‘শঙ্খবেলা’ (Shankhabela) তেমনই একটি স্মরণীয় ছবি। ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায় শঙ্খবেলা।

উত্তমকুমারের সঙ্গে এর আগে এতটা অন্তরঙ্গ দৃশ্যে আমি এর আগে অভিনয় করিনি। ছবিটি সুপারহিট হয়েছিল, বলেছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 10 January 2026 16:37
বাংলা ক্লাসিক ছবির জগতে ৫০, ৬০ ও ৭০–এর দশকে উত্তমকুমার ছিলেন নিঃসন্দেহে ‘মুকুটহীন সম্রাট’ (Uttam Kumar)। প্রায় ২০৫টি ছবিতে অভিনয় করে তিনি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একের পর এক মাইলফলক তৈরি করেছেন। তবে কিছু ছবি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে বিশেষ কিছু কারণে। ‘শঙ্খবেলা’ (Shankhabela) তেমনই একটি স্মরণীয় ছবি। ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায় শঙ্খবেলা। ছবিতে উত্তম কুমার ছিলেন এক কর্পোরেট অফিসার সুনীলের ভূমিকায়। তাঁর স্ত্রী তৃপ্তি মাধবী মুখোপাধ্যায় (Madhabi Mukherjee) এবং তাঁদের একটি ছোট ছেলে রয়েছে। কলেজ-প্রেমের নায়িকা মাধবীর সঙ্গে বিয়ে হয় উত্তমকুমারের। কিন্তু, ভোগবাদী দুনিয়ার আকর্ষণ ও মোহ এবং কর্পোরেট দুনিয়ার চাপে নায়ককে নিয়মিত পার্টি দিতে হয়, মদ্যপানে জড়াতে হয় ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে। এই জীবনযাপন মোটেই পছন্দ ছিল না মাধবীর। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এই পরিবেশে তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে পারে।
বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও যখন উত্তমকুমার এই জীবনধারা থেকে সরে আসতে পারেন না, তখন মাধবী ছেলে নিয়ে আলাদা হয়ে যান। কিছুদিনের মধ্যেই শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে কলকাতার খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বসন্ত চৌধুরীর (Bosonto Choudhury) কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। চিকিৎসার পাশাপাশি চিকিৎসক ভাঙা পরিবারকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেন। তিনি উত্তমকুমারকে ডেকে সন্তানের অসুস্থতার কথা জানান এবং বাবার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তিরস্কার করেন। শিশুর আরোগ্যের পর তিনি উত্তমকে স্ত্রী ও সন্তানকে আবার ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন। এখানেই ছবির মানসিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে।
শঙ্খবেলা–র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর সংগীত। এই ছবিতেই প্রথমবার উত্তমকুমারের জন্য গান গাইলেন মান্না দে (Manna Dey)। সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত (Sudhin Dasgupta)। এর আগে উত্তমকুমারের কণ্ঠে মূলত মূলত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের (Hemant Kumar) আধিপত্য ছিল। ১৯৫৯ সালে গলি থেকে রাজপথ ছবির “লাগ লাগ লাগ লাগ ভেল্কি খেলা” গানে মান্না দে-কে নেওয়া হলেও সেটি কোনও পূর্ণাঙ্গ সংগীতনির্ভর ছবি ছিল না। ফলে মান্না দের কণ্ঠের প্রকৃত জাদু তখনও পুরোপুরি ধরা পড়েনি। শঙ্খবেলায় সুরের জাদুকাঠিতে রয়েছে— “কে প্রথম কাছে এসেছি”, “আমি আগন্তুক আমি বার্তা দিলাম”, “আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব”। মান্না দে ও লতা মঙ্গেশকরের (Lata Mangeshkar) যুগল কণ্ঠ ছাড়াও আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শ্রোতাদের মুগ্ধ করে দেয়। ছবির মতোই প্রতিটি গান সুপারডুপার হিট হয়।
এই ছবির সাফল্যের পর বাংলা ছবিতে উত্তম কুমারের কণ্ঠস্বর হিসেবে উঠে আসেন মান্না দে। তাঁদের এই জুটি তৈরি করে একের পর এক কালজয়ী সিনেমার গান— অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, নিশিপদ্ম, চৌরঙ্গী, জীবনমৃত্যু, স্ত্রী, ছদ্মবেশী, চিরদিনের, সন্ন্যাসী রাজার মতো ছবিতে।
এই ছবিতেই মাধবীর সঙ্গে নৌকায় বসে উত্তমকুমারের সেই বিখ্যাত রোমান্টিক দৃশ্য—“কে প্রথম কাছে এসেছি”। সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য ঘরানার সুর, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Pulak Banerjee) রোমান্টিক কথা এবং উত্তম-মাধবীর রসায়ন—সব মিলিয়ে তা আজও কিংবদন্তি। সঙ্গে অবশ্যই সঙ্গীত পরিচালক সুধীন দাশগুপ্তের সঙ্গত। এই গানের সুর এতটাই প্রশংসিত হয়েছিল যে, বম্বেতে গিয়ে মান্না দে ও লতা মঙ্গেশকরের সামনে খোদ নৌশাদ (Naushad) সুধীন দাশগুপ্তকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
