সব মিলিয়ে একটা ব্যাপার পরিষ্কার—ভ্যান ডাইক আর সেই অপ্রতিরোধ্য ‘দেওয়াল’ নন। তাঁকে আবার কীভাবে আগের ছায়া থেকে বের করে আনা যায়, সেটাই আপাতত আর্নে স্লটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রশ্নে বিদ্ধ ভ্যান ডাইক
শেষ আপডেট: 4 December 2025 13:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এই কিছুদিন আগেও চর্চা হত: ভ্যান ডাইক বা মহম্মদ সালাহ—কে দল ছাড়লে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়বে লিভারপুল? শতাংশের হিসেবে ভোটাভুটিতে জিতেওছিলেন ডাচ ডিফেন্ডার। এমনিতেই স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের একটি ঋষিবচন আন্তর্জাতিক ফুটবলের চালু প্রবাদ: ‘আক্রমণ জেতায় ম্যাচ, ডিফেন্স খেতাব!’ সেই বক্তব্যকেই আধুনিক জমানায় আরও একবার সত্য প্রমাণ করেছেন ভ্যান ডাইক। হয়ে উঠেছেন মার্সিসাইড ক্লাবের অন্যতম স্তম্ভ। কিন্তু বটবৃক্ষেরও তো আয়ু রয়েছে! কোনওটাই অনড়, অক্ষয়, অজর নয়। মালিন্য আসে। জীর্ণ হয় শাখাপ্রশাখা। ভ্যান ডাইকও তার ব্যতিক্রম নন। চলতি মরশুমে দলের ত্রাতা হয়ে ওঠার বদলে একাধিক হাস্যকর ভুল করে বসেছেন, যার ফল দলের ভরাডুবি!
আসলে যে সংকট আজ ভার্জিলকে (Virgil van Dijk) ঘিরে তৈরি হয়েছে, সেটা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ফর্মহীনতা নয়—বরং লিভারপুলের (Liverpool) সামগ্রিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। সালাহ (Mohamed Salah) টানা দু’ম্যাচ বেঞ্চে বসে। তবু তাঁর বিষণ্ণ মুখের বদলে ক্যামেরার ফোকাস ঘুরেফিরে আটকে যাচ্ছে ডিফেন্সের দিকে! কেন? কারণ, লিভারপুলের সোনালি সময়ের ফোকাল পয়েন্টই ছিল ডিফেন্সিভ শৃঙ্খলা—যার মুখ ভ্যান ডাইক।
২০১৮ সালে সাউদাম্পটন থেকে ৭৫ মিলিয়নে আসার পর তিনি যে রকম ভোল বদলে দেন, তা আধুনিক ফুটবলে বিরল। আক্রমণভাগের স্টারডম ছাপিয়ে ডিফেন্ডার হয়েও ব্যালন ডি’অর দৌড়ে লিওনেল মেসিকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছিলেন। সেই খেলোয়াড়ই কিনা এখন প্রতিপক্ষের বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারদের বিরুদ্ধে নড়বড়ে!
