Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
West Bengal Election 2026 | ‘৫০-আসন জিতে তৃণমূলকে ১৫০-আসনে হারাব’ মাতৃত্বের দুশ্চিন্তা, ‘ভাল মা’ হওয়ার প্রশ্ন—সদগুরুর পরামর্শে স্বস্তি পেলেন আলিয়ালক্ষ্য ২০২৯ লোকসভা ভোট, তড়িঘড়ি মহিলা সংরক্ষণ কার্যকরে মরিয়া মোদী! বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি কংগ্রেস?Gold investment: যুদ্ধের বাজারে সোনার দাম কমছে! এটাই কি বিনিয়োগের সেরা সময়? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরারহস্য আর মনের অন্ধকারে ঢুকে পড়ল ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’! টিজারে চমকজিৎ-প্রযোজক দ্বন্দ্বে আটকে মুক্তি! ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’-এর মুক্তি বিশ বাঁও জলে?কিউআর কোড ছড়িয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ! কীভাবে রাতারাতি নয়ডার বিক্ষোভের প্ল্যানিং হল, কারা দিল উস্কানি?নয়ডা বিক্ষোভ সামাল দিতে 'মাস্টারস্ট্রোক' যোগী সরকারের! শ্রমিকদের বেতন বাড়ল ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত Jeet: ভুয়ো প্রচার! ভোট আবহে গায়ে রাজনীতির রঙ লাগতেই সরব জিৎ৪ হাজার থেকে নিমেষে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ফলোয়ার! এক স্পেলেই সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন তারকা প্রফুল্ল

ছোট পর্দার সবথেকে জনপ্রিয় দুর্গা তিনিই, নয়ের দশকে দূরদর্শনের 'মহিষাসুরমর্দিনী' রূপে তাঁকেই চিনেছে মানুষ!

যতই দর্শক ভাবুক মহিষাসুরকে ত্রিশুল দিয়ে বধ করছি আমি, ফাইটিং দৃশ্যে দুজনের যাতে না আঘাত লাগে সেই ভাবে তরোয়াল, ত্রিশূল সন্তর্পণে চালাতে হতো। যাঁরা অসুর করেছিলেন তাঁরা আমার পিতৃসম সব মানুষ। মঞ্চ ও থিয়েটারের ব্যক্তিত্ব। ওঁদের সঙ্গে আমায় যাতে গুরুগম্ভীর দুর্গার ভূমিকায় মানায়, সেটা পরিচালক করিয়ে নিয়েছিলেন আমাকে দিয়ে।

ছোট পর্দার সবথেকে জনপ্রিয় দুর্গা তিনিই, নয়ের দশকে দূরদর্শনের 'মহিষাসুরমর্দিনী' রূপে তাঁকেই চিনেছে মানুষ!

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: 7 September 2025 16:22


শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

“দেবী প্রপন্ন-আর্তি-হরে প্রসীদ প্রসীদ মাতঃ জগতঃ অখিলস্য। প্রসীদ বিশ্বেশ্বরি পাহি বিশ্বং ত্বম ঈশ্বরী দেবী চরাচরস্য।।”

মহালয়ার পুণ্য প্রত্যুষে আকাশবাণীর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানের মতোই টেলিভিশনেও ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠান খুবই জনপ্রিয়। সব বাংলা চ্যানেলেই এখন নতুন নতুন দুর্গার সমাহার। কিন্তু সবার মনে মা দুর্গা রূপে রয়ে গেছেন আজও একজনই, তিনি সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই গোড়া থেকে দূরদর্শন চ্যানেলে যিনি সবথেকে বেশি বার দুর্গা হয়েছেন। দেবীমুখ সংযুক্তা বিয়ের পর থেকে বহুদিন কানাডাবাসী। টরেন্টো থেকেই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিলেন ‘দ্য ওয়াল’কে। মহিষাসুরমর্দিনী নিয়ে বিনিময় করে নিলেন নানা গল্প, স্মৃতি, অভিজ্ঞতা। 

ঘোররূপা on X: "Sanjukta Banerjee, an Indian classical dancer & educator  specialised in Bharatnatyam & Mohiniyattam. She played the role of Durga  for Doordarshan on occasions of Mahalaya. Seems the talented artist


দ্য ওয়াল: ছোটবেলার গল্প দিয়েই শুরু করি। নাচের প্রতি ভালবাসা, নাচ নিয়ে এগোনো। বাবা, মা, পরিবারও কি নাচের পরিমণ্ডল ছিল? 

