সুমিত্রা দেবীকে নিয়ে উন্মাদনা সুচিত্রা সেনের মতো ছিল না। অথচ সুচিত্রা সেনের আগেই সুমিত্রা দেবী 'দেবী চৌধুরাণী' ছবিতে নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। একদম সঠিক বয়সে অসাধারণ অভিনয় করেন সুমিত্রা।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 23 July 2025 17:13
রূপোলি পর্দার স্বপ্নসুন্দরী অভিনেত্রী ছিলেন সুমিত্রা দেবী (Sumitra Debi)। চারের দশক থেকেই বাংলা (Bengali Film) ও হিন্দি ছবিতে দাপট দেখিয়েছিলেন তিনি। বলিউডের (bollywood) ফিল্মফেয়ার পত্রিকার প্রচ্ছদে তাঁর সুন্দর মুখশ্রীর জয় জয়কার পড়ে গিয়েছিল সে যুগে। অথচ সুচিত্রা সেনের মতো জনপ্রিয়তা তিনি পরের যুগে পাননি। তবে নিজের সময়ে তাঁর স্নিগ্ধ রূপ যৌবনে সবাইকে পাগল করে দিতেন তিনি।
সুমিত্রা দেবীর আসল নাম ছিল নীলিমা চট্টোপাধ্যায়। ২২ জুলাই, ১৯২৩ সালে বীরভূমের সিউড়িতে জন্ম হয় তাঁর। নীলিমার বাবা ছিলেন সেখানকার নামকরা অ্যাডভোকেট মুরলীধর চট্টোপাধ্যায়। তবে নীলিমার শুরুর জীবন কেটেছিল বিহারের মুজফফরপুরে। সেখানে তাঁর বাবার বিশাল সম্পত্তি ছিল। কিন্তু সেখানে ভূমিকম্পে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায়। তখন তাঁদের পরিবার কলকাতায় চলে আসেন। ছোটবেলা থেকেই বায়োস্কোপের নায়িকা হবার শখ ছিল নীলিমার।
কিন্তু তাঁর রক্ষণশীল বাবা চাননি মেয়ে ফিল্ম লাইনে আসুক। তখন ফিল্মলাইন মানেই খারাপ পাড়ার জায়গা। কিন্তু অভিনেত্রী হবার স্বপ্নে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে নিজের পরিচয় আর ছবি দিয়ে চিঠি পাঠালেন নীলিমা। রূপের জোরে সহজেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির চোখে পড়ে গেলেন তিনি। ১৯৪৪ সালে কে এল সায়গলের বিপরীতে 'মেরি বহেন' হিন্দি ছবিতে সুযোগ পান নীলিমা। কিন্তু সে ছবিতে আর কাজ করা হয় না। তাঁর ডেবিউ বাংলা ছবি দেবকী কুমার বসুর 'সন্ধি'। এক ছবিতেই বিপুল জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠেন তিনি। প্রথম ছবিতেই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর বিএফজেএ পুরস্কার পান সুমিত্রা দেবী।

চারের দশকের শেষদিকে বম্বেতে সুমিত্রা দেবীর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। অশোককুমার মুম্বইয়ে নিয়ে গেলেন সুমিত্রা দেবীকে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রজনী’ উপন্যাসের হিন্দি চিত্ররূপ ‘সমর’ ছবিতে অশোককুমার অমরনাথের চরিত্রে অভিনয় করলেন। লবঙ্গলতার চরিত্রে সুমিত্রা দেবী। বোম্বে টকিজের ব্যানারে নির্মিত হয়েছিল ‘সমর’ ছবিটি। বাংলা-হিন্দি দু-জায়গাতেই অভিনয় করলেন সুমিত্রা। সুমিত্রা দেবীর হিন্দি ছবির তালিকায় রয়েছে ময়ূরপঙ্খী, ওসিয়াতনামা, মশাল, ভাই দুজ, প্রতিবাদ, রাজযোগী, জাগতে রহো, মাই সিস্টার, উঁচনীচ, আনটাচেবল প্রভৃতি ছবি। 'মমতা' হিন্দি ছবিতে এক সিঙ্গেল মাদারের চরিত্রে সুমিত্রার অভিনয় প্রশংসিত হয়। সুচিত্রা সেনের 'মমতা' হিন্দি ছবির অনেক আগের এই ছবি।
