আমরা চাই, কেউ কথা বলুক? নাকি চাই, নিখুঁত না হলে কেউ মুখই না খুলুক? দ্বিতীয়টা চাইলে দুনিয়া নীরবতর হবে। প্রথমটা চাইলে, পেপ গুয়ার্দিওলার মতো কণ্ঠস্বরকে অন্তত শোনা দরকার।

পেপ গুয়ার্দিওলা
শেষ আপডেট: 4 February 2026 15:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফুটবল কোচদের আমরা সাধারণত দেখি টাচলাইনে বন্দি, প্রায় যন্ত্রমানব হিসেবে—ফর্মেশন, প্রেসিং ট্রিগার, এক্সজি (XG) আর রেফারির সিদ্ধান্তের বাইরে যাঁদের দুনিয়া খুব একটা ছড়িয়ে নেই। কিন্তু এই গড্ডলিকার ভিড়ে একজন বারবার সেই ধারণা ভেঙেছেন। তিনি পেপ গুয়ার্দিওলা (Pep Guardiola)। শুধু খেলার মাঠে নয়, নৈতিক অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি স্বতন্ত্র স্বর। আর এখানেই জমে উঠেছে বিতর্ক। কারও চোখে সাহসী, কেউ বলেন, ‘সুবিধাজনক নীরবতা ভেঙেছেন এমন জায়গায়, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি নেই!’
এই ‘হোয়াটঅ্যাবাউটারিজমে’র মধ্যে প্রশ্নটা আসলে অন্য: এমন সময়ে কেউ মুখ খুললে, আমরা আগে তাঁর নিখুঁত থাকার যোগ্যতা যাচাই করব, নাকি তিনি কী বলছেন সেটাই কান পেতে, মন দিয়ে শুনব?
পেপের বক্তব্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রি-ম্যাচ সাংবাদিক সম্মেলনে প্যালেস্তাইন, সুদান, ইউক্রেনের প্রসঙ্গ উঠে আসায় গুয়ার্দিওলা খানিক বিস্মিতই হন। জানান, দশ বছরে এই প্রথম কেউ তাঁকে এই প্রশ্ন করল। কথাগুলো জটিল দর্শন নয়—ভয়ংকর সরল--‘আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি। আগে পারতাম না। দেখলে ব্যথা লাগে!’ অথচ এই নির্বিষ মন্তব্যের সূত্রে জন্ম নিয়েছে প্রবল বিতর্ক।
Pep Guardiola opening the concert-manifesto x Palestine in Barcelona tonight: "Here in Barcelona, where so many things have been done - Refugees Welcome, No to war, the flotilla... 1938 when we were bombarded - and always, as it has been in London and Paris, we are in front of… pic.twitter.com/wyBQBxRcDI
— City Xtra (@City_Xtra) January 29, 2026
গুয়ার্দিওলা শিশুদের কথা বলেছেন—যারা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে জানতে চায়, ‘আমার মা কোথায়?’ এই প্রশ্নের কোনও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নেই। মানবিক বক্তব্য। বার্সেলোনায় ‘অ্যাক্ট এক্স প্যালেস্তাইন’ (Act X Palestine) অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে ম্যান সিটি ম্যানেজারের বক্তব্য, ‘আমরা যেন তাদের একা ছেড়ে দিয়েছি।’ এটা আসলে কোনও কূটনৈতিক ভাষ্য নয়, একজন সচেতন নাগরিকের স্বভাবিক মনে হওয়া।
এমন কথা বলার ঝুঁকি আছে। আজকের পৃথিবীতে প্রকাশ্যে অবস্থান মানেই ট্রোল, আক্রমণ, বিকৃত ব্যাখ্যা। তবু তিনি বলেছেন। আপাতত সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্নটা কোথায় ঘুরে যায়?
