World Theatre Day। সারা পৃথিবী যখন থিয়েটারের শিল্প, ইতিহাস আর প্রভাবকে উদযাপন করছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন বারবার সামনে চলে আসে—সত্যিই থিয়েটারের ‘বর্তমান’কে রক্ষা করা চলছে, নাকি তার শুধু গৌরবময় অতীতের সেলিব্রেশন হচ্ছে!

শেষ আপডেট: 27 March 2026 13:42
World Theatre Day। সারা পৃথিবী যখন থিয়েটারের শিল্প, ইতিহাস আর প্রভাবকে উদযাপন করছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন বারবার সামনে চলে আসে—সত্যিই থিয়েটারের ‘বর্তমান’কে রক্ষা করা চলছে, নাকি তার শুধু গৌরবময় অতীতের সেলিব্রেশন হচ্ছে!
কলকাতায় এখনও মঞ্চের আলো নিভে যায়নি। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, রবীন্দ্র সদন, গিরিশ মঞ্চ—এই কয়েকটি জায়গা ঘিরেই নিয়মিত নাটক হচ্ছে, দর্শকের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। টিকিটের লাইনে ভিড়, শো শুরুর আগে উত্তেজনা, শেষে ব্যাক স্টেজে আলাপচারিতা—সব মিলিয়ে শহুরে থিয়েটারের স্পন্দন এখনও টিকে আছে, তা মিথ্যে নয়।
কিন্তু শহরের বাইরে বেরোলেই চিত্রটা পাল্টে যায়। মফস্বল ও জেলা শহরগুলিতে থিয়েটার অনেকটাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। কোথাও কোনও দল নিজের মতো করে কাজ করছে, কোথাও আবার সুযোগের অভাবে থমকে যাচ্ছে। নিয়মিত চর্চা, প্রশিক্ষণ বা মঞ্চের পরিকাঠামো—সবই অনিয়মিত। ফলে ধীরে-ধীরে থিয়েটার এক ধরনের শহরকেন্দ্রিক শিল্পে পরিণত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের ইঙ্গিতও।
এই গোটা কাঠামোর ভিতরেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় টানাপড়েন। বাংলা থিয়েটারের মূল ভরসা গ্রুপ থিয়েটার, কিন্তু সেই জায়গাটাই সবচেয়ে অনিশ্চিত। অধিকাংশ দলই চলে নিখাদ আবেগ আর ব্যক্তিগত উদ্যোগে। শিল্পীরা দিনের অন্য কাজ সেরে সন্ধেবেলা রিহার্সালে যোগ দেন, নিজেদের পকেট থেকে প্রযোজনার খরচ জোগান, সেট, আলো, পোশাক—সবকিছু সামলে মঞ্চে ওঠেন।
এই পরিশ্রমের বিনিময়ে আর্থিক নিশ্চয়তা প্রায় নেই বললেই চলে। কর্পোরেট সহায়তা প্রায় অদৃশ্য, আর সরকারি অনুদান থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয় এবং প্রায়ই জটিল প্রক্রিয়ার জালে আটকে পড়ে। ফলে থিয়েটার এখানে পেশা নয়, বরং একধরনের অঙ্গীকার, যা ধরে রাখা সহজ নয়।
তবুও আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। নতুন প্রজন্ম থিয়েটারের দিকে ঝুঁকছে, বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, কলেজ ফেস্ট, এক্সপেরিমেন্টাল কাজের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের জায়গা খুঁজে নিচ্ছে। নতুন ভাবনা, নতুন ভাষা নিয়ে কাজ হচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—এই আগ্রহ ধরে রাখার মতো শক্ত ভিত এখনও তৈরি হয়নি। নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা নেই, দীর্ঘমেয়াদি কেরিয়ারের স্পষ্ট পথ নেই। ফলে অনেকেই কিছুদিন পর সিনেমা বা OTT-র দিকে সরে যান। থিয়েটার তখন অনেকের কাছে চূড়ান্ত লক্ষ্য না হয়ে একটি মধ্যবর্তী ধাপ হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই থিয়েটারের ভেতরের বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন নাট্যকার চন্দন সেন। তাঁর মতে, বাংলা থিয়েটারে নতুন নাট্যকারের অভাব স্পষ্ট। পরীক্ষানিরীক্ষার ক্ষেত্রেও তেমন বড় পরিবর্তন চোখে পড়ে না।
তবে তিনি এটাও মানছেন, ১০-১৫ বছর আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে এবং নতুন প্রজন্ম থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘অশোকনগর নাট্যআননের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে এবং বিভিন্ন জেলায় ঘুরে দেখেছি, আশির দশকের মতো না হলেও এখনও অনেক তরুণ-তরুণী থিয়েটারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কিন্তু আরেকটি বড় সমস্যা সামনে আসে—মহিলা অভিনেত্রীর অভাব, বিশেষ করে জেলাগুলিতে,’