রাজ কাপুর তাঁর প্রযোজনা সংস্থা আর কে ফিল্মসের ব্যানারে একটি ডাবল ভার্সন ছবি তৈরি করেছিলেন। বাংলাটির নাম ‘একদিন রাত্রে’, হিন্দিতে নাম ‘জাগতে রহো’।
বাংলা ছবির জগতেও তাঁর অবদান কম নয়। অভিযোগ,প্রতিবাদ, পথের দাবী, জয়যাত্রা, স্বামী, নিয়তি, দস্যুমোহন এক একটি ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে তিনি দর্শক মনে ছাপ ফেলেছিলেন।
সতীশ দাশগুপ্তের পরিচালনায় ‘পথের দাবী’ ছবিতে তিনি করলেন ভারতীর চরিত্র। সব্যসাচীর চরিত্রে দেবী মুখোপাধ্যায়। সুদর্শন সু-অভিনেতা দেবী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুমিত্রার পরবর্তীকালে বিয়ে হয়। এটি ছিল সুমিত্রার দ্বিতীয় বিয়ে। সাল তখন ১৯৪৬।
দেবী মুখোপাধ্যায় ও সুমিত্রা দেবীর পরবর্তী ছবি ‘অভিযোগ’। পরিচালক সুশীল মজুমদার। স্বামী-স্ত্রীর পরবর্তী ছবি ‘জয়যাত্রা’। এই ছবির সময় থেকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে।
এরইমাঝে ১৯৪৭ সালের ১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করে তাঁদের একমাত্র পুত্রসন্তান বুলবুল। কিন্তু ছেলে হবার পরও তাঁদের সম্পর্কে ধুলো কমেনি। ছেলে হবার ঠিক ১০ দিন পর ১১ ডিসেম্বর ১৯৪৭
আত্মহত্যা করেন দেবী মুখোপাধ্যায়। ‘জয়যাত্রা’ ছবির মুক্তির আগেই সাংসারিক মনোমালিন্যকে কেন্দ্র করে দেবী মুখোপাধ্যায় আত্মহত্যা করেছিলেন। সুমিত্রা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ছবির জগৎ থেকে কিছুদিনের জন্য তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। স্বামীর আত্মহনন সুমিত্রার কেরিয়ারে বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। দেবী মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর কিনারা হয়নি। রহস্য রয়েই গিয়েছিল।
পরে আবার সুমিত্রা ফিরে আসেন ছবির জগতে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে সুমিত্রার অভিনয়-দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায় দুটি স্মরণীয় উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপে। প্রথমটি বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরানী’। নামভূমিকায় তিনি। বিপরীতে ব্রজেশ্বরের চরিত্রে প্রদীপকুমার। দ্বিতীয়টি শরৎচন্দ্রের ‘স্বামী’। সেখানে তিনি নায়িকা সৌদামিনীর চরিত্রে। স্বামীর ভূমিকায় পাহাড়ী সান্যাল, প্রেমিক নরেনের ভূমিকায় প্রদীপকুমার। দুটি ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করলেন সুমিত্রা দেবী। এই ছবি দুটির হিন্দি ভার্সানেও নায়িকা হয়েছিলেন সুমিত্রা দেবী।
