এ বছরের দুর্গাপুজোয় টলিপাড়ায় যুদ্ধ যে কী ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। না, কোনও গোলাগুলি, বারুদ বা সশস্ত্র বাহিনী নয়—এই যুদ্ধ হচ্ছে একেবারে সিলভার স্ক্রিনে।

চার ছবি। এক মহাযুদ্ধ।
শেষ আপডেট: 25 September 2025 14:49
এ বছরের দুর্গাপুজোয় টলিপাড়ায় যুদ্ধ যে কী ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। না, কোনও গোলাগুলি, বারুদ বা সশস্ত্র বাহিনী নয়—এই যুদ্ধ হচ্ছে একেবারে সিলভার স্ক্রিনে। এই যুদ্ধ চলছে বুক মাই শো-র পেজে, আর সিনেমাহলের টিকিট কাউন্টারে। প্রযোজনা সংস্থাগুলো যেন নিজেদের শক্তি প্রমাণের লড়াইয়ে এক চুলও ছাড়তে নারাজ।
দেব আর এসভিএফ এই যুদ্ধে যেন একেবারেই ফ্রন্টলাইনে। জেলায়-জেলায় বড় বাসে করে ট্যুর, তারকারা নেমেই ভিড়ের মধ্যে মিশে যাচ্ছেন। সেলফি থেকে গানে নাচ—ফ্যানদের আরও কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন তাঁরা। ‘মেগাস্টার’ দেব আর ‘পাওয়ারস্টার’অনির্বাণ-এর যৌথ প্রচারে জমে উঠেছে উৎসবের আবহ। তার উপর দেবের টলিপাড়ায় কাটানো বিশ বছরের সেলিব্রেশন মিশে গিয়েছে ‘রঘু ডাকাত’-এর ট্রেলার লঞ্চ। মাঝগঙ্গায় নৌকোয় ‘ইন্টিমেট সেলিব্রেশন’ কিংবা নৈহাটির ‘বড়মা’র কাছে মাথা ঠেকানো—সব মিলিয়ে প্রমোশনের প্যাকেজ যেন গ্র্যান্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল!
তবে শুধু ‘রঘু’ লিখলে তা ভুলই বলা হবে, পিছপা হননি শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও। বহরমপুরে ‘রক্তবীজ-২’ টিমকে নিয়ে জমজমাট প্রচারপর্ব, আবার চন্দননগরে গিয়ে অঙ্কুশ-কাঞ্চন-শিবপ্রসাদের সঙ্গে সূর্য মোদকের জলভরা মিষ্টি খাওয়ার মিষ্টি মুহূর্ত। মেট্রোপলিটান দুর্গাবাড়িতে গ্র্যান্ড মিউজিক লঞ্চও যেন একেবারে পুজোর বাড়তি রং।
অন্যদিকে, প্রসেনজিৎ-শ্রাবন্তীর ‘দেবী চৌধুরানি’ও রয়েছে। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে ঘোড়ার লাগাম হাতে বসা বুম্বাদা—চোখের পলক ফেলতেই ভিড় জমে হাজার হাজার দর্শক। শ্রাবন্তী ‘দেবী’ হয়ে হয়ে উঠলেন একেবারে মধ্যমণি, তাঁর সঙ্গীও রয়েছে সেই ‘চারপেয়ে’। মালদা পর্যন্ত পৌঁছে গেল প্রচারের ঢেউ। সোশ্যাল মিডিয়ায় রীল একের পর এক, আর তাতে স্পষ্ট—আজকের প্রজন্মও সমান উচ্ছ্বাসে মেতে উঠছে তাঁদের প্রিয় প্রসেনজিৎকে ঘিরে।
