সিরিজের শুরুতেই একটি বিশেষ কার্ড। পরিচালক আরিয়ান খান কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তাঁদের, যাঁরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কঠিন সময়ে। বিশেষ করে তাঁর সুপারস্টার বাবা শাহরুখ খানকে।

শেষ আপডেট: 22 September 2025 15:15
সিরিজের শুরুতেই একটি বিশেষ কার্ড। পরিচালক আরিয়ান খান কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তাঁদের, যাঁরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কঠিন সময়ে। বিশেষ করে তাঁর সুপারস্টার বাবা শাহরুখ খানকে। তারপরেই অন্ধকার পর্দায় ভেসে ওঠে এক বলিউড পরিচালককে শোনা গালিগালাজ। ছবির দৃশ্য ভাঙতেই দেখা যায়—অ্যাকশন দৃশ্যের শুটিং চলছে। অভিনেতা প্রাণপণ দৌড়ে উঠে পড়েছেন এক বিল্ডিং থেকে আর একটিতে, কিন্তু ঝাঁপটা মিস করে নিচে পড়ে যাচ্ছেন ভয়ঙ্করভাবে। গুরুতর আহত অভিনেতাকে দেখে মুহূর্তের জন্য পরিচালকের সুরও বদলে যায়—চিৎকার করে ডাকেন ডাক্তারকে।
এই হল কাহিনির শুরু। এখানে উঠে আসে আসমান খান (লক্ষ্য), যিনি সদ্য বলিউডে প্রবেশ করে রীতিমতো আলোড়ন তুলেছেন। প্রথম ছবিই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে নাম-খ্যাতির ঝড়ে। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন এই ইন্ডাস্ট্রির আসল চরিত্র ঠিক কী। নিজের স্পষ্ট স্বভাবই তাঁকে ফেলছে একের পর এক বিপদে।
হলিউড যেমন বানাচ্ছে ‘The Studio’ বা ‘The Franchise’, বলিউডের জন্য সেই স্যাটায়ার ভিউপয়েন্টই হাজির করেছে নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়ার নতুন সিরিজ The Ba**ds of Bollywood*।
বলিউড নিয়ে কথা বলতে গেলে এ সময়ে এক বিষয় এড়ানো যায় না—নেপোটিজম। আজকের ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় নামগুলির অনেকেই এসেছেন পরিচিত পরিবার থেকে। অনন্যা পাণ্ডে, জানহ্বী কাপুর, সারা আলি খানের মতো তারকারা পেয়েছেন সুযোগ, কারণ তাঁদের পরিবার ছিল আলোয়। আরিয়ান খানের সিরিজও এর ব্যতিক্রম নয়—শেষ পর্যন্ত তিনি তো স্বয়ং শাহরুখ খানের পুত্র।

কিন্তু এখানেই চমক। ভিতর থেকে বলিউডকে দেখে বড় হওয়া আরিয়ান নিছক মজার মোড়কে সত্যিটা দেখাতে চেয়েছেন। প্রথম এপিসোডেই এক রাউন্ডটেবিল আলোচনার দৃশ্যে আসমানকে দেখা যায় সহ-অভিনেত্রী করিশ্মা তালওয়ারের কাছে প্রশ্ন করতে—সিলভার স্পুন নিয়ে জন্মানোর সুবিধে-অসুবিধে নিয়ে। করিশ্মার চরিত্রটি আসলে আরিয়ানের নিজের প্রতিবিম্ব, যিনি চাইলে সহজেই নেপো বেবির সুরক্ষা তলায় ঢেকে রাখতে পারতেন নিজের অবস্থান। কিন্তু না, তিনি এখানে ঠান্ডা মাথায় স্বীকার করেছেন আলোয় জন্মানোর সুবিধে আর সীমাবদ্ধতা—যেটি তাঁর লেখনী এবং পরিচালনার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত।
শুধু পারিবারিক প্রভাব নয়, আরিয়ানের জীবনের আরেকটি অন্ধকার অধ্যায়ও ঢুকে পড়েছে সিরিজে। মাদক মামলায় এক সময় তাঁকে প্রায় এক মাস হাজতে থাকতে হয়েছিল, একাধিকবার জামিনও পাননি। যদিও এটি গল্পের কেন্দ্রীয় সূত্র নয়, তবুও তিনি এটিকে ছুঁয়েছেন এবং রসিকতার মাধ্যমে বলেওছেন।
তবে সিরিজ যত এগোতে থেকেছে কোথাও কোথাও গণ্ডগোল হয়েছে তার টোন নিয়ে। শুরুতে স্যাটায়ার ভঙ্গিমা বজায় রাখলেও, মাঝেমধ্যে আবার সিরিজ ঢুকে পড়েছে অতিরিক্ত ‘ফিল্মি’ মেজাজে। বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রির দাপুটে নাম অজয় তালওয়ারের চরিত্রে—যার ছায়া পড়েছে শাহরুখ খানের উপরেই—ক্যামেরা তাঁর প্রতিটি পেশীকে ‘গডলাইক’ ভঙ্গিতে দেখাতে ব্যস্ত। আবার এক বারের মারামারির দৃশ্যও পুরো বলিউডি স্টাইলে বানানো—নায়ক যেন দশজনকে সহজেই হারিয়ে দেন, আঘাতের আঁচড়ও লাগে না। অথচ সিরিজের উদ্দেশ্য যদি সত্যিই ইন্ডাস্ট্রির পর্দার আড়াল উন্মোচন, তবে স্যাটায়ারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হয়তো ছিল আরও কার্যকর।
তবুও প্রথম কাজেই আরিয়ান যেটা দেখিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। The Ba**ds of Bollywood* সাহসী, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এবং খেলাচ্ছলে বলা শুধুমাত্র তাঁর মতোই সম্ভব ছিল, যিনি এই বলি পৃথিবীতে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন। তিনি যদি তাঁর নিজের এই পৃথিবী নিয়ে হাসতে পারেন, দর্শকও পারে।

