আপং ভারতে ফার্মেন্টেশন ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায়, যেখানে উপাদান, প্রকৃতি ও প্রাচীন উপজাতীয় জ্ঞান একসূত্রে গাঁথা (Mishing tribe Assam traditional drink Apong)।

আপং-এর সঙ্গে জুড়ে গেল ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ৩’
শেষ আপডেট: 22 November 2025 20:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের খাদ্যসংস্কৃতি (Indian food culture) শুধু যে বৈচিত্র্যেই সমৃদ্ধ নয়, বরং উপজাতীয় ঐতিহ্যের (Indian tribal tradition) গভীর শিকড়ে গাঁথা। দেশের ৭০০–র বেশি জনজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশই বাস করেন উত্তর–পূর্বে। সেই অঞ্চলেই শুট হয়েছে অ্যামাজন প্রাইমের ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ৩’ (The Family Man 3)।
সিরিজের এক দৃশ্যে দেখা যায় - রুকমা (জয়দীপ আহলাওয়াত) মীরা (নিমরত কৌর)-কে একটি স্থানীয় মদ অফার করছেন। নাম তার ‘আপং’ (Apong Mishing tribe Assam traditional drink)। চালের তৈরি এই পানীয়তে চুমুক দেওয়ার আগে তিনি কয়েক ফোঁটা মাটিতে ছিটিয়ে দেন, আদি ভারতীয় রীতিতে দেব-দেবীদের প্রতি সম্মান জানানো, যেন কোনও অশুভ শক্তি রুষ্ট না হয়।
কিন্তু আপং কেবল মদ নয়, উত্তর–পূর্ব ভারতের উপজাতীয় জনসমাজে এর রয়েছে গভীর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। অসমের মিশিং সম্প্রদায় যেভাবে আপং তৈরি করেন, তা শুধু আতিথেয়তা নয় - তাঁদের সামাজিক ও প্রথাগত জীবনের অপরিহার্য অংশ, জানালেন শেফ অতুল লাহকার যিনি নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া শেফ অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
আপং: চালের তৈরি উত্তর–পূর্বের ঐতিহ্যবাহী মদ
অসমের জনজাতি জীবনে আপং-এর ইতিহাস কিন্তু হাজার বছরের পুরোনো। কৃষিজীবন, রীতি-অনুষ্ঠান, সামাজিক বন্ধন - সবেতেই এর উপস্থিতি সমানভাবে লক্ষণীয়। সময়ের সঙ্গে 'আদি'দের মধ্যেও এর প্রচলন বাড়ে।
আপং মূলত ঘরোয়া এক পানীয়, তাই ভারতের অন্য জায়গায় বাণিজ্যিকভাবে তেমন পাওয়া যায় না। শেফ অতুলের ভাষায়,
“এটি স্থানীয় পরিবেশ, গাছগাছালি, ভেষজ ও মানুষের ঐতিহ্যগত ফার্মেন্টেশন জ্ঞানকে একসঙ্গে জুড়ে রেখেছে।”

কীভাবে তৈরি হয় আপং?
মিশিংরা দুই ধরনের চালভিত্তিক মদ বানান -
প্রথম ধাপ: ‘আপপ পিঠা’ - ইস্ট কেক
আপংয়ের ভিত্তি হল আপপ পিঠা, এক ধরনের ইস্ট কেক। এতে ব্যবহৃত হয় ১৬ থেকে ৩৯ ধরনের ভেষজ, ছাল, ডালপালা, পাতা, যা পরিষ্কার করে তাজা অথবা রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করা হয়।
ভেজানো চাল ও ভেষজ আলাদা আলাদা করে পিষে জল মিশিয়ে ৩×৬ সেমি আকারের ডিম্বাকৃতি কেক বানানো হয়। তারপর এগুলো রোদে শুকোতে দেওয়া হয়। এ থেকেই তৈরি হয় স্বাদ ও গন্ধের নানা ধরনের আপং।
নোগিন–আপং (স্মোকড সংস্করণ)
এটা তৈরি হয় আগুনে ধোঁয়ায় স্যানিটাইজ করা মাটির হাঁড়িতে।

পারো–আপং
এই আপংয়ের বিশেষত্ব, খড় ও তুষ পোড়ানো ছাই।
রন্ধনপ্রণালী:

সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
আপং শুধু মদ নয়, বরং মিশিং ও আদি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। এটি পরিবেশন করা হয়—
তাশুক দিয়ে ছাঁকার প্রথাটিও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রতীক।
সঙ্গে সেরা খাবারের জুটি কী হতে পারে -
গ্রিল করা নদীর মাছ, স্মোকড পর্ক, গ্রিল্ড মাংস, এবং কাঠে পোড়ানো চিকেন। এগুলো আপংয়ের নরম ফার্মেন্টেড স্বাদকে আরও উজ্জ্বল করে।
আপংয়ের দাম
আজ কিছু স্থানীয় প্রস্তুতকারক সীমিতভাবে বোতলজাত আপং বিক্রি করেন। তবে শেফ অতুলের মতে, “এই পানীয়ের সাংস্কৃতিক মালিকানা এখনও সেই জনগোষ্ঠীর কাছেই, যারা শতাব্দি ধরে এই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছেন।” অসমে স্থানীয় প্রস্তুতকারীর কাছ থেকে ১ লিটার আপং পাওয়া যায় ৫০০ টাকায়।
চালের উপর ভিত্তি করে তৈরি এই পানীয় শুধুই মদ নয়, এটি ভারতে শুরু দিকের ফার্মেন্টেশন ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায়, যেখানে উপাদান, প্রকৃতি ও প্রাচীন উপজাতীয় জ্ঞান একসূত্রে গাঁথা।