শুধু অনীক দত্তের ছবি ‘যত কান্ড কলকাতাতেই’ খানিকটা ভাটা খেল প্রচারে। ছবির ‘হিরো’ আবীর চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাদে তিনি অনুপস্থিত থাকলেন প্রমোশন থেকে। তবে অনীক দত্ত একের পর এক সাক্ষাৎকারে যা বোমা ফাটালেন, তাতে তাঁর ছবিকে হেলাফেলা করার উপায় নেই। উত্তর-দক্ষিণ কলকাতার পুজোর রাস্তায় ঝুলছে ছবির বিশাল বিশাল ব্যানার, যেন লড়াইয়ে অংশগ্রহণের ঘোষণাই দিচ্ছে।
আসল লড়াই শুরু হল মুক্তির তারিখ নিয়েই। আগে ঠিক ছিল ২৬ সেপ্টেম্বর, কিন্তু তার আগেই ‘রঘু ডাকাত’-এর ট্রেলার লঞ্চে দেব ঘোষণা করলেন ২৫ তারিখেই ছবির মুক্তি। আর তার একদিন বাদেই শিবপ্রসাদও জানিয়ে দিলেন, ‘রক্তবীজ’ও ২৫ সেপ্টেম্বরেই আসছে প্রেক্ষাগৃহে। ফলে এখন দেখার বিষয়—২৫ তারিখ রাতে শো শেষ হওয়ার পরেই কে কাকে টেক্কা দিল।
সে না হয় হল! তবে এতসব জমকালো প্রমোশনাল যুদ্ধের মাঝেও প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে—এই রঙচঙে আয়োজনের ভিড়ে কি সিনেমার আসল কনটেন্ট আড়াল হয়ে যাচ্ছে? দর্শক কি গল্পের গভীরতায় হারাবেন, নাকি প্রমোশনের চাকচিক্যে মজে যাবেন?
আরও এক বিশেষ কৌশল নজর কাড়ল এবারে। ‘রঘু ডাকাত’ আর এসভিএফ প্রথমবার চালু করল একেবারে ব্যতিক্রমী অফার। ছবি রিলিজের আগে কুপন কোড বাজারে এল—বুক মাই শো-তে RAGHUDAKAT লিখলেই পাওয়া যাচ্ছে এক টিকিট কিনলে আরেকটা ফ্রি। সঙ্গে আবার হইচই ওটিটির সাবস্ক্রিপশনও বিনামূল্যে! বাংলা ছবির প্রমোশনে এই রকম উদ্যোগ আগে কখনও দেখা যায়নি।
টলিপাড়ার এক নামী প্রযোজক বলছেন, ‘‘এটাই তো প্রমোশনের খেলা! এসভিএফ আর দেব সেটা বুঝেই করছেন। ‘খাদান’-এর মতো ছবির ব্যবসায়িক সাফল্য প্রমাণ করেছে যে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে ফিরছেন। বাংলায় লার্জার দ্যান লাইফ ছবি খুব একটা হয় না, তাই প্রচারও সেই স্কেলেই হবে—অবশ্যই হওয়া উচিত।’’ অন্যদিকে এক সিনেমা বিশ্লেষক কড়া প্রশ্ন তুললেন, ‘‘এতসব কৌশল আদৌ কাজে দেবে তো? দেবের সাম্প্রতিক ছবিগুলো সাফল্য পায়নি। তাই এই ঘটা করে দেব-শুভশ্রীর নাচ, এত আয়োজন—কিন্তু যদি কনটেন্টই দুর্বল হয়? শাহরুখের ‘জওয়ান’ দেখুন, বিশাল বাজেটের ছবি—একটা অডিও লঞ্চ ছাড়া কোনও প্রচারই করেননি, তবু জাতীয় পুরস্কার জিতে নিলেন।’’
প্রচার যুদ্ধ বাংলার ছবিকে ঘিরে উন্মাদনারই রূপ। কে কতটা এগিয়ে গেল তা হয়তো সংখ্যার খাতায় মাপা যাবে, কিন্তু সত্যিটা হল—দর্শক আবার হলে ফিরছেন, সিনেমার সঙ্গে উৎসব মিলেমিশে একাকার হচ্ছে। পুজোর দিনগুলোতে বড় পর্দা আবার বাংলা ছবির উৎসবে ভরে উঠছে, এটাই বা কম কীসের!