অভিনয়ের ঘরানায় পাওয়া তাঁর অভিব্যক্তির সূক্ষ্মতা, মেজাজের উত্থান-পতন, আর নিজের মতো করে কথা বলার কৌশল, সব মিলিয়ে আত্মভোলা কিশোর এমন এক কণ্ঠ হয়ে উঠলেন, যাঁর সুরেই হেসেছে, কেঁদেছে, প্রণয়পিপাসু হয়েছে গোটা দেশবাসী।

কিশোর কুমার
শেষ আপডেট: 4 August 2025 16:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যাঁর কণ্ঠ একদিন বলিউডের (Bollywood) প্রাণ হয়ে উঠবে, তাঁর অভিনয়ে আগ্রহ ছিল না বিন্দুমাত্র! তবু কপালের ফেরে কিশোর কুমারকে (Kishore Kumar) সিনেমা করতেই হয়েছিল। কাণ্ডজ্ঞানহীন সব ঘটনা ঘটিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন— গানই তাঁর ধ্যানজ্ঞান, অভিনয় নয়। কখনও সংলাপ পাল্টে দিতেন, কখনও মাথা কামিয়ে শ্যুটিং সেটেই নাস্তানাবুদ করতেন সবাইকে!
মধ্যপ্রদেশের (Madya Pradesh) খণ্ডওয়ার অভাস কুমার গঙ্গোপাধ্যায় থেকে মুম্বইয়ের (Kishore Kumar) কিশোর কুমার হয়ে ওঠার এই যাত্রাপথটা ছিল হোঁচটে ভরা। ঠাট্টা-তামাশায় মোড়া, অথচ আত্মবিশ্বাসে ঠাসা। বড়দা অশোক কুমার তখন বলিউডের সুপারস্টার। ছোট ভাইকে অভিনেতা বানাতে মরিয়া। কিন্তু কিশোরের তাতে ভীষণ আপত্তি। এক সাক্ষাৎকারে লতা মঙ্গেশকরকে বলেছিলেন, “অভিনয় মিথ্যে। গানই সত্য।”
চার-পাঁচের দশকে বলিউডে তখন রফি, তালাত মাহমুদ, কেএল সায়গলদের যুগ। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কড়া গণ্ডি। সেখানে কিশোর? নিজে নিজেই গান শেখা, ক্লাসিক্যালের ধার-কাছ দিয়েও না যা যাওয়া কিশোরকে সঙ্গীত পরিচালকরা তাঁকে নিতেই চাইতেন না। মনে করতেন, “ও তো সিরিয়াসই নয়।”
কিশোর নিজে অভিনয় করতে চাইতেন না। কিন্তু বাধ্য হয়ে করতেন। অভিনয়ের জন্য যখন তাঁকে গাইবার সুযোগ দেওয়া হত, সেগুলো হালকা ধরনের গানই থাকত। হৃদয় ভাঙা বা রোমান্টিক গান তখনও ‘বড়দের এলাকা’। এমনকী অশোক কুমারও উৎসাহ দেননি তাঁকে।
১৯৫৪ সালে বিমল রায়ের 'নকরি' সিনেমায় কিশোরের অভিনয়ের পাশাপাশি গান গাওয়ার সুযোগ আসে। তবে সঙ্গীত পরিচালক সলিল চৌধুরী চাইছিলেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইবেন। কিশোর নিজের গান বাজিয়ে জেদ ধরে বলেন, “আমি নিজেই গাইব।” সলিলদা নাকচ করে বলেন, “তুমি তো গানের এ বি সি-ও জানো না!”
শেষমেশ, বিমল রায়ের অনুরোধে 'ছোটা সা ঘর হোগা' গানটি কিশোরই গাইলেন, আর তাতেই বাজিমাত!
১৯৫৪ থেকে ৬৪, এই এক দশকে 'চলতি কা নাম গাড়ি', 'জুমরু', 'হাফ টিকিট', 'মিস্টার এক্স ইন বম্বে'-র মতো একের পর এক হিট সিনেমা কিশোরকে বানিয়ে দেয় বলিউডের সুপারস্টার। তবু তিনি ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত। চিরকাল চেয়েছিলেন শুধু গান গাইতে।
তাঁর বিক্ষিপ্ত ব্যবহারের গল্প বলিউডে রীতিমতো আলোচিত। একবার তো শ্যুটিংয়ের মাঝে মাথা ন্যাড়া করে দিলেন। প্রযোজককে কামড়ে দেওয়ার ঘটনাও আছে তালিকায়! টাকা না পেলে শ্যুটিং বন্ধ, সংলাপ পাল্টে দিচ্ছেন ইচ্ছে মতো—সবই অভিনয়ের প্রতি একরকম বিদ্রোহ।
৬ এর দশকের শেষে ছবিটা বদলাতে শুরু করে। শচীনদেব বর্মন তাঁকে সুযোগ দিলেন 'গাইড' (১৯৬৮) ছবিতে। তারপর 'আরাধনা' (১৯৬৯)-তে রাজেশ খন্নার লিপে কিশোরের গাওয়া 'মেরে সাপনো কি রানি'। গান হিট, ঝুলিতে প্রথম ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
তাঁর সেই ‘অদ্ভুত’ ভঙ্গি, মুখের বিকৃতি, মেজাজি ছন্দ, অভিনয় আর কণ্ঠস্বরের জগাখিচুড়ি এক নতুন বলিউড সাউন্ডের জন্ম দিল। হঠাৎ করেই সবাই বুঝল, 'ইস বন্দে মে কুছ তো হ্যায়'।
তাঁর অভিনয়প্রিয়তা ছিল না, তবু তিনি হয়ে উঠলেন অভিনেতা। গান গাইতে চেয়েছিলেন, তবু সে স্বীকৃতি পেতে লেগে গেল ২০ বছর! কিন্তু একবার সুযোগ পেলে কিশোর জানতেন, মঞ্চে কীভাবে কাঁপাতে হয়। অভিনয়ের ঘরানায় পাওয়া তাঁর অভিব্যক্তির সূক্ষ্মতা, মেজাজের উত্থান-পতন, আর নিজের মতো করে কথা বলার কৌশল, সব মিলিয়ে আত্মভোলা কিশোর এমন এক কণ্ঠ হয়ে উঠলেন, যাঁর সুরেই হেসেছে, কেঁদেছে, প্রণয়পিপাসু হয়েছে গোটা দেশবাসী।