নারী পালিয়েও রক্ষা পায়নি। নিজেদের সন্তানদের বাঁচাতে, নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করতে, দুলালিরা বারবার আত্মসমর্পণ করেছে জীবনের কাছে, সমাজের কাছে, পুরুষের কাছে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 November 2025 17:28
স্বাধীনতার আনন্দ স্থায়ী হল না। তার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল অগণিত মানুষের নির্বাসনের কাহিনি (Bengal Partition)। অনিকেত জীবনের এই যাত্রায়, ভিটে-মাটি থেকে শিকড় ছিঁড়ে যাওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভরে উঠল এক নতুন ইতিহাস— দেশভাগ। সেই ইতিহাসে দুলালিদের, আদুরিদের মতো নারীরাই সবচেয়ে বড় সাক্ষী ও ভুক্তভোগী।
গ্রামে গ্রামে আগুন জ্বলছে, মানুষের ভেতরে ভয়। কেউ নিজের হাতে ঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, কেউ পালাচ্ছে প্রাণ বাঁচাতে। শুরু হল ‘ঠিকানা বদলের ছুট’। একে একে হারিয়ে যেতে লাগল পরিজন, প্রতিবেশী, চেনা মুখ। জয় গোস্বামীর (Joy Goswami Birthday) লেখা 'নন্দর মা' (Nandar Maa) কবিতায় যেন ছত্রে ছত্রে ধরা পড়ে যায় কেউ কাঁটাতার পেরিয়ে গেল, কেউ হারিয়ে গেল পথের ভিড়ে। “গ্রামে কে বলল পালারে সবাই পালা”, এই এক বাক্যে যেন ধরা পড়ে এক গোটা প্রজন্মের আতঙ্ক।
আদুরি হারিয়ে গেল, কিন্তু দুলালি বেঁচে রইল— দগ্ধ হয়ে। বেঁচে থেকেও যেন মৃত্যুর অভিজ্ঞতা তার জীবনে। ভরা সংসারের আদর থেকে বস্তির কোণে ঠিকে ঝি, তারপর রাতের অন্ধকারে দেহ সমর্পণ। দুলালির জীবন এক অনবরত অবনমনের গল্প। একদিন সে ‘প্রিয়বালা’, তারপর সবার কাছে শুধু ‘নন্দর মা’। এই রূপান্তর আসলে এক থেকে অসংখ্য নারীর বাস্তুচ্যুতির প্রতিচ্ছবি।
কবি ‘নন্দর মা’-তে তিনি লিখেছিলেন—
“খানিকটা নাম ধানক্ষেতে পড়ে গেছে,
খানিকটা গেছে নদী জলে আঘাটায়।
খানিকটা নাম নিয়ে নিল পাঠশালা,
খানিকটা গেল রাস্তার দাঙ্গায়।
খানিকটা গেছে রাত পড়শীর কাছে।”
এই পঙ্ক্তিগুলো শুধু এক নারীর নয়, গোটা বাংলার দেশভাগ-পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। নারী পালিয়েও রক্ষা পায়নি। নিজেদের সন্তানদের বাঁচাতে, নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করতে, দুলালিরা বারবার আত্মসমর্পণ করেছে জীবনের কাছে, সমাজের কাছে, পুরুষের কাছে।
কারণ, দেশভাগ মানে তো শুধু মানচিত্রে কাটা দাগ নয়। মানে ছিন্নমূল মানুষের আর্তনাদ, মায়ের বুক থেকে সন্তানকে হারানোর হাহাকার, আর এক নারীর নীরব যন্ত্রণা। জয় গোস্বামীর ‘নন্দর মা’ সেই ইতিহাসেরই এক রক্তমাংসের দলিল— যেখানে দেশভাগের রাজনীতি নয়, উঠে আসে বেঁচে থাকার আদিম প্রবৃত্তি। দুলালির চোখে আমরা দেখি, কীভাবে স্বাধীনতার আলোর নিচে জন্ম নেয় নির্বাসনের অন্ধকার।
তবু তারা বেঁচে থেকেছে, কারণ মৃত্যু নয়, বেঁচে থাকাটাই ছিল তাদের প্রতিবাদ। যেমন কবি লিখেছিলেন—
“একটা বয়স সে দেশে ছেড়ে এলাম,
একটা বয়স নিয়ে ছেড়ে দিল স্বামী।
একটা বয়স ছেলে বড়ো করে শেষ,
ছেলের নামেই আজ চেনা দিই আমি।”
দেশভাগ দুলালির কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল তার নাম, তার সত্তা, তার দেশ ও সমাজে অবস্থান। আজ তার পরিচয় শুধু “৫সি-র ঠিকে ঝি”, “নন্দর মা”। কেউ নন্দর মা হয়ে বেঁচেছে, কেউ মরে বেঁচেছে, কেউ হারিয়ে গেছে অন্ধকারে। ‘এক চোখো চাঁদে জ্বালা’ গ্রামের সেই পোড়া ছাই আজও উড়ে আসে শহরের বস্তিতে।
এই বাস্তুচ্যুত নারীরা শুধু এক ঐতিহাসিক ঘটনার শিকার নয়; তারা সভ্যতার বিবেকের ক্ষত। তাদের লাঞ্ছনা, তাদের নীরব আর্তি আজও আমাদের মানবতার মুখে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।
জয় গোস্বামী বিশ্বাস করেন, কবিতা শুধু লেখার খেলা নয়। বেঁচে থাকার এক রূপ।
তাই ‘নন্দর মা’ কেবল এক নারীর গল্প হয়ে থাকেনি, এক গোটা জাতির বিবেকের পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। দুলালির জীবনের ছাইচূর্ণ আজও উড়ে বেড়ায় আমাদের ইতিহাসের পাতায়, আমাদের শহরের বস্তিতে। জয় গোস্বামীর কবিতায় সেই নিঃশব্দ নারীরা যেন আবার মুখ খোলে— তাদের কণ্ঠে ভেসে আসে একটাই মন্ত্র, ‘আমরা পালিয়েও বেঁচে আছি, কারণ বেঁচে থাকাটাই আমাদের প্রতিবাদ।’