যে জনপদ ছেড়ে তিনি চিরজীবনের মতো চলে এসেছেন, তাকেই প্রণতি জানাতে, স্মৃতিতে অমর রাখতে ছানা আর ক্ষীর দিতে তৈরি মিষ্টির নাম রাখেন কানসাট।

কানসাট
শেষ আপডেট: 17 May 2025 12:52
‘কানসাট’।
কাঁটাতারের এধার-ওধার একই শব্দের দুটো অর্থ। বাংলাদেশের নিরিখে এর তাৎপর্য ভৌগোলিক। ভূগোল বইয়ে লেখা রয়েছে: রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদ ‘কানসাট’। যেখানে রয়েছে ২০টি গ্রাম, ১৬টি ওয়ার্ড।
অন্যদিকে কাঁটাতারের এপারে, মালদহ জেলার মানুষদের কাছে ‘কানসাট’ মানে মিষ্টি। জিভে ঝাল লাগুক না লাগুক এক পিস কানসাট শেষ পাতে না পড়লে খাওটা যেন ঠিক জমল না! স্বাদে অতুলনীয়, রঙে মনকাড়া। ক্ষীর আর ছানার মিশেলে তৈরি কড়াপাকের মিষ্টান্ন। অনেকটা চমচমের আদল। কিন্তু মিষ্টত্বের মাত্রা কিঞ্চিৎ বেশি।
কীভাবে দু’দেশ এক পাতে এল? কোন উপায়ে বাংলাদেশের ভূগোল মিশে গেল মালদহের রসনায়? জানতে হলে স্বাধীনতা-দেশভাগের দিনগুলোয় ফিরে যেতে হবে।
১৯৪৭ সাল। ভারত স্বাধীন হল। আর তারই ফলশ্রুতিতে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে কাতারে কাতারে মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে চলে এল এদেশে। একটু আগেই কানসাট ইউনিয়নের কথা বলছিলাম, তার একটি জেলা শিবগঞ্জ থেকেও বহু মানুষ প্রাণের তাগিদে কাঁটাতার পেরিয়ে নিকটবর্তী মালদহে আসতে শুরু করে। এই শিবগঞ্জেই ছিল প্রচুর মিষ্টির কারিগরদের বাস। নতুন আস্তানা মালদহে এসে তাঁরা নতুন কিছুর বদলে পুরোনো পেশাটিকেই ধরে রাখেন। শহরের দুর্গাবাড়ি, ফুলবাড়ি এলাকায় জমে ওঠে হালুয়াপট্টি মিষ্টির বাজার। রসগোল্লা, লালমোহনের মতো সাবেকি মিষ্টান্নের পাশাপাশি দোকানিরা সুলতানি আমলের প্রভাবপুষ্ট বেশ কিছু স্বতন্ত্র ধারার মিষ্টি, যেমন: ‘টাঁডের খাজা’, ‘রসকদম্ব’, ‘মনোহরা’, ‘মনক্কা’র পসরা সাজিয়ে বসেন। আর সেই সম্ভারে জায়গা করে নেয় এক অদ্ভুত মিষ্টান্ন—সম্পূর্ণ নতুন। আকারে লম্বাটে ছানার টুকরোর উপর শুকনো ক্ষীরের পরত। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই ভেতরে তা কতটা রসস্থ। কামড় দিলেই মুখের আনাচ-কানাচ ভরে উঠবে ছানার রস আর ক্ষীরের সুবাসে।

