গত শতকের নয়ের দশকের গোড়ায় অটল বিহারী বাজপেয়িকে সামনে রেখে লালকৃষ্ণ আডবানি, মুরলি মনোহর জোশিরা কংগ্রেস বিরোধী যে আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে বোঝাপড়া গড়ে তুলেছিলেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের জমানায় তাদের অধিকাংশই আর পদ্ম শিবিরের সঙ্গে নেই।

বিহারের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ!
শেষ আপডেট: 15 April 2026 12:02
বুধবার বিহারে নয়া ইনিংস শুরু করল বিজেপি (BJP)। দীর্ঘ তিন দশক নীতীশ কুমারকে (Nitish Kumar) নেতা মেনে জোট রক্ষার পর অবশেষে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী (Bihar CM) পদ হাতে পেল পদ্ম শিবির। ৫৭ বছর বয়সি সম্রাট চৌধুরী (Samrat Choudhary) বুধবার একটু আগে রাজভবনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। সেই সূত্রে বিহারে অবসান হল নীতীশ কুমারের দু-দশকের শাসন, যা টিকে ছিল বিজেপির সমর্থনে।
ভারতের জোট রাজনীতিতে এমন নজির দ্বিতীয়টি নেই। বিশেষ করে একটি সর্বভারতীয় দলের সঙ্গে আঞ্চলিক দলের এমন মেলবন্ধন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে অতুলনীয়।

গত শতকের নয়ের দশকের গোড়ায় অটল বিহারী বাজপেয়িকে সামনে রেখে লালকৃষ্ণ আডবানি, মুরলি মনোহর জোশিরা কংগ্রেস বিরোধী যে আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে বোঝাপড়া গড়ে তুলেছিলেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের জমানায় তাদের অধিকাংশই আর পদ্ম শিবিরের সঙ্গে নেই। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা, পঞ্জাবে অকালি দল, তামিলনাড়ুতে এআইএডিএমকে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসসহ একাধিক দল একে একে বিজেপি সঙ্গ ছেড়ে গিয়েছে। মহারাষ্ট্রে একনাথ সিংহের নেতৃত্বাধীন শিবসেনার একাংশ বিজেপির সঙ্গে আছে। তামিলনাড়ুতে চলতি বিধানসভায় নতুন করে বিজেপি ও প্রয়াত জয়ললিতার পার্টি এআইএডিএমকে পরস্পরের হাত ধরেছে বটে, তবে বাজপেয়ি-আদবানীদের এনডিএ এখন অনেকটাই অতীত। একমাত্র ব্যতিক্রম নীতীশ কুমার। গত দু দশকে মুখ্যমন্ত্রীত্বে নীতীশ তিনবার বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করলেও শেষ পর্যন্ত পদ্ম শিবিরের সঙ্গেই সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন।
বিজেপির সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক বন্ধুত্বের সূচনা ১৯৯৫-এ। লালু প্রসাদের মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে নীতীশ কুমার নিজের দল সমতা পার্টি গড়ে বিজেপির হাত ধরেছিলেন। সেবার বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ও নীতীশের সমতা পার্টি লালু প্রসাদকে কুর্সি থেকে সরাতে না পারলেও রাজ্যে বিরোধী শিবির হিসাবে কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তাদের। ২০০০ সালে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ফলে রাবড়ি দেবী মুখ্যমন্ত্রিত্ব হারালে কেন্দ্রের মন্ত্রিসভার কৃষিমন্ত্রী নীতীশ কুমারকে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী করেন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ি। বিধানসভায় সংখ্যালঘু জনতা দল ইউনাইটেডের নেতা-নীতীশ কুমারকে সেই থেকে সমর্থন দিয়ে আসছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিজেপি। পদ্ম শিবিরে এ নিয়ে বরাবর চাপা অসন্তোষ থাকলেও বাজপেয়ি-আডবানিদের পর নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরাও ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন নীতীশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রী মেনে নিয়ে। এমনকী জনতাদল ইউনাইটেডের এই নেতা একাধিকবার পদ্ম শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করলেও মোদী-শাহরা কখনই নীতীশের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতার হাত বদল হল বিহারে।
প্রশ্ন হল নীতীশ কুমার দলের কাউকে মুখ্যমন্ত্রী পদে না বসিয়ে কেন বিজেপিকে কুর্সি এগিয়ে দিলেন? আসলে বিজেপির বোঝাপড়ায় মুখ্য ছিলেন নীতীশ, গৌণ ছিল তাঁর দল জেডিইউ। অর্থাৎ বিজেপি নীতীশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রী পদে সমর্থন জুগিয়ে যাবে, এই ছিল দুই দলের বোঝাপড়া। ফলে মুখ্যমন্ত্রী পদে নীতীশের উত্তরসূরী হিসেবে জেডিইউ-র কোনও নেতার নাম বিবেচনার প্রশ্নই ছিল না।