কাল রাতে সান্ডারল্যান্ডের (Sunderland) বিরুদ্ধে ১-১ ম্যাচে ভ্যান ডাইকের ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল—ডিফেন্ডারের সবচেয়ে বড় সম্পদ ‘ডিসিশন-মেকিং’কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! গোল খাওয়ার মুহূর্তে তিনি বল হারালেন, তারপর আবার শট ব্লক করতে গিয়ে পিছিয়ে গেলেন—এমন আচরণ ভ্যান ডাইকের মতো ডিফেন্ডারের ক্ষেত্রে অকল্পনীয়। গত মরশুম পর্যন্ত নিশ্ছিদ্র, প্রশ্নাতীত পারফরম্যান্স। আর এখন প্রতি ম্যাচে ভুল! বছর চৌত্রিশের ডিফেন্ডার নিজের সিদ্ধান্তের উপর ভরসা রাখতে পারছেন না। বয়স বাড়ছে। শরীর আগের মতো গতির বিরুদ্ধে পাল্লা দিতে ব্যর্থ। ফলে অতীতের কর্তৃত্বও ধসে পড়ছে।
আর্নে স্লট (Arne Slot) ও তাঁর রিক্রুটমেন্ট টিম প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন খরচ করে যে নতুন রক্ষণ গড়েছেন, তা নিয়েও সওয়াল উঠেছে। মিলোস কেরকেজ (Milos Kerkez) নতুন দলে মানিয়ে নিতে পারছেন না। ইব্রাহিমা কোনাতে (Ibrahima Konaté) ভয়াবহ অফ-ফর্মে। এর ফলে ভ্যান ডাইককে নিজের কাজের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ফাঁক সামলাতে হচ্ছে—যা তাঁর ব্যর্থতাকে আরও প্রকট করে দিয়েছে। দলগত কাঠামো ভেঙে গেলে একজন ডিফেন্ডারের দুর্বলতা দশগুণ বেড়ে যায়। ভার্জিলের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছে। রিকভারি রান, ট্যাকল, ইন্টারসেপশন—সবই গত মরশুমের তুলনায় কম। যা ইঙ্গিত করছে শারীরিক অবক্ষয়ের দিকে। এমনকি গোল খাওয়ার বহু মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে—তিনি বলের দিকে না গিয়ে ‘ব্যাক টার্ন’ করছেন। লিভারপুল সমর্থকরা এই অভিযোগ আগেও তুলেছেন—বল ব্লক করার বদলে তিনি বারবার পাশ কাটিয়ে যান। এটা শুধু টেকনিক্যাল ত্রুটি নয়, সাহসের অভাবও বটে। ডিফেন্ডার যখন নিজের শরীরকে বলের সামনে রাখতে ভয় পায়—তখন বুঝতে হবে তাঁর আত্মবিশ্বাস ফুরিয়েছে।
লিভারপুলের ড্রেসিংরুমে তিনি ক্যাপ্টেন। কিন্তু সান্ডারল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঠে নেতৃত্ব ছিল শূন্য। দল গোল খেয়েছে, ভেঙে পড়েছে, সংহতি হারিয়েছে—কিন্তু ভ্যান ডাইকের কাছ থেকে উদ্দীপনা, চিৎকার, নির্দেশ… কিছুই আসেনি! যাদের উপর দল ভরসা করে, তাদেরই যখন মনোযোগ নড়ে যায়—পুরো সিস্টেম ধসে পড়ে নিমেষে!
নয় নম্বর হারের পরে একটিমাত্র জয় ক্ষত ঢাকতে পারেনি। এখন আবার ড্র—তাও অ্যানফিল্ডে (Anfield)। গতরাতের ম্যাচ দেখিয়ে দিল—লিভারপুলের পতনটা কেবল ট্যাকটিক্যাল সমস্যা নয়, বরং ‘ভাঙনের শুরু’। যার শিকড় অনেক গভীরে ছড়ানো! স্লটের ফুটবল পজিশনাল, ধীরস্থির বিল্ড-আপ নির্ভর। ভ্যান ডাইক অতীতে য়ুর্গেন ক্লপের (Jürgen Klopp) ‘গেগেনপ্রেসিং’–এ আলো ছড়ালেও ধীর, টেকনিক্যাল, কম-অ্যাথলেটিক গেমে হয়তো ধতস্থ হতে পারছেন না। ফলে তাঁর প্রভাবও কমে এসেছে।
সব মিলিয়ে একটা ব্যাপার পরিষ্কার—ভ্যান ডাইক আর সেই অপ্রতিরোধ্য ‘দেওয়াল’ নন। তাঁকে আবার কীভাবে আগের ছায়া থেকে বের করে আনা যায়, সেটাই আপাতত আর্নে স্লটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।