সংযুক্তা: একদমই না। বরং আমাদের ফিল্মি পরিবার। আমার নিজের জ্যাঠামশাই ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চ্চিত্র ও মঞ্চ অভিনেতা অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। স্টার থিয়েটারে উনি প্রচুর অভিনয় করেছেন। এছাড়াও সত্যজিৎ রায়ের 'শাখা প্রশাখা'তে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, দীপঙ্কর দে-দের বাবার ভূমিকায় উনি অভিনয় করেন। সন্দীপ রায়ের 'গুপী বাঘা ফিরে এল' ছবিতে জেঠু একটি প্রধান চরিত্র করেন। তাছাড়া সাদা কালো যুগের প্রচুর বাংলা ছবি করেছেন। উত্তম কুমারের সঙ্গে জেঠু অভিনয় করেছেন।

আবার আমার দিদিমার ভাই ছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা জহর গাঙ্গুলি। চলচ্চিত্র, থিয়েটার জগৎ দেখেই বড় হয়েছি। আমার জেঠতুতো দাদা-দিদিরাও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যুক্ত ছিল। সেজন্য নাচটা শেখার প্রতি আমার ভালবাসা ছিলই আর আমাকে আমার বাবা মা সবসময় পাশে থেকে ভরসা জুগিয়েছেন। পড়াশোনার পাশাপাশিই নাচটা শিখেছি। তবে হ্যাঁ আমিই প্রথম নাচ নিয়ে এগোই পরিবার থেকে। নাচ নিয়ে আমার আগে কেউ এগোয়নি আমাদের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে।

দ্য ওয়াল: নাচ শেখা কবে থেকে শুরু? 

সংযুক্তা: আড়াই বছর বয়সে নাচ শুরু। যেমন হয়, পাড়ার স্কুলে জেঠতুতো দিদি গান শিখতে যাচ্ছিল, দিদির সঙ্গে আমিও যেতাম। সেখানেই নাচের ক্লাসে মা ভর্তি করে দিলেন। আমি কিন্তু ছোটবেলাতেই দূরদর্শনে 'চিচিং ফাঁক' অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছিলাম। রাধা স্টুডিওতে শ্যুটিং হয়েছিল। মনে আছে আমার অডিশন নেন বিভাস চক্রবর্তী। একটা সাপুড়ের চরিত্র আমায় করতে দেওয়া হয়। তার পরে আমি 'বাণীচক্র'-এ গুরু পরিমল কৃষ্ণ ঘোষের কাছে কত্থক শিখি। নাচে চণ্ডীগড় ঘরানার যে পরীক্ষাগুলো হয় ফোর্থ ইয়ার অবধি, সেগুলো আমার ক্লাস ওয়ান-টুতেই পাশ করা হয়ে যায়। কিন্তু ফিফথ ইয়ারের পরীক্ষা মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষা না দিলে দেওয়া যেত না। এরকম সময় একদিন বাবা-মায়ের সাথে কলামন্দিরে যামিনী কৃষ্ণমূর্তির ভরতনাট্যম দেখতে গিয়ে ভরতনাট্যমের প্রেমে পড়ে যাই। যামিনী কৃষ্ণমূর্তির ঐ মঞ্চে আসা দেখেই আমার মনে হয় এই নাচটাই তো এতদিন চাইছিলাম দেখতে। এর পর থেকেই বাবা মাকে বলি এই নাচটাই শিখতে চাই। বাবা মা তখন গুরু থাঙ্কমণি কুট্টির নৃত্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'কলামণ্ডলম'-এ আমাকে ভর্তি করে দেন। অনেক পরীক্ষা করে উনি আমাকে ভর্তি নেন। এবং তার পর আমার যাত্রা শুরু।

TV Mahalaya added a photo to the album: Sanjukta Banerjee

দ্য ওয়াল: আজও মানুষের মনে মা দুর্গা মানে আপনার মুখ। এই মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের শুরুর গল্পটা কেমন ছিল? প্রথম দুর্গা সাজার অভিজ্ঞতা? 

