ফসলের পচন আটকাতে যে কৌশলের উদ্ভব, তা-ই কালে কালান্তরে স্বতন্ত্র এক মিষ্টান্নের জন্ম দেয়। রাজনগরের মোরব্বার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বাইরের রাজ্যে। রাজ্য ছাড়িয়ে ভিনদেশে।
.jpeg.webp)
মোরব্বা
শেষ আপডেট: 25 May 2025 14:23
বীরভূমের (Birbhum) সদর শহর সিউড়ি (Suri)। কাছেই রাজনগর (Rajnagar)। যে সময়ের কথা বলছি তখন রাজনগরই ছিল বীরভূম ও সংলগ্ন অঞ্চলের অন্যতম ভরকেন্দ্র, রাজধানীও বটে। কোন সময়ের কথা? তখন রাঢ়বঙ্গ পাল, সেন, বীররাজবংশ পেরিয়ে মুসলিম রাজত্বের অধীন। তক্তে বসেছেন নবাব বাদিওজ্জামান (রাজত্বকাল: ১৭১৮-১৭৫২)। পাঠান বংশের সন্তান। মুর্শিদকুলি খাঁয়ের থেকে ‘রাজা’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন তিনি।
রাজধানী রাজনগর লাল মাটির দেশ, ঊষরভূমি। তবু নবাব বাদিওজ্জামান এই শুষ্কতার ছাপ তাঁর ব্যক্তিচরিত্রে পড়তে দেননি। তিনি মনেপ্রাণে ছিলেন রসিক, শৌখিন রুচির মানুষ। রুক্ষ কাঁকড়ের রাজনগরকে শুধু ফুলে সাজাননি, ফলেও ভরাতে চেয়েছিলেন। আর তাই দেশবিদেশ থেকে হরেক কিসিমের মরশুমি গাছের চারা পাথুরে জমির বুকে লাগানো শুরু করেন। ফুল, ফল আর সব্জিতে ভরে ওঠে রাজনগর। প্রজাদের চাহিদা মেটে। রফতানিও শুরু হয়। কিন্তু করিৎকর্মা মালি, চাষিদের হাতের জাদুতে ফলন এত বেড়ে যায় যে, বাইরে পাঠিয়েও রেহাই মেলে না। পচতে শুরু করে, ধামাভরা সব্জিপাতি ফেলে দিতে হয়।
এই পরিস্থিতিতে এক মোক্ষম উপায় বের করেন বাদিওজ্জামান। বাইরে থেকে তলব করা হয় পাঠান হালুইকর। তাকে নির্দেশ দেন মোরব্বা (Morobba) তৈরির। চালকুমড়ো দিয়ে শুরু। তারপর বেল, পেঁপে নিয়ে চলে পরীক্ষানিরীক্ষা। মিঠে ফলের মোরব্বা বানানোর কৃৎকৌশল সাফল্য পেলে অন্যান্য মরশুমি সবজির দিকে ঝুঁকে পড়েন উৎসাহী নবাব। পাঠান কারিগরের কাছে আসতে থাকে আদেশ: আম থেকে আমলকী, পাতিলেবু থেকে হরীতকী—হাতের কাছে পাচ্ছ, নষ্ট হতে পারে বলে মনে করছ, সেই সমস্ত ফল আর সবজি কেটেকুটে চিনির রসের ‘ভিয়ানে’ চুবিয়ে রাখো। তারপর ধাপে ধাপে বানিয়ে ফেল মোরব্বা।

ফসলের পচন আটকাতে যে কৌশলের উদ্ভব, তা-ই কালে কালান্তরে স্বতন্ত্র এক মিষ্টান্নের জন্ম দেয়। রাজনগরের মোরব্বার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বাইরের রাজ্যে। রাজ্য ছাড়িয়ে ভিনদেশে।
এরপর ইতিহাসের পটপরিবর্তনের সূচনা। রাজনগরের গৌরব অস্তমিত। ব্রিটিশ আমলে সদর শহরের তকমা পায় সিউড়ি। আর প্রাচীন রাজধানী রাজনগরের যা কিছু ভাল, শ্লাঘনীয় ঐতিহ্য, সে সবকিছু সরে আসতে থাকে সিউড়ির দিকে। ‘মোরব্বা-সংস্কৃতি’ও তার ব্যতিক্রম নয়। একে ঘিরে তৈরি হয় একটি স্বতন্ত্র বলয়। ক্রেতা, বিক্রেতা, জোগানদার, হালুইকর ও সরবরাহকারীর এক অটুট সমন্বয়। নাবাগত পশ্চিমি ব্রিটিশ প্রশাসকদের সঙ্গে মেলবন্ধন মোরব্বার উৎপাদন ও বিপণনকে এক সাংগঠনিক ভিত্তি ও আধুনিকতা দান করে।

