জেসুদাস পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, রেকর্ডিস্ট শুরু থেকেই আমাকে বিরক্ত করে যাচ্ছিলেন।

‘গান্ধর্ব’ গায়ক কে জে জেসুদাসের (KJ Yesudas) আজ ৮৬-তম জন্মদিন।
শেষ আপডেট: 10 January 2026 14:01
জেসুদাস (KJ Yesudas birthday) এসেছেন অরুণাচলম স্টুডিওতে রেকর্ডিংয়ের জন্য। আর পাঁচটা নতুন গায়কের মতোই একবুক আশা নিয়ে। কিন্তু, উঠতিদের মতোই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল একরাশ প্রতিকূল-প্রতিবন্ধকতা। রেকর্ডিস্ট জীবা শুরু থেকেই নানান টালবাহানা শুরু করে দেন। সুরকার ইব্রাহিম ততক্ষণে রেকর্ডিংয়ের জন্য হাজির হয়ে গিয়েছেন। মালয়ালমে তিনি অন্য কাউকে দিয়ে গান করার ভাবছিলেন। আর তাতেই ধুনো দিয়ে যাচ্ছিলেন জীবা।
জেসুদাস পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, রেকর্ডিস্ট শুরু থেকেই আমাকে বিরক্ত করে যাচ্ছিলেন। আমি যদি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে গাইছি, তো উনি আমাকে একটু পিছতে বলছেন। যেই এক পা পিছচ্ছি, তো উনি আমাকে আর একটু এগতে বলছেন। আর বলার ভঙ্গিটাও ভাল নয়। এমনকী উনি আমাকে এও বললেন যে, আমার গলার স্বর নাকি ভাল নয়! কিন্তু, সিনেমায় গান গাওয়ার সুযোগও আমি ছাড়তে চাইছিলাম না। তার জন্য বুকে কষ্ট চেপে রেখেই আমি ওদের প্রতিটি কথা শুনে চলছিলাম।
জেসুদাসের কথায়, সিনেমার চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার অভয়দেব স্যার তারপর এলেন। তিনি দেখেই বুঝতে পারলেন, আমার দুর্দশার অবস্থা। উনিই নির্দেশ দিলেন, যা চলছে তা চলবে, অন্য কাউকে দিয়ে গাওয়ানো হবে না। উনি বলার পর সবকিছু ঠিকঠাক চলল। সেদিন জেসুদাস ভেজা চোখে অভয়দেবের হাত থেকে গান গাওয়ার পারিশ্রমিক নিয়ে ফিরে আসেন। তারপর শুরু গানের জগতে এক নয়া ইতিহাসের আখ্যান।
বছর দুয়েকের মধ্যে জেসুদাস শুধু মালয়ালম, তেলুগু, কন্নড় ছবির নয়, গোটা দেশের এক প্রসিদ্ধ গায়কের আসনে জায়গা করে নেন। এমনকী সেই অরুণাচলম স্টুডিওর মালিকানা তাঁর হাতেই চলে আসে। আর সেই রেকর্ডিস্ট জীবা জেসুদাসের বেতনভুক কর্মচারীতে রূপান্তরিত হন।
সেই ‘গান্ধর্ব’ গায়ক কে জে জেসুদাসের (KJ Yesudas) আজ ৮৬-তম জন্মদিন। সাড়ে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর কণ্ঠে সুর পেয়েছে মালয়ালিদের সকাল-সন্ধ্যা। জেসুদাসের গান কেবল শোনার নয়, তা জড়িয়ে থাকে জীবনের সঙ্গে। ১৯৬১ সালে, মাত্র ২১ বছর বয়সে, ‘কালপাডুক্কাল’ (Kalpadukkal) ছবিতে প্রথম রেকর্ড হয় জেসুদাসের কণ্ঠ। ১৯৪০ সালের ১০ জানুয়ারি কোচির ফোর্ট কোচিতে জন্ম। বাবা অগাস্টিন জোসেফ ভাগবাথর ছিলেন খ্যাতনামা সংগীতশিল্পী ও মঞ্চাভিনেতা। মায়ের নাম এলিজাবেথ। সাত সন্তানের মধ্যে জেসুদাস ছিলেন দ্বিতীয়।
জেসুদাস শুধু মালয়ালিদের নন, সারা বিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের কাছেই আলাদা এক অনুভূতির নাম। প্রেম, বিরহ, বিষাদ, হতাশা কিংবা আনন্দ—মানুষের মনের প্রতিটি স্তরের প্রতিধ্বনি মিলেছে তাঁর কণ্ঠে। নরম, স্নিগ্ধ গলায় যখন তিনি গান ধরেন, প্রতিটি সুর ভরে ওঠে গভীর ভালোবাসায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জেসুদাসকে পেয়েছে প্রেম আর আকুলতার স্বর হিসেবে। তাঁর গানে তৈরি হওয়া মায়াবী আবহ বহু স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছে শ্রোতাদের। ধর্ম বা জাতির ভেদাভেদ ছাড়িয়ে ভক্তিমূলক গানের ক্ষেত্রেও তিনি রেখে গেছেন অগণিত অনন্য সৃষ্টি।
এই কারণেই জেসুদাসকে বলা হয়— দেবতাদের জাগিয়ে তোলার কণ্ঠ। প্রতিদিনের প্রার্থনা, বিশ্বাস আর সুরের ভিতর দিয়ে আজও বেঁচে আছে গান্ধর্ব গায়ক জেসুদাসের একেকটি গান।
