বাংলা সাহিত্য তো বটেই, বাংলা ছবিতেও ভূতের উপস্থিতি বিলক্ষণ টের পাওয়া গেছে। ছেড়ে কথা বলে না রাজনীতিও। কারণে অকারণে সেখানেও ‘তেনাদের’ বিস্তর আনাগোনা।

ছবি: সত্যজিৎ রায়ের আঁকা থেকে অনুপ্রাণিত
শেষ আপডেট: 19 October 2025 20:06
ভূত—শব্দটা কানের ভেতর দিয়ে মরমে ‘পশিয়ে’ যাওয়ার আগেই শিউরে ওঠে গা! অদৃশ্য কোনও শক্তি, অস্তিত্ব প্রমাণের ঊর্ধ্বে, কিন্তু গল্প পড়ে, তার চেয়েও আগ্রহভরে শুনে মানুষ মুগ্ধ হয়… যুগে যুগে। ভয় আর কৌতূহল চলে হাত ধরাধরি করে। আর এই মণিকাঞ্চনই ভূতের গল্পকে করে তোলে এতখানি জনপ্রিয়… যুগে যুগে!
বাংলা সাহিত্য তো বটেই, বাংলা ছবিতেও ভূতের উপস্থিতি বিলক্ষণ টের পাওয়া গেছে। ছেড়ে কথা বলে না রাজনীতিও। কারণে অকারণে সেখানেও ‘তেনাদের’ বিস্তর আনাগোনা।
ভোটার যখন 'ভূত'
ছাব্বিশে বিধানসভা ভোটের আগে ভোটার তালিকায় ‘কারচুপি’ যখন নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শাসকদলের, তখনই নেতাজি ইন্ডোরে দলের মেগা বৈঠকে সে বিষয়ে সতর্ক করার পাশাপাশি ‘ভূত’ খোঁজা শুরু হয়ে গিয়েছিল। এই ভূত আসলে ভূতুড়ে ভোটার। যার জন্য দলের তরফে একটি কোর কমিটি গড়ে দেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার অভিযোগের পরেই পাঁচ দিনের মধ্যে জোড়া বিবৃতি দিয়ে কমিশন স্বীকারও করে যে, এক এপিক নম্বরে একাধিক রাজ্যে ভোটার কার্ড রয়েছে।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ পেয়েই নিজের নিজের জেলায় ফিরে ভোটার তালিকা স্ক্রুটিনির কাজ শুরু করেছিলেন বিধায়ক, জেলা সভাপতিরা।
রাজ্যের শাসকদল জাতীয় নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দিয়ে এই দাবিও জানিয়ে এসেছে, কেন পাসপোর্ট, আধার কার্ডের মতো ভোটার কার্ডের (এপিক) ‘ইউনিক’ নম্বর থাকবে না? 'ভূত' খোঁজার সেই আবহেই আধার কার্ডের সঙ্গে এপিক কার্ডের সংযুক্তিকরণের বিষয়ে বৈঠক ডাকে জাতীয় নির্বাচন কমিশন।
'ভূতের' মতো খাটাখাটনি
যাদের কাজ নিন্দা করা, তাঁরা নিন্দা করবেনই। তাঁদের অপপ্রচারে কান না দেওয়ার জন্য রাজ্যের পুলিশ কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Chief Minister Mamata Banerjee)।
আলিপুর বডিলাইনসের (Alipore Bodylines) দুর্গাপুজোর উদ্বোধনে গিয়ে পুলিশকর্মীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “যাদের কাজই হল নিন্দা করা, তারা নিন্দা করবেই। আপনি আপনার কাজটা করে যান। যারা অপপ্রচার করে, তাদের কথায় কান দেবেন না। কারণ ৫ জনের জন্য তো আর ৯৫ জনকে বঞ্চিত করা ঠিক নয়।”
এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। নিজের উদাহরণ টেনে বলেন, “আমি 'ভূতের' মতো সারাদিন খাটি, তবুও সবচেয়ে বেশি গালাগালি আমাকেই খেতে হয়। তবু আমি বিশ্বাস করি, ক্ষমাই সবচেয়ে বড় ধর্ম।”
হেরো ভূত
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নয়, আগে তাঁকে হারিয়ে দেখাক শুভেন্দু অধিকারী। শ্রীরামপুরের যে কোনও কেন্দ্র থেকে বিরোধী দলনেতাকে ভোটে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল সাংসদের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে ভোটে লড়লে শুভেন্দুকে তিনি হারিয়ে 'ভূত' করে দেবেন!
কল্যাণ বলেন, ‘সব জায়গায় বলে বেড়াচ্ছে আমি শ্রীরামপুরের অন্তর্গত কোন কোন বিধানসভায় হেরেছি। আপনি কিছুই জানেন না। শ্রীরামপুরের সাতটা বিধানসভাতেই আমি জিতেছি৷ তোকে চ্যালেঞ্জ দিলাম শুভেন্দু অধিকারী, শ্রীরামপুরের কোন বিধানসভা থেকে দাঁড়াবি দাঁড়া, হারিয়ে ভূত করে দেব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কী চ্যালেঞ্জ নিচ্ছিস। আগে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ কর। হারিয়ে 'ভূত' করে দেব। পুরো প্যাক করে পাঠিয়ে দেব।’
লাথো কে ভূত
রাজনীতির ভূত কেবল বঙ্গরাজনীতিতেই যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে তা নয়। মুর্শিদাবাদের একাধিক এলাকা যখন তপ্ত হয়ে উঠেছিল; সামশেরগঞ্জ, সুতি এলাকায় কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে যখন কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হয়, তখন উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ চুপ করে থাকেননি।
যারা অশান্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে, ডান্ডা দিয়েই ঠান্ডা করার নিদান দিয়েছিলেন যোগী। বলেছিলেন, "লাথো কে ভূত, বাতো সে নহি মানেঙ্গে...।"
রাজনীতি আর ভূত— দু’টোরই মিল একটাই, দেখা যায় না, কিন্তু প্রভাব গভীর। কেউ ভূতের ভয় দেখিয়ে রাতের ঘুম কেড়ে নেয়, কেউ রাজনীতির খেলা দেখিয়ে দিনের শান্তি। শেষ পর্যন্ত মানুষই বোঝে, ভূত যতটা ভয়ঙ্কর নয়, রাজনীতির ছায়াটাই আসলে বেশি ঠান্ডা স্রোতের মতো শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায়।