শেষ পর্যন্ত লাপোর্তার ইমেজ দুটো প্রশ্নের মধ্যে আটকে থাকবে। তিনি সেই নায়ক, যিনি বার্সেলোনাকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন? নাকি সেই ভিলেন, যিনি বার্সেলোনার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়কে দু’বার বন্ধ দরজা দেখিয়েছেন?

মেসি ও লাপোর্তা
শেষ আপডেট: 10 March 2026 16:27
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফুটবল দুনিয়ায় এমন কিছু গল্প থাকে, যেগুলো শুধু মাঠের ভেতরে নয়, ময়দানের বাইরে ঘনিয়ে ওঠে। ক্ষমতার লড়াই, রাজনীতির প্যাঁচ, বিশ্বাসঘাতকতার ছুরিকাঘাত—সব মিলিয়ে জমজমাট, জটিল নাটক!
লিওনেল মেসি (Lionel Messi) ও বার্সেলোনার কাহিনিও ঠিক তেমনই সর্পিল। ভিন্ন গোলার্ধ থেকে খানিক অনিশ্চয়তা বুকে নিয়ে উড়ে এসে যিনি ক্লাবকে সারাটা জীবন দিয়ে গেলেন, তাঁকেই মাথা নীচু করে বিদায় নিতে হল। আসল কারণ ঠিক কী?
এতদিন আড়ালে থাকার পর এবার ছাইচাপা অতীত থেকে বেরিয়ে এল গনগনে ধোঁয়া-ওঠা অভিযোগ! তুললেন যিনি, তিনি বার্সেলোনার প্রাক্তন খেলোয়াড় ও কোচ জাভি হার্নান্দেজ (Xavi Hernandez)। সরাসরি জানালেন, ২০২৩ সালে মেসির প্রত্যাবর্তন আটকে দেন স্বয়ং ক্লাব সভাপতি জোয়ান লাপোর্তা (Joan Laporta)। সিজনের অন্ত্যভাগে, বিশ্বকাপ যখন আসন্ন, তখন এমন অভিযোগ যতটা বড়, ততটাই বিতর্কিত।
কিন্তু আসল সত্যিটা ঠিক কী?
জাভির বিস্ফোরণ: যা বললেন প্রাক্তন কোচ
অতিসম্প্রতি স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘লা ভানগার্দিয়া’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাভির অভিযোগ, তিন বছর আগে মেসির বার্সেলোনায় ফেরা জোরালো হয়ে ওঠে। স্পেনের ফুটবল নিয়ামক সংস্থা লা লিগা (La Liga) নাকি ভেতরে ভেতরে সবুজ সংকেতও দিয়েছিল।
তাহলে কেন ফিরলেন না মেসি? জাভির দাবি, লাপোর্তা নিজেই নাকি এই মহাকাব্যিক কামব্যাক চাননি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রাক্তন ম্যানেজারের অভিযোগ তিনটি জায়গায় দাঁড়িয়ে। প্রথমত, লা লিগা ২০২৩-এ একটা সম্ভাব্য পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিল, যার অর্থ: মেসিকে নথিভুক্ত করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, লাপোর্তা ভয় পাচ্ছিলেন, আর্জেন্তিনীয় মহাতারকা ফিরলে ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ হয়তো তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে যাবে! মেসির মতো কিংবদন্তি থাকলে তিনি নন, মেসিই হবেন যাবতীয় মনোযোগের কেন্দ্র। তৃতীয়ত, জাভিকে বলা হয়েছিল, ফেয়ার প্লে নিয়মের কারণে মেসিকে আনা ‘অসম্ভব’। কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন, সুযোগ বেশ প্রবল-ই ছিল—রাজনৈতিক সদিচ্ছেটুকুই কেবল ছিল না।
লা লিগার সভাপতি হাভিয়ের তেবাস পরে জানিয়েছেন, জাভির দাবি ‘সত্য নয়’। বার্সেলোনার তরফে কেউ তাঁদের সঙ্গে মেসি প্রসঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। তাহলে কে ঠিক বলছেন? কে ভুল?
টাকার অঙ্ক নাকি রাজনীতির খেলা?
২০২৩ সালে বার্সেলোনার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় একশো কোটি ইউরোরও বেশি। এর আগের বছর দল বাঁচাতে ভবিষ্যতের আয়ের একটা অংশ বন্ধক রেখে টাকা তোলা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে মেসিকে আনার জন্য বড় অঙ্কের বেতন দেওয়া সহজ হতে পারে না।
লাপোর্তার সমর্থকদের বক্তব্য, এটা নিছক অর্থনৈতিক পিছুটান। মেসিকে সই করাতে গেলে বড় খেলোয়াড়দের হয় বিক্রি করতে হত, নয়তো কোপ পড়ত বেতনে। সেটা করলে গাভি বা আরাউহোর মতো তরুণ তারকাদের নথিভুক্তি ঝুঁকিতে পড়ত। ক্লাব বাঁচানো বনাম মেসিকে ফিরিয়ে আনার দ্বন্দ্বে লাপোর্তা ক্লাবকেই বেছে নিয়েছেন।
কিন্তু সমালোচকরা বলছেন অন্য কথা। তাঁদের দাবি, লাপোর্তা ইচ্ছা করেই প্রক্রিয়াটা ঝুলিয়ে রাখেন। কোনও নিশ্চিত চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, মৌখিক আশ্বাসটুকু ছাড়া। মেসির মতো মানুষ, যিনি একবার ধোঁকা খেয়েছেন, তিনি সঙ্গত কারণেই স্রেফ মুখের কথায় ভরসা রাখেননি।
২০২১ সালের ক্ষত: কেন অপেক্ষা করেননি লিও?
