মহালয়ার ভোর মানেই বাঙালির চিরন্তন আবেগ ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ আর পঙ্কজ মল্লিকের সুরে ভোরের রেডিও অনুষ্ঠান আজও দুর্গোৎসবের সূচনার অপরিহার্য অংশ। কীভাবে এই গীতিআলেখ্য শুরু হয়েছিল?
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স - শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 20 September 2025 20:02
পিতৃপক্ষের অবসান, মাতৃপক্ষের সূচনা। এই মাহেন্দ্রক্ষণে বাঙালির ঘুম ভাঙে এক বিশেষ সুরে। ভোর চারটের অ্যালার্মে চোখ খোলে, কম-বেশি সকলেই হাত বাড়ায় পুরনো রেডিওর দিকে। এখনও, আজকের দিনে দাঁড়িয়েও বাঙালি অদ্ভুতভাবে পুরনো দিনে ফিরে যায়, কারণ মহালয়ার ভোর মানেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।
রেডিওর চাহিদা কমেছে তা অস্বীকার করার জায়গা নেই, ইউটিউব-অ্যাপের ভিড়ে চাইলেই মিলছে সেই রেকর্ডেড সংস্করণ। তবুও ভোরের আলো ফোটার আগেই রেডিও-তে 'বাজল তোমার..' শুনতে উতলা হন এখনও অনেকে। এটা প্রত্যেক বাঙালির কাছে নস্টালজিয়া, আবেগ। বাঙালির শরতের সূর্যোদয় অসম্পূর্ণ রয়ে যায় এই অনুষ্ঠান ছাড়া।
একটা রেডিও অনুষ্ঠান, তার সঙ্গে এত আবেগ জড়িয়ে, আগে কখনও দেখা গেছে কি না তা ঠিক বলা যাবে না। কেউ এটাও বলতে পারবে না, এমন অনুষ্ঠান আদৌ আর হবে কি না। এই পরিমাণ জনপ্রিয়তা পাওয়া, একটা জাতির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া, মুখের কথা নয়।
তবে, শুরুতেই এর নাম মহিষাসুরমর্দিনী ছিল না। এটি রেকর্ড হওয়া, স্থায়ী নামকরণ হয় অনেকটা পরে। ১৯২৭ সালের ২৬ অগস্ট, ভারতবর্ষের দ্বিতীয় বেতারকেন্দ্র হিসেবে জন্ম নেয় কলকাতার আকাশবাণী। গারস্টিন প্লেসের পুরনো ভবনে সুলতান চিনয়, সি সি ওয়ালিক, নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদাররা শুরু করেন নতুন অধ্যায়। ঘোষক হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহনবাগানের প্রাক্তন ফুটবলার রাজেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। পরে যোগ দেন রাইচাঁদ বড়াল, বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য (বাণীকুমার), বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, পঙ্কজ মল্লিক ও অসংখ্য গুণীজন।
১৯২৯ সালে হীরেন্দ্রকুমার বসুর উদ্যোগে বেরোয় এইচএমভি রেকর্ড ‘প্রভাতে আশ্রম দৃশ্য’। সেই আবহসঙ্গীত-ভিত্তিক প্রভাতি আসরই হয়ে ওঠে মহিষাসুরমর্দিনীর পূর্বসূরি।
এর ঠিক এক বছর পর ১৯৩০ সালের জুন মাসে আকাশবাণী কলকাতা থেকে সম্প্রচারিত হয় প্রথম প্রভাতি অনুষ্ঠান। ভোরে পাখির কলতান, জানালার বাইরে রাখা মাইক্রোফোনে ধরা প্রকৃতির সুর, আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গ্রন্থনায় সৃষ্টি হয় এক অদ্ভুত গীতিআলেখ্য। এরপর ১৯৩২ সালে মহাষষ্ঠীর ভোরে প্রচারিত হয় বাণীকুমারের লেখা ও পঙ্কজ মল্লিকের সুরে এই বিশেষ প্রভাতি অনুষ্ঠান। এর মধ্যেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় পরবর্তী ‘মহিষাসুরমর্দিনী।’
