Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
রহস্য আর মনের অন্ধকারে ঢুকে পড়ল ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’! টিজারে চমকজিৎ-প্রযোজক দ্বন্দ্বে আটকে মুক্তি! ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’-এর মুক্তি বিশ বাঁও জলে?কিউআর কোড ছড়িয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ! কীভাবে রাতারাতি নয়ডার বিক্ষোভের প্ল্যানিং হল, কারা দিল উস্কানি?নয়ডা বিক্ষোভ সামাল দিতে 'মাস্টারস্ট্রোক' যোগী সরকারের! শ্রমিকদের বেতন বাড়ল ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত Jeet: ভুয়ো প্রচার! ভোট আবহে গায়ে রাজনীতির রঙ লাগতেই সরব জিৎ৪ হাজার থেকে নিমেষে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ফলোয়ার! এক স্পেলেই সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন তারকা প্রফুল্লসামনে কাজল শেখ, মমতা কথা শুরু করতেই হাত নেড়ে বিরক্তি প্রকাশ অনুব্রতর! সিউড়িতে কী ঘটলEPL: নায়ক ওকাফর! ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ৪৫ বছরের অভিশাপ মুছল লিডস, রক্ষণের ভুলে ডুবল ম্যান ইউAsha Bhosle: 'এত ভালবাসার সবটাই তোমার...,' ঠাকুমার স্মৃতি আঁকড়ে আবেগঘন পোস্ট নাতনি জানাইয়েরSupreme Court DA: ডিএ নিয়ে সময়সীমা বৃদ্ধির আর্জি, বুধবার রাজ্যের মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্ট

তর্পণের ইতিকথা, ভবিষ্যপুরাণ বলে মহালয়ার অর্ঘ্যে যত তিল, স্বর্গলোকে ততদিন বাস পূর্বপুরুষদের

মহালয়ার তর্পণ শুধু পূর্বপুরুষ নয়, সব আত্মার উদ্দেশে নিবেদিত অর্ঘ্য। নিত্যপূজার থেকে কেন আলাদা এই তর্পণ, কী বলে পুরাণ—জেনে নিন বিশদে।

তর্পণের ইতিকথা, ভবিষ্যপুরাণ বলে মহালয়ার অর্ঘ্যে যত তিল, স্বর্গলোকে ততদিন বাস পূর্বপুরুষদের

মহালয়ার তর্পণ

পৃথা ঘোষ

শেষ আপডেট: 21 September 2025 09:59

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভোরের আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে গঙ্গার মৃদু স্রোত। আস্তে আস্তে ঘাটে ভিড় জমছে ধুতি-চাদর পরিহিতদের। খানিক পরেই দেখা যাবে বাঙালির চিরচেনা চিত্র, বাতাস ভরে উঠবে মন্ত্রোচ্চারণে। নাভিজলে দাঁড়িয়ে স্বর্গীয় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে অঞ্জলিভরে জল দান করবেন ঘাটে উপস্থিত সকলে, শুরু হবে মহালয়ার তর্পণ।

আশ্বিনে শারদপ্রাতে বাঙালির আবেগ নিয়ে স্বচরিত্রে হাজির হয় মহালয়ার ভোর। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় মহিষাসুরমর্দিনী শুনবে একটা প্রজন্ম। আর একটা প্রজন্ম উপস্থিত হবে গঙ্গার ঘাটে।

তর্পণ কথার অর্থ তৃপ্ত করা। কথিত আছে, এই সেই সময় যখন পূর্বপুরুষরা প্রেতলোক ছেড়ে নেমে আসেন মর্ত্যের কাছাকাছি, তাঁদের উত্তরসূরীদের হাত থেকে অর্ঘ্য-জল গ্রহণ করবেন বলে। কিন্তু এই প্রেতলোক, মহালয়া – শব্দগুলির মধ্যে কিন্তু মৃত্যুর মতো কোনও অমোঘ ছায়া নেই। বরং আছে উত্তরপুরুষদের মধ্যে দিয়ে পূর্বপুরুষদের অমরত্বের এক ক্ষীণ প্রত্যাশা।