বাংলাদেশের শিবগঞ্জের প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন ব্যাবসায়ী ছিলেন মহেন্দ্রনাথ সাহা। দেশভাগের সময় অন্যদের মতো তিনিও জন্মভিটে ছেড়ে মালদা চলে আসেন। বাপ-ঠাকুর্দার শেখানো পৈত্রিক ব্যবসাই ধরে রাখেন তিনি। কিন্তু মালদহবাসীকে যে নয়া কিসিমের মিষ্টি উপহার দিতে চেয়েছিলেন তার নাম কী রাখা যায়? চমচমের মতো দেখতে মিষ্টান্নের নামকরণে মহেন্দ্রনাথ বেছে নেন স্বদেশের অনুষঙ্গ। যে জনপদ ছেড়ে তিনি চিরজীবনের মতো চলে এসেছেন, তাকেই প্রণতি জানাতে, স্মৃতিতে অমর রাখতে ছানা আর ক্ষীর দিতে তৈরি মিষ্টির নাম রাখেন ‘কানসাট’। শুধু তাই নয়, দোকানের নামেও জুড়ে দেন এই শব্দ—‘কানসাট সুইটস’। মকদুমপুর বাজারের কাছে ব্যস্ত রাস্তার ধারে এখন স্বমহিমায় বিরাজ করছে এই দোকান। ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে চলেছেন মহেন্দ্রনাথের দুই ছেলে বিজয় ও বিশ্বজিৎ সাহা।
এমনিতে মালদহের অন্যান্য দোকানে এই মিষ্টি তৈরি হলেও ‘অথেন্টিক’ বা খাঁটি কানসাট একমাত্র কানসাট সুইটসেই বানানো হয়। সেই তো ছানা আর ক্ষীরের কাজ। তাহলে কোন রসায়নে নিজেদের আলাদা করে নিতে পেরেছেন? প্রশ্নের জবাবে বিজয়বাবু বলেন, ‘আসলে ক্ষীরের কোয়ালিটির উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। বাজার থেকে কিনি না আমরা। হাট থেকে নিজের হাতে ক্ষীর কিনে নিয়ে আসি। ভাল ক্ষীর ছাড়া ভাল কানসাট বানানো অসম্ভব।‘
এরপরের ধাপে রয়েছে কড়া পাকের ছানা তৈরির কাজ। কানসাট সুইটসে কাঠের আগুনে জ্বাল দেওয়া হয়। আঁচ ঠিকমতো ধরে রাখতে না পারলে ছানার ‘টেক্সচার’ আমূল বদলে যেতে পারে। যা ছাপ ফেলে মিষ্টির গুণমানের উপর। ছানা তৈরি হলে এর উপর ছড়িয়ে দিতে হয় ভাজা ক্ষীর। তারপর এক একটি লম্বাটে ছানার মন্ডকে ক্ষীরের পরতের সঙ্গে মাখিয়ে, মিশিয়ে তৈরি হয় কানসাট।

জেলার তো বটেই, রাজ্যের এমনকী দেশেরও বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই অর্ডার আসে কানসাটের। দোকানের অন্যান্য মিষ্টি (রসগোল্লা, বোঁদে, সরভাজা, রসকদম্ব, সন্দেশ) থাকলেও আসল কদর কানসাটের। জানালেন বিশ্বজিৎবাবু। বিখ্যাত কোনও মানুষ এর ভক্ত? জবাবে ভেসে আসে উত্তর: ‘ইন্দিরা গান্ধি আমাদের দোকানের কানসাটের স্বাদ পেয়েছেন। গনি খান পরিবারে কোনও ভিআইপি অতিথি এলে এখনও কানসাট যায়। গনি সাহেব নিজেও এই মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন।’
দোকানের চাকচিক্যে তেমন মন দেননি বিশ্বজিৎবাবুরা। পরের প্রজন্মের কে বা কারা হাল ধরবে সেই উত্তরও অজানা। কিন্তু তাঁরা থাকুন বা না থাকুন কানসাটের ‘লেগাসি’ রয়ে যাবে। আমের জেলা, রেশমের জেলা মালদহের সংস্কৃতির ইতিহাস ‘কানসাট’ ছাড়া লেখা অসম্ভব। কাঁটাতারের বেড়া দুই বাংলাকে আলাদা করলেও এপারের রসনায় চিরজীবিত ওপারের এক জনপদের নাম। আর এই গৌরব পুরোপুরি মহেন্দ্রনাথবাবুর প্রাপ্য।