২০২১ সালের ঘটনা না জানলে ২০২৩-এর গল্পটা বোঝা যাবে না। সেই গ্রীষ্মে মেসি ছুটি থেকে ফিরে নতুন চুক্তি সই করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু এক রাতে ডিনার টেবিলে লাপোর্তা তাঁকে জানিয়ে দেন, চুক্তি হবে না। ক্লাবের আর্থিক সমস্যার কারণে তা সম্ভব নয়।
সেদিন কেঁদেছিলেন মেসি। তারপর কিচ্ছুটি না বলে পিএসজিতে চলে যান। দুই মরসুম ছিলেন। সময়টা ভাল যায়নি। ২০২৩ সালে যখন বার্সেলোনা ফের যোগাযোগ করল, মেসি একটাই শর্ত রেখেছিলেন— নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি! অনিশ্চয়তায় থাকতে রাজি নন। লাপোর্তা সেই নিশ্চয়তা দিতে পারেননি বা দেননি। ফলে সময় নষ্ট না করে মেসি ইন্টার মায়ামিতে (Inter Miami) সই করেন। পরে নিজেই পরে বলেছিলেন, ‘আমি আর আমার ভবিষ্যৎ অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে চাইনি!’ এই এক বাক্যেই বোঝা যায়, ২০২১ সালের ক্ষত কতটা গভীর ছিল।
লাপোর্তার পাল্টা যুক্তি: আত্মপক্ষ সমর্থন
লাপোর্তাও চুপ করে বসে নেই। জাভির অভিযোগের পরদিনই তিনি জানালেন, প্রাক্তন কোচের বক্তব্য 'ঠিক নয়'। তাঁর দাবি, মেসির বাবা হোর্হে মেসি (Jorge Messi) তাঁকে জানিয়েছিলেন, যে পিএসজিতে দুই কঠিন বছরের পর লিও এমন একটা জায়গায় যেতে চান, যেখানে চাপ কম। অথচ বার্সেলোনা মানেই প্রত্যাশার জাঁতাকল! কেরিয়ারের প্রান্তলগ্নে সেই ভার আর নিতে চাননি আর্জেন্তিনীয় সুপারস্টার।
দ্বিতীয় যুক্তি, আর্থিক দায়িত্ববোধ। ক্লাব সভাপতি হিসেবে প্রথম কর্তব্য বার্সেলোনাকে টিকিয়ে রাখা। মেসিকে আনতে গিয়ে তরুণ খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
কিন্তু সমস্যা হল, এই ব্যাখ্যাগুলো বারবার নির্বাচনের আগে সামনে আসে। এবারও একই ছবি। বার্সেলোনার সভাপতি নির্বাচন আসন্ন। লাপোর্তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভিক্টর ফন্ট। জাভি যাঁর অন্যতম সমর্থক। ফলে এই অভিযোগের পেছনে রাজনীতি আছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। যা কিনা পুরোপুরি ফেলে দেওয়া যায় না।
‘নরম ভেটো’: আসল সত্য কোথায়?
সব তথ্য, সব যুক্তি মিলিয়ে একটা ছবি উঠে আসে। লাপোর্তা হয়তো সরাসরি ‘না’ বলেননি। কিন্তু মেনে নিতে হবে, তিনি ‘হ্যাঁ’ বলার মতো পরিবেশও তৈরি করেননি। কংক্রিট প্রস্তাবের বদলে দেওয়া হয়েছিল অস্পষ্ট আশ্বাস। প্রক্রিয়া এগোনোর বদলে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল সিদ্ধান্ত। একে বলা যায় ‘নরম ভেটো’—সরাসরি আটকানো নয়, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ফিরে আসার রাস্তাটা বন্ধ করে দেওয়া।
অর্থনৈতিক দিক থেকে হয়তো লাপোর্তার যুক্তিতে সত্যতা আছে। কিন্তু ব্যক্তিগত দিক থেকে দেখলে অন্য ছবি। ২০২১ সালের পর মেসি পরিবারের সঙ্গে লাপোর্তার সম্পর্ক আর আগের মতো ছিল না। তাঁর প্রত্যাবর্তনে ২০২১ সালের সেই ডিনার টেবিলের ঘটনাটা সামনে চলে আসতে পারত। প্রেসিডেন্টের ভাবমূর্তির জন্য সেটা সুখকর হত কি?
শেষ পর্যন্ত লাপোর্তার ইমেজ দুটো প্রশ্নের মধ্যে আটকে থাকবে। তিনি সেই নায়ক, যিনি বার্সেলোনাকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন? নাকি সেই ভিলেন, যিনি বার্সেলোনার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়কে দু’বার বন্ধ দরজা দেখিয়েছেন? বিশেষজ্ঞদের বিচারে, দুটোই হয়তো সমানভাবে সত্যি। আর সেখানেই লুকিয়ে এই গল্পের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।