‘ঈশ্বর ঘুঁটি চালেন না’ মতান্তরে ‘ঈশ্বর পাশা খেলেন না’- পৃথিবী সহ মহাজাগতিক রহস্যের ব্যাখ্যায় আলবার্ট আইনস্টাইনের এই উক্তি প্রবাদে পরিণত হয়ে গিয়েছে।

বৈজ্ঞানিক তত্ত্বপ্রমাণের ভিত্তিতে না হলেও ঈশ্বরের অস্তিত্ব আদৌ আছে কি? তা নিয়েই একটি বিতর্ক হয়ে গেল সম্প্রতি।
শেষ আপডেট: 24 December 2025 12:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘ঈশ্বর ঘুঁটি চালেন না’ মতান্তরে ‘ঈশ্বর পাশা খেলেন না’- পৃথিবী সহ মহাজাগতিক রহস্যের ব্যাখ্যায় আলবার্ট আইনস্টাইনের এই উক্তি প্রবাদে পরিণত হয়ে গিয়েছে। নিজেকে ‘ধর্মীয় অবিশ্বাসী’ বলে বর্ণনা করা আইনস্টাইনের আরও কঠোর উত্তরসূরি স্টিফেন হকিং ‘ঈশ্বরকণা’ নিয়ে জানিয়ে দেন তাঁর মতামত। এত বিশাল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বপ্রমাণের ভিত্তিতে না হলেও ঈশ্বরের অস্তিত্ব আদৌ আছে কি? তা নিয়েই একটি বিতর্ক হয়ে গেল সম্প্রতি। বিতর্কের শীর্ষক ছিল ‘ডাজ গড এক্সিস্ট’? ঈশ্বর আছেন কি?
প্রখ্যাত গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ও কবি জাভেদ আখতার এবং ইসলাম ধর্ম বিশেষজ্ঞ মুফতি শামাইল নদবির মধ্যে সাম্প্রতিক এই বিতর্ককে ঘিরে দেশজুড়ে প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা গিয়েছে। লাল্লনটপ ও মুফতির সম্মিলিত ইউটিউব চ্যানেলে এই বিতর্কসভার ভিডিওর দর্শক সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, এই বিতর্ক-আলোচনা নিয়ে বিদ্বজ্জন, সুশীল সমাজ থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সুগভীর চর্চা চলছে। দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বিতর্কটি হয়েছিল গত ২০ ডিসেম্বর।
জাভেদ আখতার ও মুফতি শামাইল নদবি হলেন দুই বিপরীত মেরুর ব্যক্তিত্ব। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেন। কিন্তু, দুজনেরই শিকড় উত্তর ভারতীয় মুসলিম ঘরানায়। মুফতি শামাইল হলেন লখনউয়ে ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি ধর্মপ্রবক্তা দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার একজন মুফতি। অন্যদিকে, জাভেদ আখতার এক বংশপরম্পরায় ইসলামি ধর্মবিশ্বাসী পরিবারের সন্তান।
জাভেদের প্রপিতামহ ফাজি-ই-হক খৈরাবাদী ছিলেন একজন ধর্মীয় বিদ্বজ্জন ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। যিনি আন্দামানে ব্রিটিশ সৈন্যের হাতে বন্দিদশায় মারা গিয়েছিলেন। যদিও জাভেদ নিজে বড় হয়েছেন প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, বাবা জান নিসার আখতারের শিক্ষায়।
এই লেখক সংগঠনের শিকড় ইসলামের পায়ে বাঁধা ছিল না। ১৯৩০-৪০ সালের মধ্যে ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলার কাজ করত এই আন্দোলন, বিশেষত আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীভূত। এই সংগঠনের একাংশ পাকিস্তান গঠনের পক্ষে ছিল এবং অনেকেই দেশভাগের সময় পাকিস্তানে পাকাপাকিভাবে চলে যান। যদিও অনেকেই এদেশে থেকে কাজ চালিয়ে যান, যাঁদের অনেকে আবার স্বাধীন ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বহু প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ভারতীয় মুসলিমদের কল্যাণ লুকিয়ে রয়েছে বাম রাজনীতির সঙ্গে। আর এই বিশ্বাস অন্তঃস্থলে গেঁথে নিয়েছিলেন জাভেদ আখতার। যদিও তিনি কখনই মূল স্রোতের ভারতীয় কমিউনিজমের সঙ্গে যুক্ত হননি।
বিতর্ক চলাকালীন আখতার গোটা সময়টাই মুফতি শামাইল নদবি এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুফতি ইয়াসির ওয়াজিদির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। উল্টোদিকে তাঁরাও জাভেদ আখতারের প্রতি অত্যন্ত বিনীত-নম্র ব্যবহার করেন। বিতর্কের শেষে আখতার হেসে বলেন, এখন আমি মুফতি ও বড়ে মুফতির সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করতে যাচ্ছি।
কিন্তু, এই বিতর্ক দেশে নব্য মুসলিম ও দেওবন্দি মুসলিমদের মধ্যে একটি নয়া চেতনা তৈরি করে দিয়েছে। বিশেষত বর্তমানে ভারত সহ গোটা বিশ্বে যখন ইসলামোফোবিয়া চলছে, তখন এই বিতর্কের বিষয়বস্তু অত্যন্ত আধুনিক দৃষ্টিকোণের ছাপ রেখেছে। অন্যদিকে, হিন্দুত্ববাদীরা এ ধরনের কাজের কঠোর সমালোচনায় নামলেও প্রগতিশীল হিন্দুদের মধ্যেও এই বিতর্ক নতুন ভাবনার চিহ্ন রেখেছে।