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে প্রেক্ষাগৃহের সংকটও। বললেন, ‘একসময় বাম আমলে বিভিন্ন জেলায় ‘রসুন প্রকল্পের’ অধীনে রবীন্দ্রনাথ, সুকান্ত, নজরুল মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই মঞ্চগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকমতো হচ্ছে না। এমনকি কিছু পৌরসভা এই প্রেক্ষাগৃহগুলিকে বিয়েবাড়ির ভাড়ার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছে!’ (World Theatre Day, Chandan sen, Koushik Sen, Debesh Chattopadhyay, Debesh Chatterjee)
ছবিটাকে এক কথায় ব্যাখ্যা করতে নারাজ। তাঁর মতে, বাংলা থিয়েটারের অবস্থা একমাত্রিক নয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে থিয়েটার সবসময়ই পিছিয়ে, সেটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সৃজনশীলতার জায়গায় এবং অংশগ্রহণের দিক থেকে থিয়েটার এখনও অনেক শক্তিশালী। বললেন, ‘নতুন প্রতিভারা নিয়মিত কাজ করছেন, নানা ধরনের প্রযোজনা হচ্ছে। বাংলা সিনেমা, OTT বা টেলিভিশনের তুলনায় থিয়েটার অনেক ক্ষেত্রে ভালো অবস্থায় রয়েছে।’

তিনি এটাও স্পষ্ট করেন, নাটকের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে বটে, কিন্তু সেই হারে গুণমান সবসময় ধরে রাখা যাচ্ছে না। প্রস্তুতির ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে, আর তার পিছনে নানা কারণ থাকলেও সেগুলোকে অজুহাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সরকারি প্রেক্ষাগৃহের প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘সব জায়গার ছবি একরকম নয়। মফস্বলের অনেক হলে আগের তুলনায় পরিবেশ উন্নত হয়েছে, এমনকি গরমকালেও এখন শো করা যাচ্ছে—যা আগে বাম আমলে সম্ভব ছিল না, তখন মূলত শীতকালেই শো সীমাবদ্ধ থাকত’
তবে কলকাতার নামী প্রেক্ষাগৃহগুলির উন্নয়ন নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, রাজ্যের সরকারি হলগুলির অবস্থা একেবারে খারাপ বলা যাবে না। সম্প্রতি স্ত্রী রেশমীকে সঙ্গে নিয়ে কোননগরের রবীন্দ্র ভবনে গিয়ে তিনি দেখেছেন, মেক-আপ রুম খুব উন্নত না হলেও মঞ্চের মান ভালো, অ্যাকুস্টিকও যথেষ্ট উন্নত। আগে যেখানে সরকারি হলে শীত ছাড়া শো করা যেত না, এখন মফস্বলের বহু জায়গায় গরমকালেও ‘কল শো’ মিলছে। বরং কলকাতার পরিচিত প্রেক্ষাগৃহ অ্যাকাডেমির তেমন কোনও পরিবর্তন বা উন্নতি চোখে পড়ে না বলেই তাঁর মত।’
নাট্যকার দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের কথায় এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। তাঁর মতে, বাংলা থিয়েটারের অবস্থা একরৈখিক নয়, বরং বহুস্তরীয়। ভালো এবং খারাপ—দুটোই পাশাপাশি চলছে। তিনি সরাসরি স্বীকার করছেন, ‘যত সংখ্যায় নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, সেই তুলনায় মানসম্পন্ন প্রযোজনা সবসময় তৈরি হচ্ছে না। ফলে একটি অংশে গুণগত অবনমন দেখা যাচ্ছে, যদিও তা সামগ্রিক নয়, বরং বিচ্ছিন্ন।’

একই সঙ্গে তিনি এটাও তুলে ধরেন, নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে এবং থিয়েটার করতে করতেই তারা টেলিভিশন, সিনেমা বা OTT-তে জায়গা করে নিচ্ছে। আর একটা কথা, ‘অর্থনৈতিক দিক থেকে থিয়েটার কখনওই খুব শক্তিশালী ছিল না, এখনও নয়। তবে তিনি মনে করেন, একেবারে থিয়েটার করে জীবনধারণ অসম্ভব—এমন কথাও পুরোপুরি সত্যি নয়।’
সব মিলিয়ে ছবিটা স্পষ্ট—বাংলা থিয়েটার বেঁচে আছে, কিন্তু নিশ্চিন্ত নয়। আবেগ আছে, পরিশ্রম আছে, নতুন প্রজন্মের আগ্রহও আছে, কিন্তু তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকাঠামো, অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই।
বিশ্ব নাট্য দিবসে তাই প্রশ্নটা থেকেই যায়—শুধু মঞ্চের আলো জ্বলে উঠতে দেখেই খুশি, নাকি সেই আলোটা টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির কথাও ভাবছি? কারণ থিয়েটার বাঁচে শুধু অভিনয়ে নয়, তার পেছনের মানুষগুলোর বেঁচে থাকার মধ্যেই। আর যদি সেই ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলে একদিন মঞ্চে আলো জ্বলবে ঠিকই—কিন্তু দর্শক কি তখনও থাকবে?