আরও বেশ কয়েকটি সিনেমা সে বছরেই মুক্তি পেয়েছিল, যার মধ্যে কয়েকটি বাঙালি দর্শকদের যথেষ্ট সমাদর কুড়িয়েছিল।

৫০ বছর পরেও ‘জন অরণ্য’ (Jana Aranya 50 Years) আজকের কর্পোরেট দুনিয়া, স্টার্টআপ সংস্কৃতি ও ‘এন্ড জাস্টিফাইস দ্য মিন্স’-এর যুগে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
শেষ আপডেট: 10 January 2026 12:09
১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) কালজয়ী ছবি ‘জন অরণ্য’ (Jana Aranya) এ বছর পা দিল সুবর্ণজয়ন্তীতে। মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের (শংকর নামে পরিচিত) উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই ছবি শুধু একটি যুবকের চাকরির সংগ্রামের কাহিনি নয়— এ এক নির্মম সামাজিক দলিল। মনে রাখতে হবে, যে বছরে এই ছবি ও অন্যান্য বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছিল, সেটা একটি রাজনৈতিক যুগ সন্ধিক্ষণের কাল। একদিকে, জরুরি অবস্থা ও অন্যদিকে এ রাজ্যে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজব্যবস্থা বদলের কমিউনিস্ট বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। তার মধ্যেই সেই বছরে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলি বাঙালিকে প্রাণভরে ফুসফুসে অক্সিজেন ভরে দিয়েছিল। এই বছরেই আরেক বাঙালি স্বনামধন্য পরিচালক মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ (হিন্দি) মুক্তি পেয়েছিল। যে ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই বছরেই আরেক বাঙালি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন ‘দত্তা’ সিনেমা করেন।
পরিচালক সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray Director) এই জন অরণ্যে তুলে ধরেছিলেন সাতের দশকের কলকাতার (1970s Calcutta) মধ্যবিত্ত তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব এবং মূল্যবোধের ভাঙনের কথা। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র সোমনাথ, যে চাকরি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যবসার অন্ধকার জগতে ঢুকে পড়ে অবশেষে একটি সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রদীপ মুখোপাধ্যায় (Pradip Mukherjee)। তাঁর সংযত, প্রায় নিরাবেগ অভিনয় আজও বাংলা সিনেমার (Bengali Cinema Classic) এক মাইলস্টোন। পাশাপাশি ছিলেন উৎপল দত্ত (Utpal Dutt)। প্রযোজনা করেছিল আর.ডি. বনসাল প্রোডাকশন (RD Bansal Production), আর সঙ্গীতের আবহে ছিল রায়ের নিজস্ব স্টাইল— কোনও অতিনাটকীয়তা নয়, নিঃশব্দ বাস্তবতার চাপ। ৫০ বছর পরেও ‘জন অরণ্য’ (Jana Aranya 50 Years) আজকের কর্পোরেট দুনিয়া, স্টার্টআপ সংস্কৃতি ও ‘এন্ড জাস্টিফাইস দ্য মিন্স’-এর যুগে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। চাকরির বাজার বদলেছে, কিন্তু নৈতিক সংকট— তা কি আদৌ বদলেছে?
‘হোটেল স্নো ফক্স’ (Hotel Snow Fox)
একই বছর, ১৯৭৬-এই মুক্তি পেয়েছিল যাত্রিক পরিচালিত আরেকটি হিট ছবি ‘হোটেল স্নো ফক্স’ (Hotel Snow Fox Bengali Film)। ষড়যন্ত্র, মানবিক দ্বন্দ্ব আর ক্ষমতার খেলা— এই সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন যাত্রিকের প্রধান তরুণ মজুমদার। সঙ্গী ছিলেন দিলীপ মুখোপাধ্যায় ও শচীন মুখোপাধ্যায়। এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন উত্তমকুমার, মিঠু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
১৯৭৬ সাল মানেই শুধু ‘জন অরণ্য’ বা ‘হোটেল স্নো ফক্স’ নয়। একই সময়ের আশপাশে বাংলা সিনেমা খুঁজছিল অন্য ভাষা, অন্য ভঙ্গি—কখনও বিশ্বাসে, কখনও নারীর চোখে, কখনও প্রান্তিক মানুষের গল্পে।
‘বহ্নিশিখা’ (Banhishikha Bengali Film)
এই ছবি দাঁড়িয়ে ছিল আত্মত্যাগ, আদর্শ আর ব্যক্তিগত যন্ত্রণার মাঝখানে। নামের মতোই, নীরবে জ্বলে থাকা এক আগুন—যেখানে চরিত্ররা মুখে কম বলে, চোখে বেশি।
‘বিল্বমঙ্গল’ (Bilbamangal Bengali Film)