কাহিনীতে যৌনতা-রোম্যান্সের বাড়তি টানাটানি নেই—যা এক অর্থে স্বস্তি দেয়।শেষে আসমানের উত্থানের গল্প আরও জমাট বাঁধে। দুটি হটশট পরিচালকের কাছ থেকে লোভনীয় প্রস্তাব আসে তাঁর হাতে। তাঁদেরই একজন, ফ্রেডি, হঠাৎ ফোন করে পুরনো তিন ছবির চুক্তির কথা মনে করিয়ে দেন। ম্যানেজার সানিয়া তাঁকে বারণ করেন ‘হ্যাঁ’ বলতে। কিন্তু ফ্রেডির ফোনে আসমান নিজেই জড়িয়ে ফেলেন নিজেকে এক বড় ফাঁদে।
সিরিজে একের পর এক বলিউড কিংবদন্তির ঝলক আছে। তবে সবচেয়ে নজর কাড়ে করণ জোহরকে। শাহরুখ খানের ঘনিষ্ঠ এই পরিচালক এখানে নিজেকেই অভিনয় করেছেন এক অতিরঞ্জিত সংস্করণে। তিনি অর্থলোভী, অহংকারী, রণবীর সিং-এর সঙ্গে অদ্ভুত এক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছেন এবং সবসময় প্রস্তুত পরের সম্ভাবনাময় নক্ষত্রটিকে দখল করতে। ভিতরের খবর জানা দর্শকরাই বুঝতে পারবেন কতটা সত্যি, তবে জোহর নিজেকে যেভাবে উজাড় করেছেন, তা নিঃসন্দেহে স্মরণীয়।
সবচেয়ে মনে দাগ কাটে সেই সংলাপ—‘বলিউড তোমার, ছেলে। তুমি ফাটিয়ে দেবে—যেমন করে তোমার শার্ট ফেটে গিয়েছে।” বাবার উচ্ছ্বাসে ভরা এই সংলাপেই লুকিয়ে আছে ছেলের অজানা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত—যা হয়তো বিপদেরই সূচনা।
আরিয়ান খানের এটি প্রথম কাজ তাই শুধুমাত্র সিরিজ নয়, এক আত্মকথনও বটে। নেপোটিজম, বিতর্ক, খ্যাতি আর ব্যর্থতার ভেতর দিয়েও তিনি যে চোখ মেলে দেখাতে পারেন নিজের দুনিয়াকে, সেটাই তাঁর বড় জয়। আর এ কারণেই The Ba**ds of Bollywood* শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে এক আত্মদর্শনের আয়না।
পুনশ্চ: দর্শকের চোখেই তৈরি হয় এক উপলব্ধি। কারও কাছে হয়তো এটি ‘Ballads of Bollywood’, কিন্তু অন্য কারও কাছে এটি একেবারেই ‘Bastards of Bollywood’—সিনেমার মোহ ভেঙে ফেলার এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।