অনুষ্ঠানের নাম পাল্টাতে থাকে, ১৯৩৬ সালে মহাষষ্ঠীর ভোরে ‘মহিষাসুর বধ’ নামে দেড় ঘণ্টার একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। কিন্তু সেই নাম নিয়ে ঠিক সন্তুষ্ট হচ্ছিলেন না কেউই। একটা স্থায়ী নাম দরকার ছিল। ঠিক হয়, পরের বছর থেকে নাম হবে, ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। আর এর সঙ্গে এও ঠিক হয়, প্রতিবছর মহাষষ্ঠী নয়, মহালয়ার ভোরে প্রচারিত হবে এই গীতিআলেখ্য।
এই অনুষ্ঠানের বিশেষত্ব ছিল এর সর্বজনীনতা। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গভেদ ভুলে শিল্পীরা একত্রিত হতেন। হিন্দু-মুসলমান শিল্পীদের একসঙ্গে যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশন হয়ে উঠেছিল সম্প্রীতির প্রতীক। কোনও কোনও সময়ে ভুলবশত সংস্কৃত শ্লোকের জায়গায় ভিন্ন সুর বাজলেও শ্রোতার মন জয় করেছে সেটাই। মহালয়ার ভোর তাই হয়ে উঠেছে ভ্রাতৃত্বের এক অন্যতর মঞ্চ।
পঙ্কজ মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুপ্রভা সরকার, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, কত না শিল্পীর কণ্ঠ জড়িয়ে আছে এই প্রভাতি গাথায়। স্ক্রিপ্ট বদলেছে, গান পাল্টেছে, কিন্তু আবেগ অটুট থেকেছে। এমনকি গুজব ছড়িয়েছে, একবার নাকি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বদলে চণ্ডীপাঠ করেছিলেন নাজির আহমেদ। যদিও প্রমাণ মেলে না।
১৯৭৬: মহানায়ক বনাম মহিষাসুরমর্দিনী
১৯৭৬ সালে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে বাদ দিয়ে মহালয়ার ভোরে সম্প্রচারিত হয় ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম’। চণ্ডীপাঠ করেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। সঙ্গীতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। কিন্তু ফল? প্রবল ক্ষোভ। বাঙালির কাছে মহিষাসুরমর্দিনী আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র অবিচ্ছেদ্য হয়ে গিয়েছিল। বেতার অফিসে অভিযোগের পাহাড়, আকাশবাণীর সামনে মানুষের ভিড়। শেষ পর্যন্ত ফেরাতে হয় পুরনো অনুষ্ঠানকেই। আর কখনও সেই ভুল করেনি আকাশবাণী কলকাতা।
রেকর্ডিং থেকে ডিজিটাল যুগে পা
১৯৬২ সালের পর থেকে সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। টেপে রেকর্ড করে রাখা শুরু হয় অনুষ্ঠান। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় স্থায়ী সংস্করণ। বহু হারানো গান, বহু অচেনা সংস্করণ আজও আকাশবাণীর আর্কাইভে রয়েছে। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক টেপ ভেঙে গিয়েছে, তবু ডিজিটালাইজেশনের দৌলতে উদ্ধার হয়েছে বহু অমূল্য রেকর্ড। আকাশবাণীর কাছে এমন অনেক রেকর্ড রয়েছে, যা এই নকলের যুগে ব্রহ্মাস্তের কাজ করবে। প্রতিবছর আকাশবাণী আর পাঁচটা রেডিও চ্যানেলের থেকে আলাদা রেকর্ডই বাজিয়ে থাকে।
যুগ বদলেছে। এখন হাতে স্মার্টফোন, ইউটিউবে ক্লিক করলেই মিলবে অনুষ্ঠান। কিন্তু তবু বাঙালি মহালয়ার ভোরে রেডিওর ধুলো ঝেড়ে, বা আগের রাতে সারিয়ে সকালে উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে, 'আশ্বিনের শারদপ্রাতে' শুনতে শুরু করে। যেমনই আবহাওয়া হোক, যেমনই পরিস্থিতি হোক, মহিষাসুরমর্দিনীর হাত ধরেই পুজো আসে বাঙালির ঘরে ঘরে।