গিরিশচন্দ্র ঘোষের কাহিনি অবলম্বনে ভক্তি ও মানবিক দ্বন্দ্বের গল্প। রূপমোহ থেকে ঐশ্বরিক সাধনার মাধ্যমে ভগবানের প্রতি আত্মনিবেদনের সারকথা। যেখানে নায়কের রূপমোহ এই বাইজির কথায় দেহোত্তীর্ণ প্রেমে কৃষ্ণনামে সমর্পিত হয়। আধ্যাত্মিকতা এখানে পালানোর পথ নয়, বরং আত্মসংঘর্ষের ক্ষেত্র। সাতের দশকে দাঁড়িয়ে এই ছবি মনে করিয়ে দিয়েছিল— সব বিদ্রোহ রাস্তায় হয় না।
‘দত্তা’
সমাজ, নারী আর সিদ্ধান্ত। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কলম থেকে উঠে আসা এই গল্পে নারী চরিত্র কোনও অনুষঙ্গ নয়— সে প্রশ্ন তোলে, সিদ্ধান্ত নেয়, মূল্য দেয়। সাতের দশকে নারীর অবস্থান নিয়ে যে নতুন ভাবনা শুরু হয়েছিল, ‘দত্তা’ তারই ধারক। এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সুচিত্রা সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত ও সমিত ভঞ্জ। পরিচালনা অজয় কর।
‘হংসরাজ’
মূলধারার বাইরে দাঁড়িয়ে কৈশোরের সম্পর্ক, নৈতিকতা আর সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলা এক ছবি। খুব আলোচনায় না এলেও, সময়ের মনস্তত্ত্ব ধরে রেখেছিল। বাংলা বাউল গানের সঙ্গে সেকালের নয়া আমদানি পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দ্বন্দ্বের মধ্য গানধর্মী এই ছবি শিশু-কিশোরদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। বিশেষ করে শিশুশিল্পী থেকে কিশোর শিল্পী হওয়া অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের হংসরাজ নামভূমিকায় অভিনয়ে তিনি সেকালের আপামর দর্শকের মন জিতে নিয়েছিলেন। সঙ্গে রয়েছে আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে অসংখ্য হিট গান।
হারমোনিয়াম, নিধিরাম সর্দার, সেই চোখ
সাতের দশকের বাংলা সিনেমা (Rebel Bengali Cinema) মানেই শুধু স্লোগান নয়। অনেক সময় বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল ঘরের ভিতরেই। যেমন হারমোনিয়াম। একটি ভিন্ন ধারার গীতিময় ছবি। পরিচালক তপন সিংহের (Tapan Sinha) এই ছবি মধ্যবিত্ত জীবনের ভাঙাচোরা সুরের গল্প। গান এখানে বিনোদন নয়— বেঁচে থাকার অবলম্বন। সম্পর্ক, স্বপ্ন আর ব্যর্থতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ছবি। একটি হারমোনিয়ামকে কেন্দ্র করে গোটা ছবির আবর্ত রচনা করেছিলেন পরিচালক। হারমোনিয়াম কেবলমাত্র একটি বাজনাযন্ত্র নয় এই সিনেমায়, খোদ নায়ক চরিত্র বলা চলে। যাকে কেন্দ্র করে বাকি চরিত্রগুলি নড়াচড়া করে, কথা বলে, গান গায়।
‘নিধিরাম সর্দার’
প্রান্তিক মানুষের গল্প বলার সাহসী প্রয়াস। শহরের বাইরে থাকা জীবনের যন্ত্রণা, বঞ্চনা আর নীরব প্রতিবাদ—এই ছবি মনে করিয়ে দিয়েছিল, সিনেমার কেন্দ্র শুধু শহর নয়।
‘সেই চোখ’ (Sei Chokh Bengali Film)
একটি দৃষ্টি, একটি স্মৃতি— আর তার ভিতর লুকিয়ে থাকা অপরাধবোধ ও অনুশোচনা। থ্রিলারের আবহে মানুষের মনস্তত্ত্ব খোঁজার চেষ্টা।
‘মোহনবাগানের মেয়ে’
ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, গড়ের মাঠ কিংবা ময়দান মানে বাঙালির আত্মপরিচয়। কলকাতা জুড়ে সে সময় বাঙাল-ঘটির চির প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাম ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান। সেই সময়টা যাঁরা না দেখেছেন, তাঁদের কাছে এই ছবির আজকের দিনে গুরুত্ব খুব সামান্যই। এটি শুধুই একটি ক্লাবের গল্প নয়। এটা ছিল কলকাতার আবেগ, পরিচয় আর গর্বের প্রতিচ্ছবি।
যে সময় মানুষ চারপাশের অনিশ্চয়তায় ক্লান্ত, সেই সময় ফুটবল হয়ে উঠেছিল আশ্রয়। সিনেমাও সেই আবেগ ধরেছিল।
১৯৭৬ সাল মানে দেশে তখন জরুরি অবস্থা (Emergency)। গণতন্ত্র লুণ্ঠিত, মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রিত, রাস্তায় ক্ষোভ— আর সেই চাপ এসে পড়েছিল শিল্পে। বাংলা সিনেমা তখন তিনটি পথে হাঁটছিল— শহুরে মধ্যবিত্তের হতাশা (জন অরণ্য), ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার-বঞ্চনা (হোটেল স্নো ফক্স) ও সামাজিক টানাপড়েন, একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন, সম্পর্কের দোলাচলের (হারমোনিয়াম, দত্তা) ভিতরে। আরও বেশ কয়েকটি সিনেমা সে বছরেই মুক্তি পেয়েছিল, যার মধ্যে কয়েকটি বাঙালি দর্শকদের যথেষ্ট সমাদর কুড়িয়েছিল।