গুয়ার্দিওলা মুখ খুললেই একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে—তিনি তো আবু ধাবির মালিকানাধীন ক্লাবে কাজ করেন। তাহলে সেই রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে তিনি কেন চুপ? অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের (Amnesty International) রিপোর্ট খুললেই যে ছবিটা দেখা যায়, তা মোটেও স্বস্তির নয়। তাই প্রশ্নটা যৌক্তিক, খুব স্বাভাবিক। ২০১৮ সালে কাতালান স্বাধীনতার প্রতীকে হলুদ ফিতে পরে শাস্তিলাভের পর, আবু ধাবির গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন এলে গুয়ার্দিওলার উত্তর ছিল নরম—‘প্রত্যেক দেশ নিজের মতো করে বাঁচে!’ সেই উত্তর আজও তাঁর দুর্বলতা হিসেবেই ধরা হয়।
আর এখানেই চলে আসে ‘হোয়াটঅ্যাবাউটারিজম’। মানে—‘এটা বলছ, কিন্তু ওটা বলছ না কেন?’ যা আলোচনাকে মূল বিষয় থেকে সরিয়ে দেয়। প্যালেস্তাইনে শিশুদের মৃত্যু নিয়ে কথা না বলে আমরা তখন গুয়ার্দিওলার চাকরির নৈতিকতা নিয়ে আটকে যাই। ফলে যেটা আদত সমস্যা, যা নিয়ে তর্ক জরুরি, সেটা চাপা পড়ে অনর্থক কথার কচকচিতে।
‘নিখুঁত নৈতিকতা’ কি আদৌ সম্ভব?
একটা অস্বস্তিকর সত্য মেনে নেওয়া দরকার—আমরা কেউই নৈতিকভাবে নিখুঁত নই। সবাই কোনও না কোনওভাবে আপস করি। কেউ চাকরি করি এমন সংস্থায়, যাদের সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নই। কেউ পণ্য ব্যবহার করি, যার উৎপাদনপ্রক্রিয়া প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
গুয়ার্দিওলার মেনে চলার ধরনটা হয়তো প্রকট, খুব সহজে চোখে লাগে। কিন্তু আপস তো আপসই। তার জন্য কি কাউকে অন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায়? যদি তাই হয়, তাহলে কথা বলবে কে? কে হবে ন্যায্য বক্তব্য মেলে ধরার আসল অধিকারী? ইংল্যান্ডের গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কির (Zack Polanski) একদা বক্তব্য ছিল, আপনি যদি পুরোপুরি ‘পারফেক্ট’ না হন, তাহলে পরিবেশ নিয়ে কথা বলার অধিকার নেই—এই যুক্তি আসলে সমস্যার সমাধান নয়, সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার রাস্তা। কথাটা এখানেও খাটে।
কিছু কথা বলা জরুরি
হ্যাঁ, আদর্শ পৃথিবীতে গুয়ার্দিওলার আবু ধাবির বিরুদ্ধেও সরব হওয়া উচিত ছিল। সেটা হলে আরও ভালো লাগত, ছিদ্রান্বেষীরা স্বস্তি পেতেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি অন্তত কিছু বলছেন। প্যালেস্তাইন, সুদান, এমনকি আমেরিকার অভ্যন্তরে অভিবাসন পুলিশ আইসিই-র (ICE) হাতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর কথা তুলেছেন—এমন আর একজন ম্যানেজারের নাম জানা আছে কারও? গুয়ার্দিওলা সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সৎ গলায় স্বীকার করেছেন, ‘কোনও সমাজই নিখুঁত নয়। আমিও নই। কিন্তু ভাল জায়গায় পৌঁছনোর চেষ্টা চালানো জরুরি!’ এই প্রচেষ্টার জায়গা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবল কোচ হিসেবে তাঁর ক্ষমতা সীমাহীন নয়। কিন্তু জনপ্রিয়তা বিপুল। সেই জনপ্রিয়তাকে তিনি যদি কেবল ট্রফি জেতার জন্য ব্যবহার না করে মানবিক প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে লাগান, তাকে স্বাগত জানানোই উচিত। নীরবতার ভিড়ে একজনের কণ্ঠও অনেক সময় বড় পার্থক্য গড়ে দেয়!
আসলে বিতর্ক বাড়ানোর আগে আমাদের নিজেদের দিকে তাকানো উচিত। আমরা চাই, কেউ কথা বলুক? নাকি চাই, নিখুঁত না হলে কেউ মুখই না খুলুক? দ্বিতীয়টা চাইলে দুনিয়া নীরবতর হবে। প্রথমটা চাইলে, পেপ গুয়ার্দিওলার মতো কণ্ঠস্বরকে অন্তত শোনা দরকার। সমালোচনা হোক, প্রশ্ন হোক। কিন্তু ‘হোয়াটঅ্যাবাউটারিজমে’র আড়ালে মানবিক যন্ত্রণাকে চাপা না দিলেই ভাল।