আসলে এখনকার প্রিমিয়ার লিগ অনেকটাই সমীকরণ-ভিত্তিক ফুটবল। কোন জায়গায় কতটা সম্ভাবনা—সেই অঙ্ক কষে গোল করছে প্রায় সমস্ত টিম।

ছবি: গুগল
শেষ আপডেট: 20 November 2025 15:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রিমিয়ার লিগে গোল মানেই আগুনঝরা আক্রমণ, তড়িৎগতির কাউন্টার অ্যাটাক, পাসিং-এর ব্যালে—এই ধারণা হয়তো এবার পুরনো হতে চলেছে! কারণ এবারের মরসুমের ট্রেন্ড যা বলছে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প। ওপেন প্লে-তে (open play) গোল যেন ক্রমশ পড়তির দিকে। বাড়ছে কর্নার, ফ্রি-কিক, লং থ্রো—অর্থাৎ পুরোপুরি ‘ডেড বল’নির্ভর ফুটবল। দর্শক বিরক্ত। বিশ্লেষকরা বিস্মিত!
সিজনের প্রথম ১১ ম্যাচউইক শেষের হিসেব ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। ওপেন প্লে গোল কমেছে ৩৯। উল্টোদিকে সেট-পিসে (set-piece) এসেছে ২৬ খানা বেশি গোল। মোট শট নেওয়ার সংখ্যাও কমে গেছে বিস্ময়করভাবে—৩৭০টা! অর্থাৎ দলগুলো খোলা খেলায় সুযোগ তৈরি করতে ধুঁকছে, বরং যতটা পারছে ডেড-বল থেকে খোঁচা মারছে। বদলে যাচ্ছে আধুনিক ফুটবলের ডিএনএ।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—হঠাৎ কেন এমন বদল? ইংল্যান্ডের ফুটবল কি রক্ষণশীল হয়ে পড়ছে? নাকি কোচদের মনোভাব বদলে গেছে? ওপেন প্লে গোল কমছে কারা সবচেয়ে দায়ী?
হিসেবমতে, সবচেয়ে বড় পতন উলভসের (Wolves)। ১১ ম্যাচে ওপেন প্লেতে তাদের গোল স্রেফ ৪টি—গত বছরের তুলনায় ১০ কম! তারপর তালিকায় রয়েছে মূলত লন্ডনের দলগুলো—চেলসি (Chelsea), আর্সেনাল (Arsenal), টটেনহ্যাম (Tottenham), ওয়েস্ট হ্যাম (West Ham), ফুলহ্যাম (Fulham)—সব মিলিয়ে কমেছে অন্তত ৫টি করে ওপেন প্লে গোল।
উলটো ছবি ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে (Manchester City)। পেপ গুয়ার্দিওলার দল ঠিক উলটো পথে হাঁটছে—২৩ গোলের ২২টিই এসেছে ওপেন প্লে থেকে। মানে সিটি আজও সাবেকি ‘টোটাল ফুটবল’-এ অটল—বল রাখো, জায়গা বানাও, গোল করো।
সেট-পিসে কেন এত গোল?
আসলে ডিফেন্সিভ লাইন যত উন্নত হচ্ছে, ক্লাবগুলোর বিশ্লেষণ বিভাগ যত চওড়া হচ্ছে, ম্যাচে ওপেন প্লে সুযোগ তৈরি করা ততটাই কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই কোচরা ভাবছেন—যেখানে গোল নিশ্চিত, সেই জায়গায় বাজি ধরাই কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়? আর্সেনাল ও চেলসি দু’দলই ওপেন প্লে-তে যেটুকু গোল কমিয়েছে, ঠিক ততটাই তুলে নিয়েছে কর্নার বা ফ্রি-কিক থেকে। মিকেল আর্তেতা (Arsenal) তো অনেকদিন ধরেই সেট-পিস কোচ নিয়ে কাজ করছেন। বোঝাই যাচ্ছে, বিনিয়োগ ফল দিচ্ছে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের (Manchester United) মতো দলও নতুন কোচের অধীনে দু’গুণ সেট-পিস গোল করেছে। অর্থাৎ, মাঝমাঠে আক্রমণ তৈরি করতে যদি সমস্যা হয়, সবাই হয়ে যাচ্ছে ‘ডেড বল’-এ আস্থাবান।
শট কমছে কেন?
এই হিসেব সবচেয়ে উদ্বেগজনক। পুরো লিগে ওপেন প্লে থেকে শট কমেছে ৩৭০টা—অর্থাৎ, দলগুলো আক্রমণেই উঠতে পারছে না। অ্যাটাক গড়া মুশকিল। যা গড়া হচ্ছে, সে সব মাটি হচ্ছে ফাইনাল থার্ডে গিয়ে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চমক—সেট-পিস থেকে শট বাড়েনি বিশেষ। বেড়েছে এফিশিয়েন্সি। সুযোগ কম, গোল বেশি। মানে পরিকল্পনা এতটাই নিখুঁত, যে একটা কর্নার মানেই গোল কিংবা গোলের সুযোগ। সন্ত্রস্ত প্রতিপক্ষ রক্ষণ!
ফুটবলের সৌন্দর্য হারাচ্ছে?
খোলা মাঠের পাসিং, কাউন্টার-অ্যাটাক, ২০-পাসের টিম গোল—এই সবই তো ফুটবলের আসল সৌন্দর্য। সেট-পিসে গোল অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু তা খেলার স্বাভাবিক ছন্দকে বদলে দেয়। এখনকার কোচরা বলছেন—‘জিততে হলে যা লাগে তাই করো!’ রক্ষণভাগ এত শক্তিশালী, প্রেসিং এত ধারালো, যে ওপেন প্লে থেকে সুযোগ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই কর্নার-ফ্রি-কিকই নতুন অস্ত্র!
ট্রেন্ড বদলাচ্ছে কে?
এখনও পর্যন্ত ‘সেট-পিস নির্ভর ফুটবল’-এর বাইরে একাই লড়ছে ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City)। অন্য সবাই একই নৌকার সওয়ারি। প্রমোটেড দল সান্ডারল্যান্ড (Sunderland) গতবার অবনমিত সাউথ্যাম্পটনের তুলনায় ওপেন প্লে-তে তিনখানা বেশি গোল করেছে। মানে লিগে ওঠা দলও আক্রমণের নীতিপাঠ ভুলে যায়নি!
আসলে এখনকার প্রিমিয়ার লিগ অনেকটাই সমীকরণ-ভিত্তিক ফুটবল। কোন জায়গায় কতটা সম্ভাবনা—সেই অঙ্ক কষে গোল করছে প্রায় সমস্ত টিম। এই মেট্রিক্স-দুনিয়ায় ওপেন প্লে গোল যেন বিলাসিতা। সামনে দীর্ঘ পথ। সিজন যত এগোবে, দলগুলো কি আবার আক্রমণাত্মক ফুটবলে ফিরবে? নাকি কর্নার-ফ্রি-কিকই হয়ে উঠবে আধুনিক ফুটবলের নতুন সংজ্ঞা?