সংযুক্তা: ১৯৯৪ সালে মহালয়ায় কলকাতা দূরদর্শনে প্রথম দুর্গা চরিত্রে আমার কাজ শুরু। তবে আমি কিন্তু 'কলামণ্ডলম'-এর হয়ে দূরদর্শনে 'হরেকরকম্বা', 'তরুণদের জন্য' অনুষ্ঠানে অনেক জনকে নাচ শিখিয়েছি। তাই ক্যামেরা ফেস করতে ভয় লাগেনি। কিন্তু শুরুরও একটা শুরুর গল্প থাকে। তখন আমি শ্রীশিক্ষায়তন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সকালবেলা কলেজের পরীক্ষা দিতে বেরোবো তখন গুরুজি গোবিন্দন কুট্টির ফোন, “আজ কলামণ্ডলমে এসো, জরুরি দরকার। অবশ্যই শাড়ি পরে এসো।“ আমি গুরুজিকে বললাম আমার পরীক্ষা চলছে। গুরুজি বললেন, "তবু এসো"। গুরুজির কথা রাখা কর্তব্য, তাই শাড়ি পরেই গেলাম সেদিন।

দূরদর্শন থেকে মহিষাসুরমর্দিনী প্রভাতী অনুষ্ঠান হবে তাঁর জন্য অনুষ্ঠানের প্রযোজক শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত এবং পরিচালক সনৎ মহান্ত এসছেন। সে বার ওঁরা ১৯৯৪ সালে মহিষাসুরের বাবা-মা পর্বটা দেখিয়েছিলেন। আর সেটা ওয়াটার ব্যালের মাধ্যমে। তখন দূরদর্শনে ওয়াটার ব্যালে খুব দেখানো হত। সেসবের জন্য মেয়ে সিলেক্ট করছিলেন। আমার সঙ্গে কোনও কথাই ওঁরা বলেননি। শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত যখন চলে যাচ্ছেন তখন মিসেস কুট্টি বললেন দুর্গা কাকে নির্বাচন করলেন তাহলে? শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত আমার দিকে হাত দেখিয়ে বললেন 'কেন ওঁকে।' আমি তো হাঁ। তখন মনে হল একটা গুরু দায়িত্ব আমার উপর এসে পড়ল। 

দ্য ওয়াল: দুর্গা সেজে শ্যুটিংয়ের অভিজ্ঞতা কেমন? নিজেকে দেবীচরিত্রে কীভাবে উত্তীর্ণ করলেন? 

সংযুক্তা: আমি একজনের কথা দিয়েই শুরু করছি যেটা আজও অবধি কোথাও বলা হয়নি। আমি যেদিন প্রথম শ্যুটিং করতে গেলাম সেদিন দূরদর্শনের পঙ্কজ সাহা মশাই আমায় ডেকে বললেন “তুমি তো সবে কলেজের প্রথম বর্ষে পড়। দুর্গার চরিত্র অনুযায়ী বেশ ছোট তুমি। তাই তোমায় যখন এঁরা নির্বাচন করেছেন শুধু নাচ করেই চলে এসো না। এটা মাথায় রেখো, মহালয়ার ভোরে সারা বাংলা তোমায় দেবী দুর্গা হিসেবে দেখবে। সেই দেবী মূর্তির ভাব যেন তোমার ভিতর থাকে।“ ওঁর এই কথাটা আমি মনে রেখেছিলাম। এবং এতবার আমি দুর্গা সেজেছি, এত বছর পরেও মানুষ আমায় মনে রেখেছেন, সেটাও আমি ওই কথাটা মনে রেখেছিলাম বলেই। পরিচালক সনৎ মহান্ত ভীষন ভাল ভাবে আমাদের পুরো ইউনিটকে শিখিয়েছিলেন। পরের মহালয়া অনুষ্ঠানগুলোয় পরিচালক হন কল্যাণ ঘোষ। ১৯৯৪ তে আমার পরে ১৯৯৫ সালে হেমামালিনী দুর্গা করলেন। ১৯৯৬ থেকে আবার আমার ডাক পড়ল। এবার থেকে সরাসরি আমার সঙ্গেই যোগাযোগ করত দূরদর্শন। ৭-৮ বার আমি দুর্গা সেজেছি। বিভিন্ন নামে হত অনুষ্ঠান। 'দনুজ দলনী দুর্গা', 'অসুর দলনী দেবী দুর্গা', 'দেবী দুর্গা'। আমার করা দুর্গা টেলিকাস্ট হয়েছে ১০ থেকে ১২ বার, প্রতি মহলয়ায়। এছাড়াও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের সঙ্গেও আমার অভিনীত দুর্গার রেকর্ড দূরদর্শন চালায়। এছাড়াও দুর্গার পোশাক ছিল আমার নিজের করা পোশাক। আমার ওয়ারর্ড্রোব। সাহায্য করেছিলেন ডিজাইনার অভয় পাল এবং আমার মা উমা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সেই চোখ, সেই তেজ, বাঙালির প্রথম দুর্গা তিনি, দেখুন | News in Bengali

দ্য ওয়াল: আপনার মায়ের নামেও দুর্গা! উমা বন্দ্যোপাধ্যায়! 

