পালমার যদি নায়ক হন, তাহলে চালক কোচ এনজো মারেস্কা। গেমপ্ল্যান এতটাই নিশ্ছিদ্র যে, ম্যাচ শেষে ভরপুর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘আমরা তো প্রথম ১০ মিনিটেই ওদের দম বন্ধ করে দিয়েছিলাম!’

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 14 July 2025 17:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা সময় প্যারিস ছিল শিল্পের শহর। এখন প্যারিস মানে পিএসজি (PSG)। অর্থের রাংতায় মোড়া, স্বপ্নের তারায় সাজানো, গলায় ইউরোপ দখলের সুর তুলে এগারোজন গ্ল্যাডিয়েটর ফুটবলের ময়দানে নামে এবং বেশিরভাগ সময় প্রতিপক্ষের চোখে জলে গানের অন্তিম চরণ সমে গিয়ে পৌঁছয়।
গতকাল হিসেবটা বদলে গেল। নিউ ইয়র্কের (New York) ভ্যাপসা দুপুরে, যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) আর কোল্ডপ্লে (Coldplay) একসঙ্গে ঢুকে পড়েন ফুটবলের আঙিনায়, সেখানে হঠাৎ গানের মালিকানা কেড়ে নিল চেলসি (Chelsea)। ইংল্যান্ডের সেই ক্লাব, যাদের তিন বছর আগেও বলা হয়েছিল ‘ওরা এক বিলিয়ন পাউন্ডের ভেঙে পড়া প্রজেক্ট’, তারাই কিনা ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে (Club World Cup) একপ্রকার কানমোলা দিয়ে রাংতায় সাজানো কল্পনা থেকে বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে টেনে নামাল পিএসজিকে।
ম্যাচের ফলাফল বলছে, ৩-০। রক্ষণে ‘দুর্ভেদ্য’ আর আক্রমণে ‘অপ্রতিরোধ্য’ তকমা জড়িয়ে যে প্যারিস এতদিন রাজা হয়ে বসে ছিল, সেই দলই কিনা মাত খেল। এবং খাওয়ালেন যিনি, তিনি নিউ এজ চেলসির পোস্টার বয় কোল পালমার (Cole Plamer)। কথা কম। আচরণও কেমন যেন অবিন্যস্ত! অথচ বল পায়ে আগুন ঝরে! যেমন অব্যর্থ নিশানায় গোলমুখী শট নেন, তেমনই বুদ্ধিমত্তায় গোলের দরজা হাট করে খুলে দেন। ম্যানচেস্টার সিটি থেকে আসা এই তরুণের ভেতরে একটা প্রমাণের খিদে তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলতেই থাকে। কিছুদিন অফ ফর্ম গেলে আঁচ হয়ে ওঠে আরও গনগনে। ১৮ ম্যাচ গোলের খরা। ক্রমাগত যিনি মিডিয়া-ব্যঙ্গের লক্ষ্য ছিলেন, সেই পালমারই দুই গোল করে এবং একটি অ্যাসিস্ট বাড়িয়ে ফের সংবাদ শিরোনামে!
পালমার যদি নায়ক হন, তাহলে চালক কোচ এনজো মারেস্কা (Enzo Maresca)। গেমপ্ল্যান এতটাই নিশ্ছিদ্র যে, ম্যাচ শেষে ভরপুর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘আমরা তো প্রথম ১০ মিনিটেই ওদের দম বন্ধ করে দিয়েছিলাম!’ পোড়খাওয়া সার্জেনের মতো রণকৌশল বেছে নেন মারেস্কা। ব্যথা টের পাওয়ার আগেই অস্ত্রোপচার শেষ। ম্যান-টু-ম্যান প্রেস, পিএসজির মাঝমাঠকে জ্যাম করে দেওয়া, নুনো মেন্ডেসকে বারবার টার্গেট করে উইং চেপে ধরা—সব মিলিয়ে এক অসমাপ্ত সিম্ফনিকে মাঝপথে থামিয়ে পালটা ঝংকার তোলার প্রতিস্পর্ধা দেখিয়েছেন চেলসির ইতালীয় ম্যানেজার। পিএসজি এতবার বল হারিয়েছে, হয়তো নিজেরাই বোঝেনি ম্যাচ ঠিক কোন পথে এগিয়ে চলেছে!
বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ এই জয়ের পেছনে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ খুঁজে পেয়েছেন। যে দেশে ব্যবসা মানেই অধিগ্রহণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিপুল বিনিয়োগ আর লং টার্ম ডিল, টড বোয়েলি (Todd Boehly) সেভাবেই ফুটবল ক্লাব চালাচ্ছেন! ৭-৮ বছরের চুক্তিতে তরুণ প্রতিভা কিনে এক বিরাট পিরামিড গড়ছেন—যার নিচে দাঁড়িয়ে এখনও অনেক ক্লাব হাঁসফাঁস করে মরছে। কেউ বলেছে ওটা ভুল, ওভাবে দল বানানো যায় না। কেউ বলেছে, বিত্ত আছে, বিদ্যেটা নেই। কিন্তু এই সাফল্য, তার আগে কনফারেন্স লিগ জিতে ফেলা আসলে অবিশ্বাসী, সংশয়ীদের পিঠই দেয়ালে ঠেকিয়েছে।
চেলসির এই স্কোয়াডে কারও বয়স সাতাশের বেশি নয়। মাঝমাঠে কাইসেডো-এঞ্জো, ডিফেন্সে কুকুরেয়া, উইংয়ে পালমার। সঙ্গী জোয়াও পেদ্রো। নবাগত লিয়াম ডেলাপ, জেমি গিটেন্স, এস্তেভাও উইলিয়ান। এই দল শুধু আজকের জন্য নয়, আগামী দশকের জন্য। এই সাফল্যও স্রেফ শুরুয়াত। আরও অনেক শৃঙ্গারোহণ বাকি! এই জয় ৯০ মিলিয়ন পাউন্ডের পুরস্কার নয়। চেলসি ফুটবলের ডিএনএ বদলে দেওয়ার এক নিঃশব্দ বিপ্লব। এটা সেই স্বপ্নযাত্রা, যেখানে ব্যর্থতা ভেঙে নতুন বিশ্বাস জন্ম নেয়। যেখানে ‘বিলিয়ন পাউন্ড বোটল জবসে’র ঠাট্টা ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন’ তকমার আড়ালে মুখ লুকোয়।
এই ফাইনালও আসলে দুটি ক্লাব নয়, দুই মতাদর্শের সংঘাত। একদিকে বনেদি ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্ব, অন্যদিকে নয়া অর্থনীতিতে গড়া এক অস্থির শক্তি। পিএসজি হয়তো আরও অনেক ম্যাচ জিতবে, আরও অনেক তারকা কিনবে। কিন্তু নিউ জার্সির এই চাঁদিফাটা দুপুর কিছুতেই ভুলবে না। কারণ, গতকাল তারা শুধু মাঠে হারেনি। হার মেনেছে পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস আর তারুণ্যের কাছে। এটা কেবল চেলসির জয় নয়। আগামী দিনে ফুটবল কোন মডেলে খেলা হবে, দল পরিচালিত ও বিন্যস্ত হবে, সেই মডেলের দিকচিহ্ন এঁকে দিয়েছে লন্ডনের ক্লাব।