সে শরতে দেবীর আবাহন হয়নি, হয়েছিল বিসর্জন। বিভূতিভূষণের (Bibhutibhushan Bondyopadhyay) কলমে সেই বিসর্জনের নাম— দুর্গা (Durga)।

অপুকে আঁকড়ে দুর্গা
শেষ আপডেট: 23 October 2025 15:06
সে শরতে দেবীর আবাহন হয়নি, হয়েছিল বিসর্জন। বিভূতিভূষণের (Bibhutibhushan Bondyopadhyay) কলমে সেই বিসর্জনের নাম— দুর্গা (Durga)। দেবী নয়, এক মানবী, যার শরীরে লেগে আছে দারিদ্র আর অপমানের ধুলো। তার চোখে মিশে আছে বঞ্চনা আর কৌতূহলের ছায়া। 'পথের পাঁচালী'-র (Pather Panchali) সেই দুর্গা যেন বাংলার মাটির মেয়ে, আমাদের মেয়ে, আমার বাড়ির মেয়ে। অকালবোধনের পর যার ভাগ্যে লেখা ছিল অকালমৃত্যু।
বিভূতিভূষণ যখন লিখছেন তাঁর এই প্রথম উপন্যাস, তখনও জানেন না, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নাম অমর হয়ে থাকবে। ভাগলপুরের এক বনাঞ্চলে নিঃসঙ্গ যাপনে বসে লিখেছিলেন ‘পথের পাঁচালী’। জমিদারি সেরেস্তায় কাজের ফাঁকে ফাঁকেই লিখে ফেলেছিলেন পাতার পর পাতা। জন্ম নিয়েছিল এক এমন গল্প, যা বাঙালির চেতনায় চিরকালীন হয়ে রইল।
অথচ ভাবতে অবাক লাগে সেই লেখার প্রথম খসড়ায় দুর্গা ছিল না। পরে তিনি এনে দেন সেই চরিত্র— এক নিষ্পাপ অথচ অবাধ্য, আনমনা অথচ মননশীলা মেয়ে, যার মধ্যে বাঙালি খুঁজে পায় চিরকালের জীবনের আর্তি, আশা ও সব হারানোর মিশ্র সুর। গোটা উপন্যাস যেন প্রাণ পায় দুর্গার স্পর্শে। দুর্গার ছেলেমানুষিতে স্নেহ করেনি, দুর্গার বকুনি খাওয়ায় ‘আহা রে’ বলে ওঠেনি, দুর্গার চলে যাওয়ায় হাপুস নয়ন ভাসেনি, এমন বাঙালি কি খুব বেশি রয়েছেন?
দুর্গার মৃত্যু আজও বাঙালির মনে গেঁথে আছে অমেয় বেদনার এক চূড়ান্ত ছবি হিসেবে। সে ছবিতে মিশে য়ায় ট্রেনের হইসল আর কান্নার শব্দ। “এইবার জ্বর ছাড়লে একদিন রেলগাড়ি দেখতে যাবি তো?” অপুর সেই প্রতিশ্রুতি আর পূর্ণ হয়নি কখনও।
পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায় সেই দৃশ্যকে রূপ দিয়েছেন এক অনন্ত প্রতীকে। বৃষ্টি— যা জন্ম দেয়, মুক্তি দেয়, আবার নিয়ে যায় মৃত্যুতে। রবীন্দ্রনাথের দর্শনে— ‘সবুজ সুধার ধারায় প্রাণ এনে দাও তপ্ত ধরায়, বামে রাখো ভয়ঙ্করী বন্যা মরণ-ঢালা’। সত্যজিৎ যেন দৃশ্যের ভাষায় বলেছিলেন এই লাইনগুলিই। দুর্গার বৃষ্টি-স্নান তাই হয়ে ওঠে জীবন ও মৃত্যুর মিলনমুহূর্ত।
‘পথের পাঁচালী’-র দুর্গা দস্যি মেয়ে, সে কোনও মেয়েলি কাজের ধার ধারে না। নারীসুলভ কোমলতার দিকে ঠেলেননি তাকে লেখক। অথচ সেই মেয়েকেই নিষ্ঠাভরে করতে বসান, ‘পুণ্যি-পুকুর’ ব্রত। যদিও এই ব্রত সাধারণত মনের মতো স্বামী পাওয়ার জন্য এবং সধবা নারীরা সধবা থাকার জন্য করা হয়, উপন্যাসেও খানিক তেমন অনুষঙ্গ থাকলেও, আঙিনার মাটিতে ছোট গর্তে জল ঢেলে, মন্ত্রের যে অংশ দুর্গা আওড়ায়, তা হল— “পুণ্যি পুকুর পুষ্পমালা, কে পূজে রে দুপুরবেলা? আমি সতী লীলাবতী, ভাইয়ের বোন পুত্রবতী।”