সংযুক্তা: হা হা হা (যেন সেই দেবী দুর্গা হাসলেন) তাই তো, ঠিক ঠিক! আমায় বলে দেওয়া হয়েছিল দুর্গা লুকে বাড়ির পূজিতা মা দুর্গার লুক যেন পুরাণ মেনে থাকে। পরিচালক সনৎ বাবু, কল্যান ঘোষ এবং অভয় পাল এঁরা বলেই দিয়েছিলেন একদম পুরাণ মেনে বাঙালি দেবী দুর্গার রূপটা সাজে রাখতে হবে। আমি সেই ভাবে কাপড়ের কালার কম্বিনেশন করে দুর্গার পোশাক বানাই, তা যেন পুরাণকে বিকৃত না করে। এমনকি দুর্গার যে চুল পরেছিলাম আমি, সেটাও কুমোরটুলি থেকে আনা। মাটির প্রতিমার চুলই কিন্তু আমরা আনতে গেছিলাম কুমোরটুলিতে। সেটাই সেট করা হল আমার মাথায়, কোনও ফ্যাশনেবেল উইগ নয়। 

দ্য ওয়াল: এত ভারী পোশাক, চুল-সহ দুর্গার দশটা হাত কীভাবে সামলালেন? 

সংযুক্তা: সে আর এক গল্প। প্রথম দিকে তো কুমোরটুলি থেকে মাটির হাত আনা হত। আটটা মাটির হাত আর আমার নিজের হাত নিয়ে দশটা হাত। ওই আটটা হাত আমার পিঠে বেঁধে দেওয়া হত। একেই ভারী কস্টিউম, গয়না, মুকুট তার ওপর মাটির অতগুলো হাত নিয়ে মেক আপ রুম থেকে ফ্লোরে আসতে হত। তারপর যুদ্ধের দৃশ্য করতে হত। একবার তো আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েই গেলাম। তার পরে ঠিক হল মাটির হাত একটা স্ট্যান্ডে থাকবে তার সামনে আমি নাচব। সে দেখলাম আমি নাচছি পেছনের হাতগুলো তো নড়ছে না। তখন পরিচালককে বললাম হাতগুলো নিয়েই আমি নাচব। পরের দিকে ফাইবারের হাত করা হয়েছিল। তখন তো এত গ্রাফিক্স উন্নতি হয়নি। কিন্তু কুমোরটুলি থেকে প্রতিমার চুল, হাত আনায় আমাকে হয়তো আজও এত দেবী-দেবী দেখতে লাগে দর্শকদের। 

No photo description available.

দ্য ওয়াল: আপনার মহিষাসুর বধের দৃশ্য তো আইকনিক? ওই সময়ে সবচেয়ে টিআরপি দেওয়া দৃশ্য কীভাবে করেছিলেন? 

সংযুক্তা: প্রথম দিকে দুর্গা ও অসুরের লড়াই পরিচালক করেছিলেন নাচের মাধ্যমে। আমরা তো আগেই ভরতনাট্যমে এসব দেবী মুদ্রা শিখেছি। কিন্তু দেখলাম নেচে-নেচে দুর্গা অসুর লড়াই ভাল লাগছে না, দর্শকের ভাল লাগবেনা। তখন সেটা পরিচালক কল্যাণ ঘোষকে বললাম। তখন টলিউড সিনেমার ফাইটিং মাস্টার শান্তনু পাল এলেন। ওঁর থেকে মার্শাল আর্টসও শিখেছিলাম। ফাইটিং দৃশ্য যুদ্ধের দৃশ্য কিন্তু এভাবে করার জন্যই এতটা বাস্তব সিনেম্যাটিক লেগেছে মানুষের। আর যতই দর্শক ভাবুক মহিষাসুরকে ত্রিশুল দিয়ে বধ করছি আমি, ফাইটিং দৃশ্যে দুজনের যাতে না আঘাত লাগে সেই ভাবে তরোয়াল, ত্রিশূল সন্তর্পণে চালাতে হতো। যাঁরা অসুর করেছিলেন তাঁরা আমার পিতৃসম সব মানুষ। মঞ্চ ও থিয়েটারের ব্যক্তিত্ব। ওঁদের সঙ্গে আমায় যাতে গুরুগম্ভীর দুর্গার ভূমিকায় মানায়, সেটা পরিচালক করিয়ে নিয়েছিলেন আমাকে দিয়ে।

দ্য ওয়াল: দুর্গা হয়ে ওঠার জন্য আপনি নাকি শ্যুটিংয়ের সময়ে হবিষ্যি খেতেন? 

