মোরিনহো মাঠে যেমন তীক্ষ্ন, রণকৌশল ছকে ফেলায় বুদ্ধিদীপ্ত—ফ্যাশনেও ঠিক তেমনই। অযথা আড়ম্বর নয়। নয় উৎকট সাজ। বরং, নিজের মতো থাকা। স্বাচ্ছন্দ্যই সূক্ষ্মতম স্টাইল।

জোসে মোরিনহো
শেষ আপডেট: 25 November 2025 16:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঢাউস আর্মানি ওভারকোট গায়ে লিভারপুলের সমর্থকদের চুপ করতে বলছেন, দল পিছিয়ে পড়েও জিতছে আর তিনি আঙুলে তর্জনী ছুঁইয়ে মাঠের বাইরে নিজের লড়াই লড়ে যাচ্ছেন!
ব্রিটিশ ফুটবলের অন্যতম আইকনিক ছবি৷ ফোকাসে জোসে মোরিনহো। কোট গায়ে চেলসির প্রাক্তন ম্যানেজারের ছবি ইংল্যান্ডের লোকগাথায় জায়গা করে নিয়েছে৷ সেই স্যুট একদা নিলামে ওঠে। প্রায় ২৫ লাখ টাকায় বিক্রিও হয়! তারপর দল বদলেছেন জোসে, পালটে ফেলেছেন নিজের স্টাইল স্টেটমেন্টও! কিন্তু বদলায়নি একটা জিনিস—স্টাইল নিয়ে তাঁর নির্লিপ্ত আত্মবিশ্বাস। কারও মতো হতে চান না। নিজের মতোই থাকেন। আর সেজন্যই তিনি ‘দ্য স্পেশ্যাল ওয়ান’।
মোরিনহোর কাছে ফ্যাশন মানে কখনও ‘সাজগোজের বাড়াবাড়ি’ নয়। বরং, মাঠের বাইরে নিজেকে প্রকাশ করার সবচেয়ে সহজ, স্বাভাবিক উপায়। আর সেই আত্মপ্রকাশে তাঁর প্রিয়তম ব্র্যান্ডের নাম—আর্মানি। চেলসির দিনগুলোয় মোরিনহো নিজেই জানান, মিলানে আর্মানির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কাহিনি। এরপর থেকেই ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক শুরু। শুধুই আর্মানি? এরমেনেজিল্দো জেনা, হুগো বস—সবই তাঁর ওয়ারড্রোবের পরিচিত নাম। মোরিনহো কখনও মুখে বলেননি, স্যুট গায়ে চাপালেই কেউ বড় ম্যানেজার হয়ে যায়! বরং, পর্তুগিজ চাণক্যের মতে—পোশাক দেয় ‘আত্মবিশ্বাস’, ‘ক্ষমতা’ নয়!
এখন সময়ের সঙ্গে তিনিও বদলেছেন। এই সিজনে ঘর বদলে বেনফিকায়। টাচলাইনে ওভারকোট নয়—খুব ক্যাজুয়াল পোশাকে! দশ বছর আগে তিনি যা গায়ে দিয়ে মাঠে এসেছিলেন—টাই-সমেত স্যুট—আজ সেটাই ম্যানেজারদের আদর্শ মডেল। এবার তিনিও পথ বদলাচ্ছেন। সাধারণ ট্রাউজার, সাধারণ জ্যাকেট। মোরিনহোর ইশারা—‘আমি আগে চালু করেছিলাম স্যুট ট্রেন্ড। এবার ক্যাজুয়ালকে জনপ্রিয় করব!’
পোশাক নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ? উত্তর: তরুণ খেলোয়াড়দের স্টাইল সেন্স! রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিং রুমে নাকি এই নিয়ে ‘ঝগড়া’ লেগেই থাকত। তাঁর দাবি—সবাই নিজের মতো পোশাক পরতেই পারে, কিন্তু ‘মোকাবিলা’ করতে হলে ‘অবকাশের পোশাক’ আর ‘ম্যাচ ডে ড্রেস’ আলাদা হওয়া জরুরি। মোরিনহোর কাছে ফুটবল স্টেডিয়াম মানে ‘অফিস’। তাই শর্টস-টি-শার্ট পরে সাক্ষাৎকারে যাওয়া তাঁর চোখে ‘অপেশাদার’। সাফ বক্তব্য, ‘স্যুট পরতেই হবে—এটা বলছি না। কিন্তু ঠিকঠাক দেখানো জরুরি!’
তবু দিনশেষে স্টাইল নয়—স্বাচ্ছন্দ্যই প্রথম শর্ত। কেউ লম্বা চুল রাখলে রাখুক। ছোট রাখলে তাও সই। কিন্তু তা যেন খেলায় ব্যাঘাত না ঘটায়। খেলোয়াড়ের স্বস্তিই মোরিনহোর কাছে চূড়ান্ত।
নিজের সাজগোজ নিয়ে রুটিনও ততটাই মেপে নেওয়া। ম্যাচের দিন কখনও শেভ করেন না। রেজরের ছোট্ট নিক বা ভুলচুক যে মুখের লুক নষ্ট করতে পারে—এই ভয় বরাবরই ছিল। তাই ইলেকট্রিক শেভার বেছে নেন। সময় নিয়ে, ধীরেসুস্থে শেভ। আফটারশেভ বা পারফিউম? খুব একটা না। বরং স্কিন কেয়ার—ক্রিম, ময়েশ্চারাইজার—এটাই তাঁর কাছে ‘স্ট্যাপল রুটিন’।
জুয়েলারির ব্যাপারে ফর্মুলা একদম পরিষ্কার—‘পুরুষের জন্য একটাই গয়না—ঘড়ি!’ ব্রেসলেট-চেন-রিং—নৈব নৈব চ! যেসব ব্র্যান্ড বেছে নেন—নিজের মর্জিমতো। টাকা দেখে নয়। ব্রাউন হোক বা ডে-লা-কুর—প্রতিটি ব্র্যান্ডই তিনি নিজে ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। ওয়ারড্রোবের বাধ্যতামূলক আইটেম? সাদা শার্ট। মোরিনহোর যুক্তি, ‘আগে-পরে যাই হোক না কেন, একটা সাদা শার্ট লাগবেই লাগবে!’
শেষে তাঁর দুই প্রিয় জুতোর কথা—প্রাডা আর টডস। বিশেষভাবে স্মরণীয়। বারদুয়েক চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের দিনে এই দুই জুতোই ছিল তাঁর পায়ে। কুসংস্কার না হলেও তারপর কখনও ছুঁয়েও দেখেননি। আজ স্রেফ মনে পড়ে সমর্থকদের সেই জয়ধ্বনি।
মোরিনহো মাঠে যেমন তীক্ষ্ন, রণকৌশল ছকে ফেলায় বুদ্ধিদীপ্ত—ফ্যাশনেও ঠিক তেমনই। অযথা আড়ম্বর নয়। নয় উৎকট সাজ। বরং, নিজের মতো থাকা। স্বাচ্ছন্দ্যই সূক্ষ্মতম স্টাইল। আর সেখানেই ‘দ্য স্পেশ্যাল ওয়ান’ আজও অনন্য, আজও অনুকরণীয়।