সুমিত্রা দেবীর আইকনিক চরিত্র 'সাহেব বিবি গোলাম' ছবির ছোট বৌঠান। বিমল মিত্রের এই কাহিনি নিয়ে ছবি করেন কার্তিক চট্টোপাধ্যায়। পটেশ্বরী ছোট বৌ রূপসী গৌরবর্ণা কিন্তু ছোট কর্তার (নীতিশ মুখোপাধ্যায়) মন পড়ে বাঈজি বাড়িতে। সে যুগের বাবু কালচারের পটভূমি উঠে এসেছিল পর্দায়। ছোট বৌঠান সুমিত্রা বরকে ধরে রাখতে বশীকরণের পন্থা নেন। মোহিনী সিঁদুর পরে বরকে বশীকরণ করতে চান ছোট বৌ। আর সেই মোহিনী সিঁদুর তাকে এনে দেয় ভূতনাথ (উত্তমকুমার)। কিন্তু বিফলে যায় মোহিনী সিঁদুর। এরপর মদ্যপানও ধরেন ছোট বৌ। তাতেও বরকে ধরে রাখতে পারেন না। নিজের জীবনে স্বামী হারানোর শোক যেন সুমিত্রার উঠে এসেছিল ছোট বৌঠানের হাহাকারে। ডাকসাইটে সুন্দরী প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী সুমিত্রা দেবীর অভিনয়ের জন্য দর্শকেরা বারবার ছুটে গেছেন সাহেব বিবি গোলাম দেখতে। এই চরিত্রটি হিন্দিতে করেছিলেন মীনা কুমারী।
কানন দেবীর 'শ্রীমতী পিকচার্স' এর ‘আঁধারে আলো’ ছবিতে সুমিত্রাই নায়িকা। বিপরীতে বসন্ত চৌধুরি। সুমিত্রা-বসন্ত জুটিকে ফের পাওয়া গেল ‘খেলা ভাঙার খেলা’ ছবিতে। এই ছবি এখন আর পাওয়া যায় না। কার্তিক চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’ ছবিতে তিনি দেবদাসীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। শ্রী চৈতন্যর নামভূমিকায় অসীমকুমার। এই ছবি বিশাল হিট করে।
উত্তমকুমারের বিপরীতে 'যৌতুক' ছবিতে অভিনয় করার পর সুমিত্রা কলকাতা ছেড়ে বম্বেতে থাকতে শুরু করে দেন। বহুদিন নায়িকার কোনও খবর ছিল না। বহু যুগ পর ১৯৬৪ সালে 'কিনু গোয়ালার গলি' ছবিতে সুমিত্রা অসাধারণ অভিনয় করেন। এক বন্ধ্যা নারীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় সবার মনে দাগ কেটে গিয়েছিল। সেই তাঁর শেষ অভিনয়। ততদিনে সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের পর অপর্ণা সেন, শর্মিলা ঠাকুরের জমানা শুরু হয়েছে। আর কখনও বাংলা বা হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেননি সুমিত্রা।
স্বামী দেবী মুখোপাধ্যায় আত্মহত্যা করার পর অনেকদিন একাই ছিলেন সুমিত্রা দেবী। এরপর মুম্বই-প্রবাসী এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। বিয়ের সূত্রে সুমিত্রা মুম্বইয়ে ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। প্রযোজক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তবে সাফল্য পাননি। সুমিত্রা-প্রযোজিত শেষ হিন্দি ছবি ‘এক চাদর ময়লি সি’। হেমা মালিনী, ঋষি কাপুর, কুলভুষণ খারবান্দা, পুনাম ধীলন প্রমুখ অভিনয় করেছিলেন।

সে অর্থে সুমিত্রা দেবীর বয়স্ক রূপ কখনও দেখতে পায়নি মিডিয়া থেকে দর্শক। তিনি কখনও সামনেও আসেননি লাইমলাইটের। তবে সুমিত্রা দেবীকে নিয়ে উন্মাদনা সুচিত্রা সেনের মতো ছিল না। অথচ সুচিত্রা সেনের আগেই সুমিত্রা দেবী 'দেবী চৌধুরাণী' ছবিতে নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। একদম সঠিক বয়সে অসাধারণ অভিনয় করেন সুমিত্রা। কিন্তু সেই ছবি আর পাওয়া যায় না।
১৯৯০ সালের ২৮ অগস্ট মুম্বাইয়ে প্রয়াত হন সুমিত্রা দেবী। তাঁর মরদেহ কলকাতার মানুষ সে ভাবে দেখতে পায়নি। একেবারেই আড়ালে প্রস্থান হয় অভিনেত্রীর।
তবে রূপোলি পর্দার ইতিহাসে সুন্দরী নায়িকাদের তালিকায় সুমিত্রা দেবীর মুখ রয়ে যাবে আজীবন।