সংযুক্তা: মহিষাসুরমর্দিনী তো একটা শক্তির কনসেপ্ট। সেই আধ্যাত্মিক রোল করার জন্য নিজের মনকে পরিশুদ্ধ করা খুব জরুরি। ওই সময়ে লেখা পড়তাম, আকাশবাণীতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, পঙ্কজকুমার মল্লিকরা কিভাবে পুজোর মতো করে মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠান করেন। সেটা আমায় খুব প্রভাবিত করেছিল। শ্যুটিংয়ের আগে থেকেই হবিষ্যি খেতাম আমি। এমনকি দূরদর্শনে শ্যুটিং করছি, লাঞ্চে স্টুডিওর খাবার খেতাম না। আমি আর আমার মা লাঞ্চবক্সে করে হবিষ্যি নিয়ে গিয়ে সেটাই খেতাম। আর এখনও যেসব শো বিদেশে করি, সেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মা দুর্গা, মা কালীর রোল আমায় করতে হয়। এখনও আমি নিরামিষ খেয়েই পারফর্ম করি। মেডিটেশন সেভাবে কিছু করিনি আমি। আমার কাজটাকেই আজও মেডিটেশন মনে করি। আর পুরাণের বইগুলো পড়ে তার গভীরে দেবী মাহাত্ম্য, ইতিহাস এগুলো জানতাম। ভরতনাট্যম যেহেতু আগেই শিখেছি, পারফর্ম করেছি, তাই দুর্গার বিভিন্ন রূপ সম্বন্ধে ধারণা তো ছিলই। 

দ্য ওয়াল: এখনকার চ্যানেলে চ্যানেলে মহালয়ার অনুষ্ঠানগুলো দেখেন? কেমন লাগে? 

সংযুক্তা: হ্যাঁ দেখি তো। টরেন্টোতে বসে ইউটিউবে দেখি। খোলা মনেই বলছি কতগুলো দরকারি কথা। যা হয়তো এত দিন বলার সুযোগ পাইনি। আমার কিন্তু এখনকার নায়িকাদের অভিনয় ভালই লাগে। যেমন মিমি চক্রবর্তী দেখলাম এবার দুর্গা সেজেছেন। তবে সেখানে মনে হল পোশাক যাঁরা বানিয়েছেন ঠিকঠাক করেননি। মিমির প্রথম কাজ 'গানের ওপারে' তো আমার খুব প্রিয়। শ্রাবন্তীকেও দেখলাম, ভাল নায়িকা। কিন্তু দুর্গা সাজিয়েছে যেন গয়নায় ঢেকে গেছে। গয়না তোমার সৌন্দর্য বাড়াবে তোমায় ঢেকে দেবে তা তো নয়। দুর্গা সাজানোতেই ভুল থেকে যাচ্ছে।

No photo description available.

এখন যে মহিষাসুরমর্দিনী গুলো দেখি আমার অনেক ঘাটতি চোখে পড়ে। প্রথমত, পোশাক। দুর্গাকে দুর্গার মতোই সাজাতে হবে। দুর্গাকে উর্বশীর পোশাক পরালে তাকে তো দুর্গা মনে হবে না দর্শকের। এখনকার পোশাকগুলো পুরাণ মেনে করা হচ্ছে না। দেবী রূপ বিকৃত করা হচ্ছে। পোশাক একটা বড় ব্যাপার, যেটা অনেকটা চরিত্রটার গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলে। দ্বিতীয়ত, চিত্রনাট্য। থিম পুজোর মতো এখনকার থিম মহালয়া। মহিষাসুরের শিংটাই মহিষের মতো লাগছে না। এক্সপেরিমেন্টাল ফ্যাশন প্যারেড হয়ে যাচ্ছে। যতই থিমের প্যান্ডেল, থিমের প্রতিমা আমরা দেখি কিন্তু মাথা নুইয়ে প্রণাম করে আত্মতৃপ্তি আমাদের হয় টানা টানা চোখের চিরাচরিত মাতৃমূর্তির কাছেই। দুর্গা ঠাকুর বললে যে রূপটা, যে মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেটা তো রাখতে হবে। রম্ভা-উবর্শী রূপে দুর্গাকে সাজালে তো হবে না। আর মহিষাসুরমর্দিনীতে মানুষ কিন্তু দুর্গার মহিষাসুর বধই দেখতে চায়। সেটাই মহালয়ার দিনে সকলের চাওয়া। কিন্তু এখনকার অনুষ্ঠানগুলোতে দেখি অন্য সব গল্প মহালয়াতে যুক্ত করা হচ্ছে। এগুলো কতটা পুরাণ মেনে ঠিকঠাক গল্প করছেন চিত্রনাট্যকাররা, তা ওঁরাই বলতে পারবেন। আমার মনে হয় বহুক্ষেত্রে বিকৃত করা হচ্ছে ইতিহাস, পৌরাণিক ঘটনা।

