সেসময়ে যদি মানসিক সমস্যা নিয়ে এত আলোচনার অবকাশ থাকত, তাহলে হয়তো পুলকের (Pulak Banerjee) এই লেখা পড়ে কেউ না কেউ ঠিক বুঝে নিতেন, কবি আসলে এই লেখার মধ্যে দিয়ে এই পৃথিবীর যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছেন।

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 20 October 2025 17:35
আমায় একটু জায়গা দাও, মায়ের মন্দিরে বসি।
আমি অনাহুত একজন, অনেক দোষেতে দোষী!
গত বেশ বেশ কয়েক বছরে কালীপূজো এলেই বাঙালির মাইকে পান্নালাল আর কুমার শানুর পাশাপাশি যে গান জায়গা করে নেয় তা মান্না দের গাওয়া এই গান, “আমায় একটু জায়গা দাও...”
এই গান নিয়ে চটুল মজারও শেষ নেই। সমাজ মাধ্যমে যেমন কেউ লেখেন, “ওরে মান্না দেকে কেউ একটু বসতে দে!” ক্ষতির কিছু নেই। কিন্তু পাশাপাশি, আমাদের এই গানের ভেতরের সত্যকেও জেনে রাখা উচিৎ। কারণ, যে প্রগতিশীল সময়ে আমরা বাস করছি, নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করছি, সহানুভূতির কথা বলছি, যে সময় দাঁড়িয়ে এই গান নিয়ে মস্করা বড় অসংবেদনশীল ঠেকে।
কারণ, মান্না দের এই গানটি আদতে নিছক একটি ভক্তিমূলক ঠাকুরের গান না, বরং অবসন্ন, ক্লান্ত এক গীতিকারের মনের কোণে জমে থাকা অবসাদও বটে। যে অবসাদ তাঁকে শেষ করে দিয়েছিল, আত্মহত্যা নামক চূড়ান্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে।
প্রখ্যাত সুরকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর হাত থেকে বের হয়েছে অনবদ্য সমস্ত গান। সেসময়ের বম্বের বিখ্যাত গাইয়ে যেমন লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমার-- প্রায় সকলেই পুলকের লেখা বাংলা গানে স্বর দিয়েছেন। “আজ মিলন তিথির পূর্ণিমা চাঁদ মোছায় অন্ধকার” থেকে শুরু করে মান্না দের কালজয়ী গান “‘যখন কেউ আমাকে পাগল বলে”ই হোক, সব পুলক বাবুর সৃষ্টি। খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছিলেন বলা যায়। অথচ এই মানুষটাই কল্পনাতীতভাবে আত্মহত্যা করেন গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে।
এখন ডিজিটাল দুনিয়ায় চটজলদি আমরা নিজেদের মনের কথা একে অপরকে জানাতে পারি, সমাজমাধ্যমের দেওয়ালজুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারি। তবে পুলকবাবুর এ গান যে সময় বের হয়েছিল তখন অবশ্য এসবের বালাই ছিলই না। ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের এত বড় মঞ্চও কারও হাতে ছিল না। থাকলে কী হত, তা অবশ্য জানা নেই।
১৯৯৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সকালে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে গঙ্গার অতলে ঠেলে দেন নিজেকে। শেষ হয় বাংলা গানের এক অধ্যায়ের। সেই ঘটনার কয়েক মাস আগেই যে গানগুলি তিনি লিখে গেছিলেন, সে গানগুলি নিয়েই বের হয় বাংলা গানের অ্যালবাম, “মা আমার মা”। সবকটি গানই পুলকের লেখা। সুর করেছিলেন মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়। গেয়েছিলেন মান্না দে।
মোট আটটি গান ছিল এই অ্যালবামে। যার মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ গান “আমায় একটু জায়গা দাও” আর “যখন এমন হয়”। দুটি গানের কথায় অদ্ভুত নৈরাশ্য, একাকীত্ব, অবসাদ। যে গানের লাইন আজ মস্করার বস্তু, তার ইতিহাস জানলে ভেবে দেখতেই হয়, কোন যন্ত্রণা থেকে একজন কবি লেখেন: “আমি সবার পিছনে থাকব, শুধু মনে মনে মাকে ডাকব, কারও কাজে বাধা দিলে, সাজা দিও যত খুশি!“ অথবা, "যখন এমন হয়, জীবনটা মনে হয় ব্যর্থ আবর্জনা, ভাবি গঙ্গায় ঝাঁপ দিই, রেলের লাইনে মাথা রাখি!"
বিংশ শতকে এসে আমরা মানসিক রোগকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলি। সংবেদনশীলতার কথা বলি। সেসময়ে যদি মানসিক সমস্যা নিয়ে এত আলোচনার অবকাশ থাকত, তাহলে হয়তো পুলকের এই লেখা পড়ে কেউ না কেউ ঠিক বুঝে নিতেন, কবি আসলে এই লেখার মধ্যে দিয়ে এই পৃথিবীর যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছেন।
নিজেকে 'কবি' বলার প্রসঙ্গে পুলক তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন “আমি আধুনিক গানই লিখতাম। আধুনিক গানই লিখছি, আর যত দিন বাঁচব, তত দিন এই আধুনিক গানই লিখে যাব। আমি কবি ছিলাম কিনা জানি না, তবে কৈশোর থেকে বুঝে নিয়েছিলাম, গান লেখা কবিতা লেখারই অঙ্গ। এখনকার কবিরা আমাদের গীতিকার আখ্যা দিয়েছেন। যার ফলে আমরা গীতিকার হয়ে গেছি, কবি হতে পারিনি।"
তাঁর মৃত্যুর পর বন্ধু মান্না দেও বলেছিলেন যে, পুলক বাবু এমন এক কান্ড ঘটাবেন, তিনি বুঝেই উঠতে পারেননি।
"কত দিন পরে এলে একটু বসো, তোমায় অনেক কথা বলার ছিল, যদি শোনো...।" কিন্তু পুলকের শেষ জীবনে কথা শোনার বোধহয় কেউই ছিল না, থাকলে হয়তো গীতিকার লিখতেন না, “যখন ভালোবাসা বহু পথ ঘুরে চলে যায় দূর থেকে দূরে, বন্ধুর দরজাতে যতো কিছু করাঘাত, যায় বিফলে!”
মানসিক সচেতনতা হয়তো তখন ছিল না, কিন্তু এখন তো আছে। তাই মজা, মিম, চটুলতা যতই থাক, একজন মানুষের চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়ার শেষ স্মৃতিটুকুকে ছাড় দেওয়া যায় সেই তালিকা থেকে!