পুত্রবতী হওয়ার আশা অকালেই ফুরিয়ে গেলেও, ‘ভাইয়ের বোন’ হিসেবে দিব্যি জায়গা রপে নেয় দুর্গা। দারিদ্র আর বঞ্চনায় বেড়ে ওঠা সে মেয়েটি যেন এক আশ্চর্য প্রতীক, যে দেয়, কিন্তু নেয় না। পিতৃতান্ত্রিক সংসারে যেখানে ছেলের গুরুত্ব বেশি, দুর্গা সেখানে চুপ করে সহ্য করে, কিন্তু ভালবাসা দেয় নিঃশেষে।
চিত্রসমালোচক রবিন উড লিখেছিলেন, “দুর্গা সেই চরিত্র, যে পথের পাঁচালীর সমস্ত মানবিকতা ধারণ করে।” চুরি করা ফলের পাশে পড়ে থাকা তার শরীর যেন বঞ্চনা ও নিষ্পাপতার সংঘর্ষের প্রতীক।
দুর্গা নেই। কোথাও থাকেনি। না বইয়ের পাতায়, না সিনেমার পর্দায়। কিন্তু সে হারিয়েও যায়নি। ভীষণভাবে ফেলে রেখে গেছে তার ছায়া। অপুর জীবনে, বাঙালির স্মৃতিতে, আর সেই শরৎকালের বাতাসে, যেখানে প্রতিবার দেবীর আগমনের সঙ্গেই ফিরে আসে পথের পাঁচালীর সেই অকালবোধনের কিশোরী।প্রতিটি ভাইফোঁটার ফোঁটায়, প্রতিটি বৃষ্টিভেজা বিকেলে সে ফিরে আসে— নিঃশব্দে, নরম পায়ে, চোখের কোণে জল রেখে।
ওদিকে কালো মেঘে ঘনিয়ে এসেছে আকাশ, অপু মাঠে দিদির অপেক্ষায়। দুর্গা ছুটে আসে বৃষ্টির মধ্যে, আনন্দ করে ভেজে, কিন্তু একসময় সিক্ত বসনে একমাত্র ভাইকে জাপটে জড়িয়ে ধরে বলে, “হে বৃষ্টি ধরে যা, লেবুর পাতায় করমচা!” তখনও সে জানে না, এই বৃষ্টির পরেই অসুখে পড়বে সে, সেরে উঠতে না পারা অসুখে শেষ হয়ে যাবে তার জীবন। সেই মৃত্যুর মুখেও ভাইয়ের জন্য তার প্রার্থনা থামে না।
দুর্গার মৃত্যু হয়। আর তারপরেই যেন অপুর মুক্তির সূচনা। অপুকে পৃথিবীর পথে এগিয়ে যেতে হলে দিদির পিছুটানটা আলগা হওয়ার প্রয়োজন ছিল বই কী। অপু যে বরাবরই পিছুটানহীন হতে চেয়েছে, তা পরবর্তীকালে ধরাও পড়ে, সর্বজয়ার মৃত্যুতে। মা চলে যাওয়ার পরে যে অনুভূতির প্রকাশ অপুর মধ্যে দিয়ে লেখক করিয়েছেন, তাতেও হারানোর শোকের চেয়ে মুক্তির প্রাপ্তিই ছায়া ফেলেছিল।
তাই দুর্গা যেন আগেভাগেই নিঃশব্দে, নিঃস্বভাবে, জীবনের ভিতরেই নিজেই নিজের বিসর্জন দিয়ে দেয়। অপু যখন অপূর্ব হয়ে উঠল, তখন কথায় কথায় বন্ধুকে নিজের সঙ্গে আত্মপরিচয় করিয়ে দিল তাঁরই লেখা চরিত্রের সঙ্গে, তখন ধরা পড়ল, সে চরিত্র প্রাপ্তবয়স্ক অপুরই দ্যোতক। যে কিনা "মহৎ কিছু করছে না। তার দারিদ্র যাচ্ছে না। তার অভাব মিটছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে জীবনবিমুখ হচ্ছে না। সে পালাচ্ছে না, এসকেপ করছে না। সে বাঁচতে চাইছে। সে বলছে, বাঁচার মধ্যেই সার্থকতা, তার মধ্যেই আনন্দ, হি ওয়ান্টস টু লিভ!"
অপুর এই আত্মসন্ধানেই হয়তো বাধা হতে চায়নি দুর্গা। ভাইয়ের জন্য কোনও পিছুটানও রাখতে চায়নি। তাই প্রথাগত যমের দুয়ারে কাঁটা না বিছিয়েও কিশোরী ভাইয়ের শুভ কামনায় ব্রত রেখেছিল... "পুণ্যি পুকুর পুষ্পমালা, কে পূজে রে দুপুরবেলা..."