আরও একটা কথা আমার মনে হয়, অনেক ভাল ভাল অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এই অনুষ্ঠানে কাজ করেন। তাঁরা কেন বিকৃত বা স্বরচিত চিত্রনাট্যের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করছেন? অনেকেরই অন্য কাজ দেখেছি যথেষ্ট ভাল। কিন্তু মহালয়ার ভুল চিত্রনাট্যে তাঁদের অভিনয় লঘু হয়ে যাচ্ছে। আর পরবর্তী প্রজন্মকে আমরা কী দিয়ে যাচ্ছি? এই প্রতিবাদটা অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরই করতে হবে। ভুল জিনিসে অভিনয় করব না। সেই সঙ্গে না বলে পারছি না, মহালয়ার অনুষ্ঠান কোনও স্কুলের নাটকের কম্পিটিশন নয় যে সিরিয়ালের সব নায়িকাদের যোগদান করতেই হবে। আমার সময়ে দুর্গার অনেকগুলো রূপ করেছিল দূরদর্শন। তখন সেই সেই রূপ করতে অন্য অভিনেত্রীদের বলা হয়। কিন্তু ছোট রোলে তাঁরা কেউ করতে চাননি। আমায় পরিচালক বললেন “কে করবে বাকি রূপগুলো?” আমি বলেছিলাম “আমিই করব।“ তার পরে আমি কালী, চামুণ্ডা—সব রূপ গুলো সেজেছিলাম। সেটা করে দেখলাম দর্শকরা দারুণ ভাবে নিল। এর কারণ আমার মনে হয়, একই মুখ সব কটা রূপ সাজলে দর্শক বেশি রিলেট করতে পারে। শক্তির উৎস তো একটাই। দেবীর রূপ পরিবর্তন হলেও মুখটা একই থাকলে দেবীর মাহাত্ম্য বেশি থাকে।

আজকাল দেখি কতজনকে, একটা মহিষাসুরমর্দিনীতে আলাদা মানুষ দুর্গা, কালী, চণ্ডী, শাকম্ভরী, তারা, বগলা সাজছেন। পোশাকও খুব ভুল দেখানো হচ্ছে। আমাদের সময়ে এত গ্রাফিক্স, এত বাজেট কিছুই ছিল না। আজকাল ভাল অভিনেত্রীরা কেন কম্প্রোমাইজ করছেন খারাপ চিত্রনাট্যে! বিদেশে থেকে আমি জানি, এই বাংলা অনুষ্ঠান বিদেশিরাও দেখেন। তাঁদের কাছেও ভুল বার্তা যাচ্ছে। মূল ভাবনা দুর্গার মহিষাসুর বধ, এটাই দেখানো হোক। অন্য কাহিনি দর্শক দেখতে চায় না বিশেষ দিনে। বেশি ভাল করতে গিয়ে হয়তো তাই অনুষ্ঠানের মান পড়ে যাচ্ছে। পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক তথ্য দেখানো আমাদের কর্তব্য। 

দ্য ওয়াল: আরও যাঁরা দুর্গা করে বেশ বিখ্যাত, হেমা মালিনী, দেবশ্রী রায়, ইন্দ্রাণী হালদার—এঁদের সঙ্গে কখনও দেখা হয়েছে? 