ঘটনাচক্রে আজ, ১০ জানুয়ারি সুরকার সুধীন দাশগুপ্তের মৃত্যুদিন। সুধীন দাশগুপ্ত ১৯৩০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের যশোহর জেলার বড়কালিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব কেটেছিল দার্জিলিংয়ে। মায়ের প্রেরণা তাকে সঙ্গীতের জগতে প্রবেশের হাতেখড়ি তৈরি করেছিল, যদিও পিতা মহেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ছিলেন শিক্ষাবিদ এবং পুত্রের সঙ্গীতপ্রিয়তা তিনি ততটা সমর্থন করতেন না।
ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। পিয়ানো, সেতার, বাঁশি, তবলা থেকে হার্প পর্যন্ত, সবই তার হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পেত। লন্ডনের রয়্যাল স্কুল অব মিউজিক থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীতে নিখুঁত দখল গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে ভারতীয় রাগসঙ্গীত ও লোকসংগীতের গভীর অধ্যয়ন করেছিলেন। এনায়েত খানের কাছে সেতার শিক্ষা গ্রহণ এবং ভাতখণ্ডের রাগ সঙ্গীতের অনুশীলন তাকে পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীতজ্ঞে পরিণত করে।
চলচ্চিত্রের দিক থেকেও তার অবদান অপরিসীম। উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো—‘পিকনিক’ (১৯৭২), ‘শঙ্খবেলা’ (১৯৬৬), ‘আকাশ কুসুম’ (১৯৬৫), ‘অপরাজিতা’ (১৯৭৬), ‘উল্কা’ (১৯৫৭)—বাংলা চলচ্চিত্র সংগীতে এক নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করেছে। ১৯৭২ সালে ‘পিকনিক’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮২ সালে এই শিল্পীর মহাপ্রয়াণ ঘটে।
পরিচালক সরোজ দে (Saroj De)–র এই ছবিতে আর এক উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বসন্ত চৌধুরীর অভিনয়। ১৯৯৩ সালের জুলাই মাসে টেলিভিশন পত্রিকায় উত্তমকুমার সংখ্যায় মাধবী মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, শঙ্খবেলা ছবিটি আমার চলচ্চিত্র জীবনে অন্তত একটা উপকার করেছে। মাধবী মানেই চারু (সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা) এই যে ইমেজটা আমার কাঁধে সিদ্ধবাদের মত চেপেছিল, তা থেকে মুক্তি দিয়েছিল শঙ্খবেলা-ই। আমি আবার রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে বাংলা ছবিতে জায়গা করে নিতে পেরেছিলাম। এটা ঠিক 'শঙ্খবেলা' আমার জীবনে পুরোপুরি অন্যরকম ছবি। উত্তমকুমারের সঙ্গে এর আগে এতটা অন্তরঙ্গ দৃশ্যে আমি এর আগে অভিনয় করিনি। ছবিটি সুপারহিট হয়েছিল। আমার আশপাশে তখন সব ডাকসাইটে নায়িকারা। তাদের সঙ্গে আমি প্রতিযোগিতা করতে যায়নি কখনই। তবে শঙ্খবেলা ছবি করার পর আমার মাথা থেকে আর্ট ফিল্মের মুকুটটা বেশ কিছুদিনের জন্য অন্তত দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছিলাম। গঙ্গার বুকে আমি ও উত্তম এই রোমান্টিক দৃশ্যটা তখন দর্শকদের মুখে মুখে ফিরত।...প্রেমের ছবি হিসেবে 'শঙ্খবেলা' বাংলা সিনেমায় একটা অন্য ধরনের ল্যান্ডমার্ক।
আরেকটি সাক্ষাৎকারে মাধবী বলেছিলেন মানুষ উত্তমকুমারের কথা, তিনি বলেন, সুপারস্টার হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কথাও উত্তমকুমার ভাবতেন। খরা বা বন্যার সময় দেখেছি, শিল্পীদের নিয়ে রাস্তায় নেমে ভিক্ষা করে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। সেই টাকা মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অবলীলায় দান করেছেন। ১৯৭৮ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলার ত্রাণের জন্য ইডেন গার্ডেন্সে মুম্বাইয়ের শিল্পীদের সঙ্গে চ্যারিটি ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করা হয়। সেখানেও ছিলেন উত্তমকুমার। যে টাকা উঠেছিল, তা তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
এছাড়া রূপসজ্জাশিল্পীর মেয়ের বিয়ে অথবা প্রোডাকশন কর্মীদের পারিবারিক কোনও সঙ্কট, সবখানেই উত্তমকুমার চুপচাপ তাদের পাশে দাঁড়াতেন বলে জানান মাধবী। মাধবীর কথায়, উত্তমকুমার ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ অভিনেতা। একজন উদার মনের মানুষ। সব সময় বলতেন, আগে আমাকে মানুষকে ভালবাসতে হবে। সারা জীবন তিনি এই আদর্শ মেনে চলেছেন। আমিও সেটা তার থেকেই শিখেছি। দুহাত ভরে মানুষের জন্য কাজ করেছেন, বলেছিলেন মাধবী। আর তাতেই উত্তমকুমার সহজে ‘দুজনার এ দুটি হৃদয়, একাকার করে নিয়েছি’...বলে বাঙালির মনে জন্মশতবর্ষেও চিরস্থায়ী আসন পেতে বসে রয়েছেন।