মহালয়া আদৌ শুভ দিন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মতভেদ প্রবল। মহালয়া তাই শুধু ভোর বেলা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ (Birendra Krishna Bhadra) আর রেডিওর ধ্বনি নয়, বরং শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব নিয়েও বাঙালির অন্তহীন আলোচনা।

গ্রাফিক্স: দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 20 September 2025 20:01
আজ মহালয়া (Mahalaya)। পিতৃপক্ষের সমাপ্তি। আশ্বিনের শারদ প্রাতে (DURGAPUJA 2025) যখন বেজে ওঠে আলোকবেণু, তখনই ঘুচে যায় পিতৃপক্ষের অন্ধকার, শুরু হয় মাতৃপক্ষের আগমনী সুর (Mahisasurmardini)। এদিনই বাঙালির মন জানিয়ে দেয়— দুর্গাপুজোর (Kolkata Durga Puja) হাতে গোনা আর ক'দিন। বাঙালির কাছে অবশ্য মহালয়া মানেই দুর্গাপুজোর সূচনা। আজকাল প্রায় প্রতিটি বড় পুজোর উদ্বোধন হয়ে যায় এই দিনেই। ঠাকুর দেখার হিড়িকও শুরু হয়ে যায়। যদিও প্রত্যেকবারই এই মহালয়া এলেই সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে চর্চা শুরু হয়ে যায় নিয়ে বিতর্কও কম নয়। মহালয়া আদৌ শুভ দিন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মতভেদ প্রবল। মহালয়া তাই শুধু ভোর বেলা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ (Birendra Krishna Bhadra) আর রেডিওর ধ্বনি নয়, বরং শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব নিয়েও বাঙালির অন্তহীন আলোচনা।
আমাদের উৎসবগুলি নির্ণীত হয় সূর্য আর চন্দ্রের গতিপথের উপর ভিত্তি করে। সূর্যের দক্ষিণায়নে দেবগণ নিদ্রামগ্ন হন, আবার উত্তরায়ণ এলে তাঁরা চোখ মুছে উঠে বসেন। আর আমরা দেখি সূর্যদেব কখনও আকাশের দক্ষিণ দিককে চারণভূমি করেন, কখনও বা উত্তরের দিকে চলেন। তাঁর এই যাত্রাপথকেই আমরা দেবতাদের ঘুমের কাল রূপে চিহ্নিত করেছি। মহালয়ার দিনটিও এই চন্দ্র সূর্যের গতিপথের খেলা। এবার আরও স্পষ্টভাবে সকলের কাছে তা প্রতীয়মান হয়েছে কারণ, পিতৃপক্ষ সূচনার দিন যে ভাদ্র পূর্ণিমা ছিল সেই পূর্ণিমার দিনে আমরা বিরল চন্দ্রগ্রহণের দেখা পেয়েছি। শেষ হবে সূর্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে।
অনেকেরই মতে মহালয়া যেহেতু পিতৃপুরুষকে জলদানের দিন তাই এইদিন শুভ বলা যায় না। অনেকে শুভ মহালয়া বলে যে মেসেজ পাঠান তা একেবারেই ভ্রান্ত। শুভেচ্ছা জানাবার দিন এটি নয়। শুভেচ্ছা জানাবেন কী জানাবেন না তা পৃথক বিষয়। কিন্তু দিনটি শুভ নয় একথা বলা যাবে না একেবারেই। কারণ, কেবল মহালয়ার দিনটিই যে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা যায় তা নয়। এটি পিতৃপক্ষের শেষ দিন। এই দিন অমাবস্যা তিথির জন্য সকলে তর্পণের জন্য প্রশস্ত দিন বলে মনে করেন। কিন্তু কালিকাপুরাণ অনুযায়ী পিতৃপক্ষ শুরু হওয়ার পর প্রতিটি তিথিই তর্পণের জন্য প্রশস্ত।
এখানে আরও একটি বিষয় জানা খুব প্রয়োজনীয় সেটি হল, এই পুরাণ অনুসারে সকলের জন্য একদিনে তর্পণ প্রশস্ত নয়। পিতৃপক্ষ পড়ার পর প্রতিটি তিথি মৃত্যুর কারণ অনুযায়ী পৃথক পৃথক জলদানের তিথি রূপে নির্ণীত হয়। যেমন এই পুরাণ অনুযায়ী যাঁরা অপঘাতে মারা যান তাঁদের এই তর্পণ পিতৃপক্ষের পঞ্চমী তিথিকে করা উচিত। সুতরাং যদি তর্পণের জন্য মহালয়াকে অশুভ তিথি বলে চিহ্নিত করা হয় তবে এই দোষে সমস্ত পিতৃপক্ষ দায়ী। কেবল মহালয়া তিথিকে অশুভ বলা যাবে না কখনওই।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার তা হল শ্রাদ্ধ বা তর্পণ কি অশুদ্ধ বা অশুভ? না, একেবারেই তা নয়। কালিকাপুরাণ অনুযায়ী শ্রাদ্ধ অত্যন্ত শুভ কাজ। যে পরিবারের সদস্যরা শ্রদ্ধার সঙ্গে পিতৃপুরুষকে জলদান করেন তাঁদের জীবনে, পরিবারে, অত্যন্ত সমৃদ্ধি আসে। অনেক পরিবারের নিয়ম আছে পরিবারের সদস্যদের কারো মৃত্যু হলে প্রথম শ্রাদ্ধের পর প্রতি মাসে শ্রাদ্ধ পালন করা হয়। পরে বারো মাস অতিক্রান্ত হলে বাতসরিক শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করার পরই গয়ায় পিণ্ডদান করে আসেন পরিবারের কোনো সদস্য। তাছাড়াও তাঁরা প্রতি মহালয়ার দিন জলদান করেন। এটা হল অবশ্যকরণীয় কৃত্য।
যদি মহালয়ায় তর্পণের মন্ত্র ও তার ক্রমকে নিয়ে কেউ পুঙ্খানুপুঙ্খ চিন্তা করেন তবে এর গভীরতা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা করতে সক্ষম হবেন। কারণ, এ কেবল নিজ পিতৃপুরুষকে জলদান করা নয়, এ হল নিজের মাতৃকুলকেও জলদানে তৃপ্ত করা। এখানেই তা শেষ নয়, এর ব্যঞ্জনা আরও গভীর হয়ে ওঠে যখন তর্পণকারী নাম না জানা, পরিচয় না থাকা, আত্মীয়স্বজনহীন মানুষগুলির উদ্দেশ্যে জলদান করেন। এ তো আধ্যাত্মিক সেবা! শ্রাদ্ধ বলে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।
কেবল তাই নয়, পিতামহ ভীষ্মকেও আমরা এই দিন জলদান করি। যিনি ভীষণ প্রতিজ্ঞা করে নিজের পরিবার গঠনে বিমুখ থেকেছেন। সুতরাং সেই ত্যাগকে এই দিনে স্মরণ করি আমরা। এই ব্যাপক অর্থগুলি আমাদের কাছে প্রকাশিত নয়, তাই আমরা তিথিকে অশুভ বা শুভেচ্ছা প্রেরণের উপযোগী দিন নয় বলে চিহ্নিত করেন। আমরা লোকায়ত ধারায় কেবল দেবীর সঙ্গে এই তিথিকে যুক্ত করে রাখি। কন্যারূপে এই দিন তিনি পিতৃগৃহে যাত্রা করলেন ভেবে আনন্দিত বাঙালি আমরা। তাই এই দিক থেকেও মহালয়া শুভ তিথি বৈকি!