প্র+ইত সন্ধিতে তৈরি হয়েছে প্রেত। প্রেত কথার অর্থ, যাঁরা চলে গিয়েছেন পৃথিবী ছেড়ে, তাঁদের আর ফেরত আসা সম্ভব নয়। তাঁরা শ্রাদ্ধের পর মুক্তি পেয়ে বরাবরের জন্য ঠাঁই পেয়েছেন প্রেতলোকে। এখন তাঁরা দেবতাসম। এই তর্পণই পিতা, পিতামহ এবং প্রপিতামহ – এই তিনপুরুষকে মনের গহীনে রেখে দেওয়ার এক সূত্রবিশেষ।

মহালয়ার দিনই যে একমাত্র তর্পণ করতে হয়, এমন কোনও নিয়ম কিন্তু নেই। সূর্য যখন কন্যা রাশিতে যান, পিতৃপক্ষের শুরু থেকে অর্থাৎ, প্রতিপদ থেকে মহালয়া - এই ১৫ দিন ধরেই করা যায় তর্পণ। মনে করা হয়, মুখ্য চন্দ্র ভাদ্র মাসের অমাবস্যাতে প্রেতপুরী প্রেতশূন্য হয়ে পড়ে। কারণ ওই সময় পূর্বপুরুষরা জল-তর্পণ পাওয়ার আশায় নীচের দিকে নেমে আসেন। তাই, এই ১৫ দিন বা দিন হিসেবে মহালয়ার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

তর্পণের জন্য কিন্তু বিশেষ কিছু লাগে না। তিল এবং জল। এই তিল-ই অন্নস্বরূপ। কারণ তিল প্রথম এক শস্য যা, ঋগবেদের আমলে যজ্ঞে ব্যবহৃত হত। ভবিষ্যপুরাণ বলে, গঙ্গা তর্পণে যে পরিমাণ তিল গ্রহণ করা হয়, সেই সংখ্যক সহস্রবছর পূর্বপুরুষরা স্বর্গে বাস করেন।

একটা সময় পর্যন্ত মানুষ এই টানা ১৫ দিন তর্পণ করতেন। সাল আনুমানিক ১৯৫৭, কলকাতা হাইকোর্টে (তৎকালীন ক্যালকাটা হাইকোর্ট) স্পেশাল নোটিস আসত ‘The Tarpanist’-দের নামে, অর্থাৎ যাঁরা তর্পণ করবেন। ছুটি ঘোষণা হত দুপুরবেলা এক থেকে দু’ঘণ্টা। ধুতি-চাদর নিয়ে সকলে নিয়ম মেনে গঙ্গার ঘাটে সেরে আসতেন তর্পণ।

তর্পণ কিন্তু চাইলে রোজই করা যায়। আগেকার দিনের মানুষ স্নানের সময় পূর্বপুরুষদের জল দিতেন, রোজ। কিন্তু মহালয়া মানেই তর্পণ – এ যেন প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। তাহলে মহালয়ার তর্পণের বিশেষত্ব কোথায়? প্রশ্ন আসতেই পারে। এখানেও দু’টি বিশেষ কারণ রয়েছে।

কথিত আছে, পিতৃলোকের একদিন মর্ত্যের ৩৬৫ দিনের (এক বছর) সমান। তাই আমরা যুগের পর যুগ ধরে বছরের এই একটা দিন বিশেষ এই আচারের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের অন্ন-জল জুগিয়ে চলেছি।

