে—একটুখানি সাহস আর খানিক শিল্পবোধ থাকলে এখনও ফ্রি-কিক গোল হতে পারে ময়দানের নান্দনিক মুহূর্ত। সোবস্লাই নিজে হয়তো এখনও জুনিনিয়ো বা বেকহ্যামের মতো শিল্পীর স্তরে পৌঁছননি। কিন্তু আর্সেনালের বিরুদ্ধে তাঁর শট মৃতপ্রায় শিল্পকে এক ঝলকে জীবন্ত করে তুলেছে।