সংযুক্তা: না কখনও দেখা হয়নি। আমেরিকা চলে এলাম তো আমি। এখানেও দেখা হয়নি। এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ছে। বিআর চোপড়া যখন 'মা শক্তি' সিরিয়াল করেন তখন নায়িকা দুর্গার রোলে আমাকে ভেবেছিলেন। উনি বাঙালি দুর্গার মুখ খুঁজছিলেন। রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বি আর চোপড়াকে আমার নাম বলেন। কিন্তু তখন আমি আমেরিকায় চলে এসেছি বিয়ের পর। আমার সঙ্গে ওঁরা যোগাযোগ করতে পারেননি। পরে সামনাসামনি একদিন রূপাদির সঙ্গে দেখা হয়, আমি তখন এ ঘটনা রূপাদির থেকে জানতে পারি। রূপাদি বলেছিলেন “সংযুক্তা, 'মা শক্তি'র জন্য তখন তোমায় কত খুঁজেছি কোনও সন্ধান পাইনি।” তখন তো সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ছিল না। আমি জানলে নিশ্চয়ই কাজ করতাম মহাভারত নির্মাতা বি আর চোপড়ার সঙ্গে।

No photo description available.

দ্য ওয়াল: দূরদর্শনে তখন দুর্গা করে এত জনপ্রিয়তা, ফিল্মের অফার আসেনি? 

সংযুক্তা: প্রচুর এসেছিল। অনেক নায়িকা হওয়ার অফার পেয়েছিলাম। হরনাথ চক্রবর্তী, স্বপন সাহা, আরও কয়েকজন নামী বাণিজ্যিক ছবির পরিচালক আমায় তাঁদের ছবির অফার দেন। হরনাথ চক্রবর্তীর ফিল্ম তো যেদিন ফাইনাল সাইন করার কথা, সেদিন আর যাইনি। কারণ আমার মনে হয়েছিল আমার যা ইমেজ, আমার যা নাচ নিয়ে ঘরানা, সেগুলো হার্ডকোর কর্মাশিয়াল ছবির সঙ্গে যাবে না। তাতে আমার ক্লাসিক্যাল ডান্সের পড়াশোনায় ক্ষতি হবে। ফিল্মের স্টোরিলাইনগুলো ভালো লাগেনি। আর তখন কলেজ পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করছি ইংরেজি সাহিত্যে। আমি কোনও দিনই নামের পেছনে ছুটিনি। খ্যাতি পেতে ফিল্ম করতে হবে, সেটাও মনে হয়নি কখনও। আর তখন গতানুগতিক ছবির যুগ ছিল। এখন বাংলা ছবির ইন্ডাস্ট্রিতে যতটা পরীক্ষামূলক কাজ হচ্ছে তখন তো হতো না। ঐ বাণিজ্যিক ঘরানা আমার সঙ্গে যেত না। 

দ্য ওয়াল: ঋতুপর্ণ ঘোষ অফার দিলে করতেন? 

সংযুক্তা: উনিও তখন ছবি করছেন কিন্তু আমাকে কখনও ডাকেননি। ওঁর ছবির চিত্রনাট্য তো আমার প্রিয়। সুযোগ পেলে করার ইচ্ছে ছিল। হয়তো ওই ধাঁচের ছবি আমার সঙ্গে যেত। তবে ফিল্ম করিনি বলে কোনও আক্ষেপ নেই। 

দ্য ওয়াল: কোন অভিনেত্রীকে দুর্গা রূপে ভালো লাগে? দেখতে চাও? 

সংযুক্তা: মীনাক্ষি শেষাদ্রি। এত দুর্দান্ত উনি ভরতনাট্যমে! উনি তো এখন আমাদের এখানেই থাকেন। আর জয়া প্রদা, ওরকম টানা টানা চোখ। আমি তো আমার সময়কার নায়িকাদের কথাই বলব। এখনকার সবার নাম জানি না। তবে অনেকেই ভাল করছেন বাংলাতেও। যেমন দিতিপ্রিয়ার রাসমণি অভিনয় চমৎকার লেগেছে। কিন্তু এরা সবাই বিকৃত ভুল চিত্রনাট্যের শিকার। আর রোজকার সিরিয়ালের দেখা মুখের চেয়ে দর্শক মহালয়ার দিনে বিশেষ কারও মুখ দেখতে চায় বলেই মনে হয়।

দ্য ওয়াল: দুর্গারূপে দেখেই কি কর্তার সঙ্গে পরিচয় হয়? 

