আজ ৪ অগাস্ট—খাণ্ডওয়ার সেই ছেলে, যিনি গানের ইতিহাসকে নতুন করে লিখেছিলেন, সেই কিশোর কুমারের জন্মদিন। যতই সময় এগোচ্ছে, কিশোর যেন ততই কাছের হয়ে উঠছেন

কিশোর কুমার
শেষ আপডেট: 4 August 2025 15:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ ৪ অগাস্ট—খাণ্ডওয়ার সেই ছেলে, যিনি গানের ইতিহাসকে নতুন করে লিখেছিলেন, সেই কিশোর কুমারের জন্মদিন। যতই সময় এগোচ্ছে, কিশোর যেন ততই কাছের হয়ে উঠছেন। তাঁর গানে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক প্রজন্ম, যেন সব ব্যথা, ভালোবাসা, নস্টালজিয়া এক হয়ে মিশে যাচ্ছে সেই চেনা কণ্ঠে। কিশোর কুমার ছিলেন গায়ক, অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, এবং সর্বোপরি একজন অনন্য শিল্পী—যাঁকে কোনও ছাঁচে ফেলা যায় না।
কিশোরের গলায় ছিল সেই ম্যাজিক যা চোখে জল আনে, আবার পাও দুলে ওঠে। ‘ইয়ে শাম মস্তানি’ শুনলেই মন আনচান করে ওঠে, আবার ‘কোরা কাগজ থা ইয়ে মন মেরা’ যেন বুকের ভিতর কিছু হতে থাকে। কিন্তু এই মানুষটা শুধুমাত্র সুরের ম্যাজিশিয়ানই ছিলেন না, তাঁর জীবনে এমন কিছু ঘটনা ছিল যা তাঁকে বানিয়েছিল আরও রহস্যময়, আরও মানবিক, আবার কাছেরও।
রাজেশ খান্নার মুখোমুখি হয়ে তবেই গান গেয়েছিলেন কিশোর
‘আরাধনা’ ছবির প্রযোজকরা যখন কিশোরের কাছে যান গান গাওয়ার অনুরোধ নিয়ে, কিশোর তখন বলেন, ‘আমি নতুন কাউকে না দেখে গাই না’” দেখা হয় রাজেশ খান্নার সঙ্গে। কিশোর জিজ্ঞেস করেন, ‘অভিনেতা হতে চাও কেন?’ রাজেশ বলেন, ‘আমি সমাজসেবা করতে চাই। সিনেমা করে মানুষকে আনন্দ দেওয়া, সেটাও তো সমাজকে কিছু দেওয়া।’ কিশোর এই উত্তর শুনে হাসলেন, আর রাজি হয়ে গেলেন। বাকিটা ইতিহাস।

রাজেশ-কিশোর
জরুরি অবস্থায় গান গাইতে অস্বীকার
১৯৭৫ সালে, জরুরি অবস্থার সময় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকার পক্ষ থেকে প্রস্তাব এসেছিল—কিশোর যেন সরকারের প্রচারমূলক প্রোগ্রামের জন্য গান করেন। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। ফলস্বরূপ, অল ইন্ডিয়া রেডিও ও দূরদর্শনে নিষিদ্ধ হয়ে গেলেন কিশোর কুমার। পরে অবশ্য ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি মিটিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে লুকিয়ে ছিল শিল্পীর নিজের স্বাধীনতার প্রতি অটল আস্থা।
‘অর্ধেক পারিশ্রমিক, অর্ধেক কাজ’
একবার এক প্রযোজক কিশোরকে পুরো পারিশ্রমিক না দিয়ে শুটিং শুরু করতে বলেন। পরদিন কিশোর এলেন সেটে, গায়ে আধা জামা, মুখে আধা মেকআপ। প্রযোজককে বললেন, ‘আধা টাকা দিলে, আধা কাজই পাবে।’ এমনই ছিলেন তিনি—স্পষ্ট, স্পষ্টবাদী এবং নিজের কাজের প্রতি অসম্ভব শ্রদ্ধাশীল।

কিশোর
৮ হাজার টাকা না পেয়ে সকালবেলা চেঁচিয়ে ডাকতেন প্রযোজককে
এক প্রযোজক তাঁর ৮ হাজার টাকা আটকে রেখেছিলেন। বহুবার বলেও কোনও লাভ হয়নি। তখন কিশোর রোজ সকালে গিয়ে প্রযোজকের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতেন, “তলওয়ার! দে দে মেরে ৮ হাজার!” এমন অদ্ভুত অথচ সত্য কাহিনি কেবল কিশোর কুমারই রচনা করতে পারেন।
বাড়িতে ঝুলত খুলি-হাড়!
কিশোর ছিলেন প্রচারে অনিচ্ছুক মানুষ। বাড়িতে যেন কেউ না আসে, তাই গোটা ঘর ভর্তি করে ফেলেছিলেন হাড়, খুলি আর লাল আলো দিয়ে! ড্রয়িংরুম থেকে শোবার ঘর—সবখানেই সেই ভৌতিক আবহ। ভয় পেয়ে সাংবাদিকরা আর যেতেন না তাঁর বাড়ি, অফিসেই সাক্ষাৎকার নিতে চাইতেন।

কিশোর কুমার
মৃত্যুর দিনই স্ত্রীর সঙ্গে করলেন মৃত্যুর প্র্যাঙ্ক
শেষ ঘটনাটি যেন সিনেমার চেয়েও বেশি সিনেমাটিক। স্ত্রী লীনা চন্দ্রভর্করের সঙ্গে কথা বলছিলেন কিশোর, হঠাৎ বললেন, “ডাক্তার ডাকলে আমি হার্ট অ্যাটাকে মরে যাব।” তখন হালকা কিছু উপসর্গ ছিল বটে, কিন্তু সেটা নিয়েই হাসি-ঠাট্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু আচমকা, লীনার সামনে হঠাৎ লুটিয়ে পড়লেন। লীনা ভেবেছিলেন, এও বুঝি প্র্যাঙ্ক! কিন্তু কিশোর উঠলেন না। পুত্র অমিত কুমার পরে বলেন, “বাবার একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ছিল। নিজের মৃত্যুকেও যেন আগেই জেনে গিয়েছিলেন।”
কিশোর কুমার ছিলেন বোহেমিয়ান, অকপট, স্পষ্টবাদী এবং চিরসবুজ। তিনি জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত বাঁচতেন নিজের মতো করে—ভয় না পেয়ে, থেমে না গিয়ে। তিনি চলে গেলেও তাঁর গানে, গল্পে, স্মৃতিতে তিনি রয়ে গেছেন। আর থাকবে… হাসি, কান্না ও ভালোবাসা।