নিমাই মোদক হাসতে হাসতে বলেন, “যতই নতুন অ্যাপ আসুক না কেন, রেডিওর আবেগটা আলাদা। এ বছর ভিড় একটু বেশিই। সবাই চাইছে তাড়াতাড়ি রেডিওটা যেন ঠিক হয়ে যায়।”

রেডিও সারাই করছেন নিমাই মোদক
শেষ আপডেট: 20 September 2025 13:49
মহালয়ার ভোর মানেই চল্লিশোর্ধ বাঙালির কাছে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া। নগর জীবনে কাশফুলের দোলা দেখা না, ইটকাঠের জঙ্গলে পেঁজা তুলোর মতো মেঘও নজরে আসে না খুব একটা। তবুও ভোর চারটেয় তাঁর জলদগম্ভীর গলা যখন ইথার তরঙ্গ বেয়ে পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে, তখনই তো প্রতিটা বাঙালির হৃদয়ে পিতৃপক্ষ শেষে দেবীপক্ষের আবাহন হয়। স্মার্টফোন, ইউটিউব লাইভ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ভিড়। এসব কিছুর মধ্যেও রেডিওয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ না বাজলে বাঙালির কাছে মহালয়ার ভোর অর্থহীন।
তাই তো মহালয়ার আগে রেডিও সারাইয়ের দোকানগুলিতে কর্মব্যস্ততা তুঙ্গে থাকে প্রতিবছরই। বর্ধমানের পুরনো দোকান শান্তি রেডিও-তে ভিড় জমেছে আগের চেয়ে বেশি। দোকানের মালিক নিমাই মোদক হাসতে হাসতে বলেন, “যতই নতুন অ্যাপ আসুক না কেন, রেডিওর আবেগটা আলাদা। এ বছর ভিড় একটু বেশিই। সবাই চাইছে তাড়াতাড়ি রেডিওটা যেন ঠিক হয়ে যায়।”
নিমাইবাবু শুধু একজন রেডিও মেকানিক নন, তিনি যেন এক ইতিহাসের রক্ষক। ৭৬ বছর বয়স হলেও এখনও তাঁর হাতের জাদু অমলীন। গত ৬০ বছর ধরে এই পেশায়, একসময় ঝুমরিতালাইয়ার মারফি রেডিও কোম্পানিতে কাজ করতেন। ৪০ বছর আগে খুলেছিলেন নিজের দোকান। রেডিও এখন আর কেউ শোনে না —এই ধারণা মানতেই নারাজ তিনি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, “অনেক জায়গায় সাউন্ড হয়তো আগের মতো পরিষ্কার আসে না। মোবাইল টাওয়ার, নানা প্রযুক্তির জটিলতা আছে। তবু রেডিও থেকে যাবে। যেমন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র থেকে গেছেন।”
শুধু নিমাইবাবুই নন, তাঁর দোকানে আসা পুরনো রেডিও প্রেমিকরাও এই একই বিশ্বাস জারিত রেখেছেন। যেমন শিবু কংসবণিক আজও রেডিও ছাড়তে পারেননি। মহালয়ার আগের রাতে রেডিওটাকে ঝেড়েঝুড়ে নেন বালিশের পাশে রাখার জন্য।বললেন, “যতদিন বীরেনবাবুর কণ্ঠ বাজবে, ততদিন এই টান থাকবে।”
মহালয়ার ভোর তাই শুধু দেবীপক্ষের সূচনা নয়, এটি বাঙালির কাছে এক অন্য আবেগ। আর সেই আবেগের সঙ্গে এখনও জড়িয়ে আছে একটা যন্ত্র—রেডিও। জেন-জি হয়তো বা এই অনুভবের সরিক হতে পারবে না, কিন্তু মধ্য তিরিশও খুঁজে পায় অন্য অনুভব।