স্বামী-স্ত্রীর মোহময় রূপ ধরা পড়ে পূর্ণ শশীর আলো পিছলে পড়া রাতে, জঙ্গলের ধারে কাঠের আগুনের আঁচের পাশে বসে, শীতের ওম ভরানো মাধুরীমায়া মাখা হ্রদের ধারে, আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে তারাদের সঙ্গে কথা বলায়।

নতুন প্রজন্মের রাজপুত্ররা পক্ষীরাজ ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে হাতে হাত রেখে পা বাড়াচ্ছে স্বপ্নে দেখা রাজকন্যের সঙ্গে।
শেষ আপডেট: 21 November 2025 15:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মধুচন্দ্রিমা! নবদম্পতিদের কাছে শরীরে শিহরণ জাগানো শব্দ। সুহাগ রাত বা ফুলসজ্জার থেকেও স্বামী-স্ত্রীর মোহময় রূপ ধরা পড়ে পূর্ণ শশীর আলো পিছলে পড়া রাতে, জঙ্গলের ধারে কাঠের আগুনের আঁচের পাশে বসে, শীতের ওম ভরানো মাধুরীমায়া মাখা হ্রদের ধারে, আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে তারাদের সঙ্গে কথা বলায়। আর সে কারণেই অতীতের ‘ডেস্টিনেশন দিপুদা’ শুনলেই নাক কুঁচকে ওঠে নববিবাহিতদের। আর তাই এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে নতুন প্রজন্মের রাজপুত্ররা পক্ষীরাজ ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে হাতে হাত রেখে পা বাড়াচ্ছে স্বপ্নে দেখা রাজকন্যের সঙ্গে।
আধুনিকোত্তর প্রজন্মের মধুচন্দ্রিমা বা হানিমুন ইদানীং দুধরনের ট্রেন্ডে ধরা পড়ছে। প্রথমটি ঝট মাঙ্গনি, পট বিয়ার মতো অতি দ্রুত কোথাও ঘুরে আসা। কারণ, অফিসের ছুটিছাটা, বিয়ের খরচ, কাজের চাপ। একে আজকালকার ভাষায় বলে মিনিমুন। আরেকটি হল- বিগমুন বা পূর্ণ চন্দ্রিমা। বিয়ের বেশ কিছুদিন পরে আটঘাট বেঁধে, বহু পরিকল্পনা করে, শান্ত-নির্জন, শহুরে কোলাহলমুক্ত পরিবেশে দুজনের দুজনকে আবিষ্কার করার নিজের করে পাওয়ার অনুভূতি লাভ।
মিলেনিয়ালস হোক বা জেন জি, এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যে কোনও ভাবেই বেড়ানোর ছুতো খোঁজে। প্রয়োজনে ছুতো বের করে নেয়। সে কারণে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা দুটি ধাপে হানিমুন কাটায়। বিয়ের ঝুটঝামেলা, খরচ, টিকিট, থাকার জায়গা বুকিংয়ের হুজ্জতি মেটানোর চেয়ে হুট করে কোথাও বেরিয়ে পড়া। আর দ্বিতীয়বার বহু ঘেঁটেঘুঁটে স্বপ্নের দেশে পাড়ি দেওয়া। একটি ভ্রমণ সংক্রান্ত প্ল্যাটফর্ম থ্রিলোফিলার রিপোর্ট অনুযায়ী, ছোট পর্যটনের সংখ্যা বছরে প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে। প্রথম বছরটা ভালয় ভালয় কেটে গেলেই চলো যাই দূরদেশে।
এখন সকলেই জানেন আন্তর্জাতিক পর্যটন ব্যবসা দিনদিন সহজ হয়ে যাচ্ছে। তাই দেশের অনেক জায়গার তুলনায় বিদেশ পাড়ি দিলেও তার থেকে কম খরচে হয়ে যাচ্ছে। বিশেষত নবীন প্রজন্মের প্রায় সকলের কাছেই চলে এসেছে পাসপোর্ট। তাই নতুন করে ঝক্কির প্রয়োজন ওঠে না। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতিতে বহু দেশেই এখন সেখানকার এয়ারপোর্টেই পর্যটক ভিসার সুবিধা মিলছে। সে কারণে নবদম্পতিরা এখন তাঁদের প্রেমের কাব্য দেশের সীমানার ওপারেই লিখছেন।
আন্তর্জাতিক হানিমুনের সংখ্যা প্রতিবছর ৪১ শতাংশ করে বাড়ছে। এটাই এখন প্রেমের নতুন ভাষা। তাই অনেকেই যাচ্ছেন বালি দ্বীপে (২১ শতাংশ), তারপরে অবশ্যই স্থান রয়েছে মালদ্বীপের (১৮ শতাংশ)। এছাড়াও থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, দুবাই-আবু ধাবি, তুরস্ক ও শ্রীলঙ্কায় যাওয়া নবদম্পতির সংখ্যা বাড়ছে। দেশীয় পর্যটনস্থলের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ঈশ্বরের নিজের দেশ কেরল (১৮ শতাংশ)। এরপরেই আন্দামান-নিকোবর (১৪ শতাংশ), গোয়া (১৩ শতাংশ) ও রাজস্থান (১২ শতাংশ)। এখানেই শেষ নয়, দেশের নিরিবিলি-নির্জন প্রান্তভূমি মেঘালয়, কুর্গ ও হিমাচল প্রদেশও এই তালিকায় আছে।
এখন বেড়াতে যাওয়া মানেই কেবল হইহুল্লোড়। সারা বছরের ক্লান্তি থেকে মুক্তির একটি বৈজ্ঞানিক উপায়। পর্যটকরা চাইছেন, শুধু ঘড়ি মেপে চরকি পাকের মতো এখান থেকে ওখানে নয়। একটি নিরিবিলি জায়গায়, যেখানে মিলবে সেখানকার স্বাদ-গন্ধ, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, পরম্পরা, খাবার, সবকিছুই নয়া প্রজন্মের চেখে দেখা চাই। বিশেষ করে আর্থিক দিক থেকেও অনেক সুবিধা মিলছে পর্যটনের। যেমন ইএমআই পেমেন্ট অপশন। অথবা কম খরচে বেড়ানোর আরও বিভিন্ন অফার।
এখন দেখা যাচ্ছে, একটি নবদম্পতি দেশে বেড়ানোর জন্য প্রায় ১.০৫ লক্ষ টাকা এবং বিদেশে ঘোরার জন্য ২.৪৫ লক্ষ টাকা খরচ করতে প্রস্তুত। স্পষ্টতই দুজনের রোজগারে, ইএমআই এবং পে লেটার অফারে তাঁরা ঘুরে নিচ্ছেন। আর শোধ দিচ্ছেন একটু একটু করে। এর জন্য ৬৪ শতাংশ নবদম্পতি বেছে নিচ্ছেন প্রাইভেট বিচ ডিনার, সানসেট ক্রুজ, ভিলায় নির্জনে থাকার সুযোগ। এর মধ্যে আয়ুর্বেদিক রিট্রিট এবং মরুভূমির বুকে তাঁবুতে শুয়ে তারা গুনতেও চান অনেকে। সে কারণে বিয়ের আগে কেবলমাত্র ফোনে দাম্পত্য ও প্রেম নিয়ে ফিসফাস নয়, এখনকার হবু দম্পতিরা স্বপ্ন বাঁধছেন- চলো দিলদার চলো, চাঁদ কে পার চলো/ হাম হ্যায় তৈয়ার চলো...।