সম্প্রতি নিলামে ২০ মিনিটের তীব্র দর কষাকষির পর পোট্রেট বিক্রি হল ২৩৬.৪ মিলিয়ন ডলারে—যা আধুনিক শিল্পের ইতিহাসের নিরিখে সর্বোচ্চ!

শিল্পী: গুস্তাভ ক্লিমট
শেষ আপডেট: 20 November 2025 08:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘পথের পাঁচালী’ পড়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘এর থেকে শিক্ষা হয়নি কিছুই, দেখা হয়েছে অনেক যা পূর্বে এমন করে দেখিনি।’ কয়েক দশক পেরিয়ে নবারুণ ভট্টাচার্য বিভূতিভূষণের ওই একই উপন্যাসে আবিষ্কার করেন ‘ক্ষুধার রাজনীতি’! শিল্পের বাইরের নন্দন আর ভেতরের দর্শন—কখনও কখনও স্রেফ ‘তাকানো’র দূরত্বে আশমান-জমিন ফারাক গড়ে দেয়।
প্রতীকবাদী আঁকিয়ে গুস্তাভ ক্লিমটের আঁকা ‘পোর্ট্রেট অফ এলিজাবেথ লেডেরার’-ও হয়তো এমন এক সৃষ্টি। খালি চোখে দুঁদে ছবি বিশারদ থেকে অ্যামেচার সমঝদার—সবাই ধন্য ধন্য করবে। অনেকের নজরেই এটা অস্ট্রিয়ান চিত্রকরের অন্যতম সেরা কাজ… মাস্টারপিস। অথচ আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসকে একবার বুঝে ফেললে প্রতিটি রেখার বাঁক আর রঙের আঁচড় রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মৃতি ঘনিয়ে তোলে! কতজন জানি, হলোকস্টের আগুন যখন ইউরোপকে গিলে খাচ্ছে, তখন এই ছবি এক ইহুদি তরুণীর বেঁচে থাকার ঢাল হয়ে উঠেছিল? সেই দুঃসহ ভার উসকে দিয়েই এতদিন বাদে যা বিক্রি হল রেকর্ড ২ হাজার কোটি টাকায়! নিউ ইয়র্কের সথেবিজের নিলামমঞ্চ যেন আবারও মনে করিয়ে দিল, কখনও কখনও একটা ছবি শুধু ক্যানভাসের প্রকরণ নয়, হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার অস্ত্র।
ছয় ফুট লম্বা এই তৈলচিত্রটি ক্লিমট আঁকেন ১৯১৪ থেকে ১৯১৬—তিন বছরের যত্নে, আদরে। লেডেরার পরিবার ছিল অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে ধনী ইহুদি পরিবারগুলোর একটি। সেই অভিজাত জীবনের রঙিন ছাপ ধরা পড়েছে তুলির প্রতিটি স্ট্রোকে—পূর্ব এশীয় পোশাক, কোলাজের মতো রঙের বহুবর্ণী স্তর আর ক্লিমটের সিগনেচার সোনালি আভা।
বাস্তব যদিও নির্মম। ১৯৩৮ সালে নাৎজিরা অস্ট্রিয়া দখল করলে ইহুদিদের উপর নেমে আসে দুঃস্বপ্ন, তাড়া করে মৃত্যুর আতঙ্ক। সেই অরাজক সময়েই লেডেরার পরিবারের বিশাল আর্ট কালেকশন লুট হয়ে যায়। কেবল কয়েকটি পারিবারিক প্রতিকৃতি বাদে—যেহেতু নাৎজিদের কাছে সেগুলো ‘অতি ইহুদি’, তাই চুরি করার মতো মূল্যবান ছিল না!
এই উপেক্ষাই বাঁচিয়ে দিল ছবির মালিক এলিজাবেথ লেডেরারকে। বাঁচলেন কীভাবে? বলতে গেলে, এক অদ্ভুত ঘটনা এই আশ্চর্য কাহিনির অন্যতম মোচড়! এলিজাবেথ প্রশ্নের সামনে ভড়কে না গিয়ে স্নায়ুর চাপ ধরে রেখে নিজেকে ক্লিমটের ‘মেয়ে’ বলে দাবি করেন। নাৎজি শাসনে ‘ইহুদি নন’ এমন পরিচয় পেলে জীবন বাঁচার সম্ভাবনা কয়েক গুণ বেড়ে যেত। ক্লিমট ইহুদি ছিলেন না। আর সেটাই রক্ষা করে তরুণীকে। এরপর তাঁর ভগ্নীপতি—নাৎজিদের উচ্চপদস্থ আধিকারিক—ব্যবস্থা করে দেন নথির। সেই সরকারি কাগজে লেখা হয়, তিনি ‘অস্ট্রিয়ান শিল্পী গুস্তাভ ক্লিমটের কন্যা’। সেই একটিমাত্র কাগজ তাঁকে ভিয়েনায় নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখে। ১৯৪৪ সালে শারীরিক অসুস্থতায় মৃত্যু হলেও নাৎজিদের হাতে নিহত হতে হয়নি। তাঁর পরিচয়ের সুরক্ষা-চাদর হয়ে দাঁড়ায় এই একটিমাত্র ছবি!
সম্প্রতি নিলামে ২০ মিনিটের তীব্র দর কষাকষির পর পোট্রেট বিক্রি হল ২৩৬.৪ মিলিয়ন ডলারে—যা আধুনিক শিল্পের ইতিহাসের নিরিখে সর্বোচ্চ! আগের রেকর্ড ছিল অ্যান্ডি ওয়ারহলের মেরিলিন মনরো সিরিজ। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, এই ছবির আড়ালে নিহিত গভীর মানবিক ইতিহাস, হলোকস্টের নৃশংসতার মধ্যে শিল্পের সত্যপ্রতিষ্ঠার গল্প—রেস্তবান, রুচিমান ক্রেতাদের মন জয় করেছে—এতে অবাক হওয়ার কী আছে!
প্রসঙ্গত, ছবিটি এতদিন ছিল কসমেটিক জায়ান্ট এস্টি লডারের উত্তরাধিকারী লিওনার্ড লডারের সংগ্রহে। তিনি মারা যাওয়ার পর বিশাল সংগ্রহের অনেকটাই নিলামে তোলা হয়। ক্লিমটের আরও পাঁচটি কাজ মিলিয়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় $৩৯২ মিলিয়ন। ক্রেতার নাম গোপন। কিন্তু শিল্পীমহল বলছে—যে-ই হোক না কেন, ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ টুকরো এখন তাঁর প্রাইভেট কালেকশনে।
এদিনের নিলামের আরেক চর্চিত আইটেমও কম বিস্ময়ের নয়। বস্তুটি—১৮ ক্যারাট সোনার টয়লেট! সন্ধ্যার শোস্টপার। ইতালির প্রোভোকেটিভ শিল্পী মাউরিজিও ক্যাটেলানের ১৮ ক্যারাট সোনার টয়লেট ‘আমেরিকা’। দাম উঠল $১২.১ মিলিয়ন। শিল্পীর নিজের ফুটনোট: ‘যাই খান, ২০০ ডলারের লাঞ্চ হোক বা ২ ডলারের হট ডগ, শেষে সবই তো একই জায়গায় যায়।’ ধনসম্পদের অসমতা আর আধুনিক সমাজের ভোগজটিলতাকে শিল্পে মুড়ে দেখানো, হাসির মোড়কে বোঝানো চাট্টিখানি কথা!