সেই থেকে সিউড়ির মোরব্বার রমরমা শুরু। মজার বিষয়, তখন এই মিষ্টান্নের প্রধান কাঁচামাল অর্থাৎ, সবজি ও ফসল রাজনগর থেকে আসত। সংগ্রহ করতেন স্থানীয় বাসিন্দা, প্রধানত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজন। আর এভাবেই এক সময়ের মোরব্বার পীঠস্থান ধীরে ধীরে শুধুমাত্র সরবরাহকারী কেন্দ্রে পরিণত হয়।
ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, আরবি শব্দ ‘মুরাববা’ থেকে এসেছে ‘মোরব্বা’। পাঠান শাসক বাদিওজ্জামান আজন্ম এর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের একাধিক দেশে অনেক আগে থেকেই এই মিষ্টির প্রচলন দেখা যায়। তবে আদি প্রণেতার কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয়, সেটা পর্তুগিজদের প্রাপ্য। সারা দুনিয়াকে মোরব্বা বানানোর কৌশল পর্তুগিজরাই শিখিয়েছিল। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। বিনিময়ে এদেশ থেকে ছানা ও দুধের মিষ্টি বানানোর ফর্মুলা শিখে নেয় তারা।

অন্য একটি মতে, পর্তুগিজ নয়, রাজনগরেরই বাসিন্দা জনৈক হরিপ্রসাদ দে নামে এক বাঙালি বঙ্গদেশে মোরব্বার আসল জন্মদাতা। তিনি কাজের সূত্রে একসময় দিল্লি গেছিলেন। সেখানেই হিন্দুস্থানি মিষ্টি ‘পেঠা'র সঙ্গে পরিচয়৷ দিল্লিতে থাকাকালীন জেনে নেন পেঠা তৈরির অন্ধিসন্ধি। তারপর ঘরে ফিরে কারিগরদের প্রস্তুতির নিয়ম বাতলে দেন। তবে থেকে প্রথমে রাজনগর, পরে বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে মোরব্বার সুখ্যাতি।
মোরব্বার আসল জাদুমন্ত্র লুকিয়ে আছে দুটি উপকরণে: এক, ফল বা সবজি। দুই, সুবাসিত চিনির রস। ফলমূল যত সতেজ তত খোলতাই মোরব্বার স্বাদ। মরশুমি হলে তো কথাই নেই৷ আর চিনির রস শুনতে ‘অনুপান’ লাগলেও এর মাহাত্ম্যও কম নয়৷ কারণ, ফল বা সবজি ভেদে সিরার ঘনত্ব কমে-বাড়ে। তিতকুটে উচ্ছের জন্য যে ধরনের সিরাপ লাগবে, জংলি স্বাদের শতমূলীর জন্য তেমনটা নয়৷ আবার খাট্টা আমড়া আর ব্রহ্মতালু জ্বালা ধরানো কাঁচা লঙ্কাও একই রকমের গাঢ় রসে ডোবানো যাবে না। অর্থাৎ, কারিগরদের যুক্তি-বুদ্ধি, কাণ্ডজ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতাই বাহুল্যবর্জিত মিষ্টান্ন মোরব্বার আসল রহস্য। এতে সবজি বা ফলের খাদ্যগুণ, পুষ্টিরস বজায় থাকে। অথচ স্বাদ যায় বদলে। অতিরিক্ত কোনও মশলা বা রাসায়নিক মেশানো হয় না। যে কারণে বেলের মোরব্বা কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে, আমলকীর মোরব্বা মুখের রুচি ফেরাতে, হরীতকীর মোরব্বা হজমিকারক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

সিউড়ির বাসস্ট্যান্ডের কাছেই রয়েছে প্রাচীন দোকান ‘মোরব্বা’। এ ছাড়া ‘দাদুভাই সুইটস’, ‘জয়গুরু শ্রীগুরু সুইটসে'ও উন্নত মানের মোরব্বা বিক্রি হয়। দাম সংশ্লিষ্ট ফলের উপর নির্ভর করে৷ সাধারণভাবে চালকুমড়োর মোরব্বা কেজি প্রতি ১৬০ টাকা, বেল, পেঁপে, গাজর, পটল ২০০ টাকা এবং আম, আদা, শতমূলীর মোরব্বা ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়।
‘কাশী’ নামে একটি ছড়া লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যা ‘ছড়ার ছবি’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। সেখানে যোগীনদাদার খুড়ির নেশা ও পেশা ছিল মোরব্বা তৈরি। কীভাবে মোরব্বা বানাতে গিয়ে চোর ধরা পড়েছিল, তার কথা তো ছড়াতে রয়েইছে। পাশাপাশি অল্পকথায় হলেও এই মিষ্টান্ন পাকের সারসত্যটিও লেখাটিতে তুলে ধরেন রবীন্দ্রনাথ। খুড়ির হাতের জাদুর প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন:
“রসিয়ে নিয়ে চালতা যদি মুখে দিতেন গুঁজি
মনে হত বড়োরকম রসগোল্লাই বুঝি।
কাঁঠাল বিচিত্র মোরব্বা যা বানিয়ে দিতেন তিনি
পিঠে ব'লে পৌষমাসে সবাই নিত কিনি।”