নেপালের শান্ত পাহাড়ি কোলে দাঁড়িয়ে থাকা 'তাজমহল'—এক রাজার অসমাপ্ত প্রেমের স্মৃতিসৌধ।

‘নেপালের তাজমহল’
শেষ আপডেট: 19 November 2025 23:26
নীল আকাশের নীচে একা একা দাঁড়িয়ে আছে এক পুরনো প্রাসাদ। যেন কেউ শত বছর ধরে অপেক্ষায় আছে কোনও প্রিয় মানুষের। পথিকেরা আজও সেখানে গেলে থমকে দাঁড়ায়। চারপাশের নিস্তব্ধতার ভিতর থেকে যেন ভেসে আসে পুরনো দিনের গল্প। একটা অসমাপ্ত প্রেমের দীর্ঘশ্বাস।
পশ্চিম নেপালের শান্ত পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আচমকাই চোখে পড়ে এক রাজকীয়, ইট-চুনে গাঁথা পুরনো প্রাসাদ। যেন সময়ের ধুলো ঝেড়ে দাঁড়িয়ে আছে নিজের সৌন্দর্য নিয়ে। এটাই রানি মহল, যাকে অনেকে বলেন ‘নেপালের তাজমহল’।

নেপালের পাহাড়ি বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক অপূর্ব প্রেমের সাক্ষী, যার প্রতিটি ইট, প্রতিটি স্তম্ভে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, অনুভূতি আর এক চিরন্তন অপেক্ষার গল্প।
১৮৯৩ সালে জেনারেল খড়্গ শমশের নিজের প্রিয়তমা স্ত্রী তেজ কুমারীর স্মৃতিতে এই মহল তৈরি করেছিলেন। গল্প আছে, স্ত্রীর মৃত্যুর পর শোকে ভেঙে পড়ে তিনি নিজেই এই মহলের নকশা তৈরি করেছিলেন। তাই রানি মহলের প্রতিটি ইট, প্রতিটি খোদাই যেন এক অনন্ত প্রেমের নিদর্শন।

একসময় এই প্রাসাদ জনমানবহীন, ধুলো-ধূসর হয়ে পড়ে ছিল। কারণ, রানি মহলের দিকে যাওয়ার পথটি ছিল খুবই অবহেলিত। পোখরার মোহ ও লুম্বিনির জনপ্রিয়তার মাঝে এই সৌন্দর্য যেন হারিয়েই যাচ্ছিল। কিন্তু সময় পাল্টেছে। আজ পাহাড়ের নীরবতা, কলকল করে বয়ে চলা কালীগণ্ডকীর জল আর চারপাশের মনোরম পরিবেশ মিলিয়ে রানি মহল যেন আবার জেগে উঠেছে নতুন প্রাণে।
মহলটি দেখতে অবিশ্বাস্য সুন্দর। এখানকার ইতিহাস, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর রাজকীয় স্থাপত্য, সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন অপরূপ। মনে হয় সত্যিই এক রাজার প্রেমকথার দৃশ্যপটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আগের তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা এখন আকাশছোঁয়া। শুধু এ বছরেই (২০২৫) প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ ঘুরতে এসেছে রানি মহলে। বিদেশি পর্যটকদের পাশাপাশি দেশীয় ভ্রমণপ্রেমীরাও এখন এই প্রাসাদকে 'বাকেট লিস্টে' রাখেন।

অবশ্য সৌন্দর্য ধরে রাখতে প্রশাসনের দায়ও কম নয়। চুন আর আখরোট কাঠে তৈরি এই প্রাসাদে খুব সহজেই শ্যাওলা জন্মায়। তাই প্রতিদিনই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য আলাদা কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। পুরনো স্থাপত্যের গরিমা অক্ষুণ্ণ রাখতে চলছে নিয়মিত সংস্কারও।
রানি মহল শুধু প্রেমের গল্প নয়, এক রাজকীয় স্থাপত্যের বিস্ময়ও বটে। চারতলা উঁচু এই অট্টালিকায় ইউরোপীয় ও নব্য-ক্লাসিক্যাল স্থাপত্যের মিশেল। সামনে আছে প্রার্থনাকক্ষ, উপরের তলায় বসার ঘর, মাঝের তলায় শয়নকক্ষ। চারপাশে বাগান, জলাশয়, আর নদীর দিকে নেমে যাওয়া সিঁড়ি। সব মিলিয়ে এক অনাবিল রোমান্টিক পরিবেশ।

এক সময় এই পথ দিয়েই হাজার হাজার তীর্থযাত্রী যেতেন মুক্তিনাথ মন্দিরে। তাই প্রাসাদের ভেতরে রয়েছে পুরনো অতিথিশালা, ঘোড়াশালা আর রাজকালের স্মৃতিচিহ্ন। তাই এখন প্রতিদিনই এই ঐতিহাসিক প্রাসাদের আঙিনায় আসে অসংখ্য প্রেমিক-প্রেমিকা।

আজ, একশো বছরের বেশি সময় পরও রানি মহল ঠিক একই সৌন্দর্যে দাঁড়িয়ে আছে। নদীর সুর আর পাহাড়ের সবুজ নীড় তাকে ঘিরে রেখেছে যেন এক অনন্ত নিঃশব্দ আলিঙ্গনে। সময় বদলেছে, পথ বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু প্রাসাদের দেওয়ালে আটকে থাকা সেই ভালবাসা আজও বদলায়নি। যে রাজা একদিন শোকে ভেঙে পড়ে প্রিয় রানির স্মৃতিতে এই প্রাসাদ গড়েছিলেন, তাঁর সেই অশ্রু-ভেজা ইচ্ছে যেন এখনও বাতাসে ভেসে আছে। রানি মহল তাই শুধু একটা মহল নয়। এ এক হৃদয়ের স্মৃতিসৌধ, যেখানে ইতিহাস নিঃশব্দে গল্প বলে আর প্রকৃতি প্রতিদিন সেই গল্পকে আরও একটু সুন্দর করে তোলে।