সংযুক্তা: না না। উনি ১৯৯৪ সালের আগেই আমেরিকা চলে গেছেন। ওঁর তো আমায় দেখার সুযোগ হয়নি। তবে আমার শ্বশুরবাড়ির লোকরা আমার নাচ দেখেই আমায় পছন্দ করেন। আমার স্বামীর নাম ডঃ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। উনি বৈজ্ঞানিক। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োটেকনোলজিতে ডক্টরেট করেছেন। বিদেশে এসে বিদেশের পুজোয় আমায় দুর্গা সেজে পারফর্ম করতে হয়। সেটা ও দেখেছে। ওঁর সাপোর্ট ছাড়া বিদেশে এসে আমি মোহিনীনাট্যমে ডক্টরেট রিসার্চ, নিজের নাচের প্রতিষ্ঠান কিছুই করতে পারতাম না।

No photo description available.

দ্য ওয়াল: আপনাদের ছেলে কী বলে মায়ের দুর্গা রূপে এত ফ্যান ফলোয়ারস দেখে? 

সংযুক্তা: ওরও ক্রিয়েটিভ ফিল্ডে মন আছে। ও তো ইউটিউবে আমার নাচগুলো দেখে। যখন আজও এত প্রশংসা পাই, ফ্যানদের রিপ্লাই দিই, আমার ছেলে খুব অবাক হয়ে যায়।

দ্য ওয়াল: মা দুর্গা ভেবে কেউ প্রণাম করলে সেটা কেমন লাগে? 

সংযুক্তা: বয়স্ক মানুষরা যখন আমায় এসে প্রণাম করেন খুব অস্বস্তি লাগে। ওঁরা বলেন তোমার ওই দুর্গা রূপটাকে প্রণাম করছি। কদিন আগে আমাদের এই কানাডায় আমার একটা শো ছিল। পৌরাণিক দুর্গা আর 'আমার দুর্গা'র ওপর। একজন চার পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ে, সে আমার ছাত্রী, আমায় এসে বলছে 'আমি তোমার দুর্গা নাচ ইউটিউবে দেখেছি তোমার তিনটে চোখ আর দশটা হাত কই?' আমি ওকে বললাম 'সব লুকিয়ে রেখেছি একটু পরেই নাচের সময় দেখতে পাবি।‘ ও তো বাচ্চা, তবু ভাবছে আমি দুর্গা। এগুলোই প্রাপ্তি।

দ্য ওয়াল: আবার মহালয়া করতে চান? কেউ অফার দিয়েছে? 

সংযুক্তা: না এখন কেউ অফার দেয়নি। বিদেশে থাকি সেটা একটা কারণ। আমার নৃত্য প্রতিষ্ঠান 'সৌগন্ধিকম' বিদেশে এবং কলকাতায় দুজায়গাতেই আছে। প্রতি বছরই একবার করে কলকাতা যাই। বিদেশে বাংলা সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দিতে পারছি, আবার অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে যে কোনও প্রান্তের ছেলেমেয়েদের শেখাতে পারছি, এটাই করে যেতে চাই। আর আমার ডক্টরেটের বিষয় ছেলেদের নাচে মোহিনীনাট্যম। পুরুষরাও আসুক নাচে, এটাই চাই। বিদেশে আমার প্রতিষ্ঠানে বহু পুরুষ নৃত্য শিক্ষক আছেন আমার সহযোগী হিসেবে। তবে মহালয়া অনুষ্ঠানে দুর্গা আমি আবারও হতে চাই। এখন দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে ভালো করার। কামব্যাক করলে দর্শকদের প্রত্যাশা যেন রাখতে পারি।

কিন্তু আমার দুটো শর্ত মিললেই আবার দুর্গা করব টিভিতে। এক, চিত্রনাট্য। সঠিক পৌরাণিক কাহিনিতেই আমি কাজ করব। নইলে দর্শকদের ঠকানো হবে। আর দুই, পোশাক। পুরাণ মতেই দেবী দুর্গার পোশাক হতে হবে। দূরদর্শনের দুর্গা রূপে মানুষ আমায় মনে রেখেছেন সেটা আমার একার জন্য নয়। স্টোরিলাইন ভাল ছিল। নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ি, পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, হৈমন্তী শুক্লা, ইন্দ্রাণী সেন—সকলে যুক্ত ছিলেন। এটা শুধু আমার কৃতিত্ব নয়, দূরদর্শনের কৃতিত্ব। আমার দর্শকদের বলি, সবাই ভাল থাকুন, ধরিত্রী মাতা সুস্থ হয়ে উঠুন। সকলকে শুভ শারদীয়া।


```