নীতীশকেই কেন বেছে নিয়ে তিন দশক এই আঞ্চলিক নেতাকে সমর্থন জুগিয়ে গেল বিজেপি? আসলে বিহারের রাজনীতিতে জাতপাতের জটিল অঙ্কে লালু প্রসাদের বিকল্প হয়ে উঠতে পেরেছিলেন একমাত্র নীতীশ কুমার। লালু প্রসাদের যাদব ও মুসলিম ভোটের বিপরীতে নীতীশ কুমার গড়ে তোলেন তাঁর অতি পশ্চাদপদ শ্রেণির ভোটব্যাঙ্ক। সেই ২৬ শতাংশ ভোট ব্যাঙ্কে প্রভাবশালী গোষ্ঠী হল নীতীশের কুর্মি সম্প্রদায়। যাদব ও মুসলিম ভোট পুঁজি করে লালু প্রসাদ ও তাঁর স্ত্রী রাবড়ি দেবী ১৫ বছর বিহার শাসন করলেও ২০০৫-এ ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার পর আর পাটনার কুর্সি দখল করতে পারেনি রাষ্ট্রীয় জনতা দল ও তাদের মহাগঠবন্ধন। কুর্মি ও কৈরি-ওবিসি বা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এই দুই প্রভাবশালী সম্প্রদায়কে সামনে রেখে নীতীশের গড়ে তোলা অতি পশ্চাৎপদ ভোটব্যাঙ্ক একদিকে যেমন লালু প্রসাদের দলের প্রত্যাবর্তন রুখে দিয়েছে, অন্যদিকে বিজেপিকেও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে নিম্নবর্গের মানুষের কাছে। নীতীশের সঙ্গে ৩০ বছর ঘর করার সুবাদে বিজেপির গা থেকে 'উচ্চবর্ণের পার্টি' তকমা অনেকটাই ঘুচে গিয়েছে।
তাৎপর্যপূর্ণ হলো বিহারের রাজনীতিতে নীতীশ কুমারের হাত ধরে গড়ে ওঠা রাজনীতির এই বাস্তবতার কারণেই সম্রাট চৌধুরী ওই রাজ্যে বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেলেন। বিজেপির এই নেতা নীতীশের ভোটব্যাঙ্কের অন্যতম প্রভাবশালী গোষ্ঠী কৈরি সম্প্রদায়ের মানুষ। বিহারের রাজনৈতিক মহলের খবর, বিজেপি নয়, দলের রাজ্য সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সম্রাট চৌধুরী নীতীশ কুমারের মন্ত্রিসভায় প্রথমে উপ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন জেডিইউ সুপ্রিমোর ইচ্ছায়। নীতীশ কুমারই বিজেপি নেতাদের বলেছিলেন সম্রাটকে তিনি মন্ত্রিসভায় উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে চান। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও বিজেপি সম্রাট চৌধুরীকে বেছে নিয়ে নীতীশ কুমারের সুপারিশকেই মান্যতা দিয়েছে।
আসলে নীতীশ কুমার উত্তরসূরি হিসেবে এমন একজন নেতাকে চাইছিলেন যিনি তাঁর উদ্যোগে গড়ে তোলা অতি পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়ের মানুষকে সুরক্ষা দেবেন। নীতীশের এই মানদণ্ড তথা প্রত্যাশায় সম্রাট চৌধুরী বিজেপির অন্দরে সবচেয়ে এগিয়েছিলেন। এই প্রথম বিহারে কৈরি সম্প্রদায়ের নেতা মুখ্যমন্ত্রী হলেন।
যদিও নতুন মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী বিহারের রাজনীতিতে সেই অর্থে জনপ্রিয় নেতা নন। বরং সুবিধাবাদী মানুষ হিসেবে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তাঁর কুখ্যাতি বেশি। রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি লালু প্রসাদের দলে। ২০০০ সালে রাবড়ি দেবীর যে সরকারকে কেন্দ্র বরখাস্ত করেছিল, সম্রাট চৌধুরী ছিলেন সেই সরকারের কৃষিমন্ত্রী। যদিও বয়স বিভ্রাট বিতর্কে তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে সরে যেতে হত। গত বিধানসভা নির্বাচনে জন সুরাজ পার্টির নেতা প্রশান্ত কিশোর নথিপত্র পেশ করে দাবি করেন সম্রাট চৌধুরী খুনের মামলা থেকে রেহাই পেয়েছেন বয়সের মিথ্যা সার্টিফিকেট পেশ করে। বিজেপি নেতা সম্রাটের বিরুদ্ধে সেই অভিযোগ খন্ডনে সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন নীতীশ। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন তাঁর উপমুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বয়সে কারচুপির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
বিহারের রাজনীতিতে লালুপ্রসাদের বিকল্প হিসেবে নীতীশ কুমারের উত্থান স্পষ্ট হতে সম্রাট হাত ধরেছিলেন জেডিইউ নেতার। ২০১৪ সালে মুখ্যমন্ত্রী জিতেন্দ্র মাঝি নিজের দল গড়লে নীতীশকে ছেড়ে নতুন পার্টিতে যোগ দেন সম্রাট। ২০১৮-তে বিজেপিতে যোগ দিয়ে তিন বছরের মাথায় হন দলের রাজ্য সভাপতি। এরপর দু দফায় নীতীশের মন্ত্রিসভায় উপ মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর বুধবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন সম্রাট চৌধুরী। বিজেপি ও জেডিও শিবিরের খবর, নীতীশের ইশারাতেই বিজেপি সম্রাট চৌধুরীর বিষয়ে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছেড়ে তাঁকে ভাবি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অনেক আগেই ভেবে রেখেছিল। কারণ বিজেপি ভালই জানে নীতীশের গড়ে তোলা অতি পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়ের সমর্থন ছাড়া তাদের পক্ষে বিহারে টিকে থাকা মুশকিল। ফলে বিহারে বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রীকে বেছে দিয়েছেন নীতীশ কুমার।