প্রথম কারণের সঙ্গে একটা ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর কর্ণ যখন অর্জুনের বাণে নিহত হয়ে স্বর্গে পৌঁছলেন, তাঁকে বীরের সম্মানে আপ্যায়ন করলেন দেবরাজ ইন্দ্র। যত্ন ভরে থালা সাজিয়ে এল খাবার। কিন্তু একী! তাঁর পাতে তো অন্ন নেই, রয়েছে শুধু হিরে-সোনাদানা-মাণিক্য। অবাক হয়ে যান কর্ণ। তখন ইন্দ্র তাঁকে বলেন, তুমি তো সারাজীবন মানুষকে যাবতীয় জিনিস দান করে এসেছ, কোনওদিন তো কাউকে অন্ন-জল দাওনি। কোনওদিন পিতৃপুরুষের উদ্দেশে জল দাওনি। উত্তরে কর্ণ বলেন, আমি তো জানিই না আমার বাবা-মা কে, কী করে আমি তর্পণ করব! তখন এরূপ একটা ফয়সালা হয় যে, মহালয়ার ১৫ দিন আগে কর্ণ মর্ত্যে আসবেন, ১৫ দিন ধরে তিনি তর্পণ করবেন – যা শেষ হবে মহালয়ার দিন অর্থাৎ, অমাবস্যায়। সেই থেকে পূর্বপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ শুরু হয় মর্ত্যে।

আরও একটি কারণ আছে, তা হল, তর্পণ যেকোনও দিন করা গেলেও মহালয়ার তর্পণের বিশেষত্ব এখানেই যে, এই দিনে কেবল পূর্বপুরুষ নয় – আত্মীয়পরিজন, চেনাপরিচিত, স্বল্পপরিচিত, অপরিচিত সকল মানুষের উদ্দেশে জলদান করা যায়। এখানেই মহালয়ার তিথির সার্থকতা।

সেই সূত্র ধরেই বলা যায়, গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম অকৃতদার ছিলেন, তিনি বিয়ে করেননি। সন্তানাদি ছিল না তাঁর। তাহলে কি তিনি জল পাবেন না, তর্পণ পাওয়ার অধিকার নেই? শাস্ত্রের বিধানে, তাঁর জন্য তর্পণেরও বিশেষ নিয়ম-মন্ত্র রয়েছে।  
                      
ভারতের মতো এক দেশেই বোধহয় এমনভাবে সকলকে আপন করে নেওয়া সম্ভব! এখানেই যে এই দেশের সংস্কৃতির মাধুর্য লুকিয়ে রয়েছে।

এখানে একটা দ্বিমত আছে, কেউ কেউ মনে করেন তর্পণ শুধুমাত্র পুরুষদের অধিকার। তা কিন্তু নয়। মহিলারাও তর্পণ করতে পারেন। বংশে ছেলে, নাতি না থাকলে বিধবা মহিলা স্বামী, শ্বশুর, শ্বশুরের পিতা – এই তিন জনের তর্পণ করতে পারবেন।

অপঘাতে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও তর্পণ করা যায়। সেক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ তিথি হল কৃষ্ণা চতুর্দশী। তবে বিশেষত আত্মহত্যাজনিত বা প্রসবকালে মৃত্যু হওয়া নারীর ক্ষেত্রে অমাবস্যাটিকেই তর্পণের তিথি হিসেবে ধরা হয়।

মহালয়ার তর্পণের সঙ্গে মিশে রয়েছে সূক্ষ্মজগতের রহস্য। পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে নিবেদন করা অর্ঘ্য তাঁদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছল তো? এ বোঝা কেবল অনুভূতিমাত্র। অনেকেই মনে করেন, নিত্যপূজা, প্রার্থনার থেকে অনেক আলাদা মহালয়ার তর্পণের পরের এই অনুভূতি। যে প্রশান্তি নেমে আসে মনে, জাগতিক কিছুর সঙ্গে তার কোনও তুলনা হয় না। এই তৃপ্তিবোধেই রয়েছে মহালয়ার তর্পণের মাহাত্ম্য, সার্থকতা।


```