সাড়ে ছয় দশকের দীর্ঘ সংগীতজীবনে ৬০ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন জেসুদাস (KJ Yesudas)। চলচ্চিত্রের গান থেকে কর্নাটকী ভজন, ভক্তিমূলক স্তোত্র— সব ক্ষেত্রেই তাঁর কণ্ঠ রেখে গিয়েছে জাদুকরি ছাপ। দেশীয় ভাষার পাশাপাশি আরবি, ইংরেজি, লাতিন এমনকী রুশ ভাষাতেও গান গেয়েছেন তিনি। মালয়ালম, তামিল, তেলুগু, হিন্দি, কন্নড়, বাংলা ও ওড়িয়া—প্রায় সব প্রধান ভারতীয় ভাষাতেই তাঁর কণ্ঠ সমানভাবে সমাদৃত।
বিশ্বজুড়ে অগণিত অনুরাগীর কাছে জেসুদাস পরিচিত ‘গনগান্ধর্বন’ (Ganagandharvan) নামে— এক স্বর্গীয় কণ্ঠের প্রতীক হিসেবে। সুরকার রবীন্দ্রনের (Raveendran) সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর ও আত্মিক। রবীন্দ্রনের সৃষ্ট বহু কালজয়ী গান জেসুদাসের কণ্ঠে পেয়েছে অমরত্ব। ২০০৫ সালে রবীন্দ্রনের প্রয়াণের পরও সেই বন্ধন আজও বহন করে চলেছেন তিনি। এই আবেগী সম্পর্কের প্রকাশ্য সাক্ষী হয়েছেন শ্রোতারা। কয়েক বছর আগে মঞ্চে ‘প্রমাধবনম’ (Pramadhavanam) গানটি গাইতে গিয়ে আবেগে ভেঙে পড়েছিলেন জেসুদাস। চোখের জলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সুরকার-গায়কের সেই অনন্য আত্মিক যোগ।
তাঁর ঘরে সম্মানের তালিকাও সমানভাবে উজ্জ্বল। ২০১৭ সালে জেসুদাসকে দেওয়া হয় দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ (Padma Vibhushan)। পাশাপাশি তিনি পেয়েছেন আটটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (National Award), কেরল রাজ্যের ২৫টি, তামিলনাড়ুর পাঁচটি এবং অন্ধ্রপ্রদেশের চারটি রাজ্য পুরস্কার।
জেসুদাসের সুরেলা কণ্ঠ শুনলে মনে হয়, হৃদয়ে কেউ কাশ্মীরের মখমলি গালিচা বিছিয়ে দিচ্ছে। সবুজ উপত্যকার বিছানায় মাথার উপর ঝলমলে আকাশের ফরাশ পাতা রয়েছে। শুধু আঞ্চলিক সিনেমায় নয়, হিন্দি চলচ্চিত্র জগতেও নিজের আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন। কেরলের এই শিল্পীকে বলিউডে পরিচয় করিয়ে দেন প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক সলিল চৌধুরী (Salil Chowdhury)। তাঁর সুরে তৈরি ছবি ছোটি সি বাত (Chhoti Si Baat)–এর গান বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এবং সেখান থেকেই হিন্দি ছবিতে জেসুদাসের যাত্রা শুরু। একসময় এমন পরিস্থিতি আসে, যখন সম্মান ও পুরস্কারের সংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে স্বয়ং গায়ককেই বলতে হয়—
আর আমাকে পুরস্কার দেবেন না। নতুনদের দিন।
বলিউডে তিনি কাজ করেছেন একাধিক কিংবদন্তি সুরকারের সঙ্গে। বাপ্পি লাহিড়ী (Bappi Lahiri), খৈয়াম (Khayyam), রবীন্দ্র জৈন (Ravindra Jain) এবং অবশ্যই সলিল চৌধুরীর মতো সুরকারদের সঙ্গে সৃষ্টি করেছেন বহু স্মরণীয় গান, যা আজও শ্রোতাদের মনে অমলিন। রবীন্দ্র জৈনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ। একবার রবীন্দ্র জৈন বলেছিলেন, যদি তিনি আবার দৃষ্টি ফিরে পান, তবে প্রথম যাঁকে দেখতে চাইবেন তিনি জেসুদাস। যাঁর কণ্ঠ তাঁর কাছে ছিল নিখাদ সুরের প্রতিচ্ছবি।
নারীদের পোশাক নিয়ে এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে একসময় বিতর্কে জড়ালেও, তা জেসুদাসের সঙ্গীতজীবনে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিতর্ক পেরিয়ে তাঁর কণ্ঠ আরও একবার প্রমাণ করেছে— সুর সময়ের ঊর্ধ্বে। জেসুদাস শুধু একজন গায়ক নন। তিনি ভারতীয় মার্গ ও জনপ্রিয় সঙ্গীতের জীবন্ত উত্তরাধিকার— নিজেই একটি চলমান ইতিহাস, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সুরের আকাশকে আলোকিত করে রেখেছে।