অমিত কুমার কলকাতার দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাঁর কন্যা মুক্তিকা গাঙ্গুলি। মঞ্চে এসেই বাবা অমিত কুমারের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন মুক্তিকা।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 3 August 2025 20:13
'হাওয়ায়, মেঘ সরায়ে, ফুল ঝরায়ে
ঝিরি ঝিরি এলে বহিয়া
খুশিতে ভরেছে লগন
আজ ওঠে মন ভরিয়া...'
৪ অগস্ট কিশোর কুমারের জন্মদিন। তাঁর মৃত্যু নেই, তিনি যে চিরকিশোর। বাবাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে অমিত কুমার ও তাঁর মেয়ে মুক্তিকা গাঙ্গুলি কলকাতা এলেন গান শোনাতে। কলকাতার দর্শক সাক্ষী থাকল এক ধামাকাদার সন্ধ্যার। তবে ধামাকার মাঝেও অমিত কুমার বুনে দিলেন এক মায়াবী সন্ধ্যা।
গত ৩১জুলাই বৃহস্পতিবার নজরুল মঞ্চে 'জীবন কী হার মোর পে' শীর্ষক অনুষ্ঠানে কিশোর কুমার ও আশা ভোঁসলেকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একের পর এক ধামাকাদার পারফরমেন্স করলেন অমিত কুমার। কে বলবে তাঁর বয়স ৭৩ বছর! সঙ্গে কলকাতার দর্শক প্রথম বার গান শুনল কিশোর কুমারের নাতনি মুক্তিকা গাঙ্গুলির।
এদিনের অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল একেবারে সঙ্গীতের মহল। সবথেকে নজর কাড়ল মঞ্চের পর্দায় গানের সঙ্গে ভেসে উঠল একের পর এক বাংলা হিন্দি ছবির দৃশ্য। কখনও হেমা মালিনী, কখনও রেখা, কখনও দেব আনন্দ, কখনও অমিতাভ বচ্চন বা রাজেশ খান্না। সাত আটের দশকে পৌঁছে গেলেন দর্শকরা।
এতদিন পর কিশোর পুত্র কলকাতাতে পারফরম্যান্স করতে আসায় হলে তিলধারণের জায়গা ছিল না। অমিত কুমার মঞ্চে ঢুকতেই তাঁকে স্ট্যান্ডিং অবেশন দিয়ে সম্মান জানালেন সমস্ত দর্শক। ভরাট কণ্ঠে 'মেরে মেহবুব' অমিত কুমার গাইতেই যেন কিশোর কুমারকে চাক্ষুষ করল দর্শকরা। তারপরই শচীন দেব বর্মণের সুরে 'প্রেম পূজারী' ছবির গানে মাত করলেন তিনি। এমনকি শচীন কর্তার গলা নকল করেও দেখালেন অমিত কুমার। অমিত কুমার মানেই আজও টোটাল পারফরম্যান্স প্যাকেজ। মঞ্চে ঢুকতেই তিনি বেল্ট পরে আসেননি বলে মজার কান্ড ঘটালেন। দর্শক আসন থেকে অনেকেই বললেন 'আপনার বাবাও একবার কলকাতার মঞ্চে গাইতে এসে শাড়ি পরে মঞ্চে উঠেছিলেন।

কিশোর কুমার পরিচালিত অভিনীত সুরারোপিত ছবি ছিল 'দূর গগন কী ছাঁও ম্যায়'। কিশোর অমিত কুমার এই ছবিতে নায়িকার চরিত্রে সুপ্রিয়া দেবীকে নিয়েছিলেন। আর কিশোরের ছেলের ভূমিকাতেই অভিনয় করেছিলেন কিশোর অমিত কুমার। সেই ছবিতে বাবার গানও শোনালেন অমিত কুমার। এ যেন ৭৩ বছরের অমিত কুমারের ছোটবেলায় ফিরে যাওয়া। মঞ্চে গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে অমিত কুমার বারবার বাবার ছবিতে প্রণাম করছিলেন। তিনি বললেন 'বাবার এই ছবি সোনু নিগম, বাবুল সুপ্রিয় কত শিল্পী নিয়ে গিয়ে তাঁদের বাড়িতে রেখে দিয়েছেন। এটাই তো বাবাকে ভালবাসা। বাবা আজ সবার।
'এক ম্যায় অউর এক তু', 'ইয়ে রাতে ইয়ে মৌসম' একের পর এক গানে মাত করলেন তিনি। তবে সবথেকে মাতিয়ে দিলেন 'ইনা মিনা ডিকা' গানে।
জরা আজও অমিত কুমারের কণ্ঠকে স্পর্শ করেনি। তিনি আজও প্রাণশক্তিতে চিরতরুণ। তাঁর বয়সী কজন শিল্পী মঞ্চে নেচে গেয়ে পারফর্ম করতে পারেন?
এরপর অমিত কুমার কলকাতার দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাঁর কন্যা মুক্তিকা গাঙ্গুলি। মঞ্চে এসেই বাবা অমিত কুমারের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন মুক্তিকা। কিশোর কুমার ও রুমা গুহঠাকুরতার নাতনি মুক্তিকা গাঙ্গুলি কলকাতার দর্শকের জন্য গাইলেন 'প্রথম কদম ফুল' ছবির আশা ভোঁসলের সেই গান 'কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে'। মুম্বইয়ে বেড়ে ওঠা মুক্তিকা হিন্দি ভাষাতেই অভ্যস্ত। কিন্তু মাতৃভাষাকে সম্মান দিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে গাইলেন সুধীন দাশগুপ্তর সুরের কালজয়ী বাংলা গানটি। দর্শক আসন থেকে ধন্যি ধন্যি পড়ে গেল। এরপর ঠাকুরদা কিশোর কুমারের হিন্দি গানেও শ্রদ্ধা জানালেন মুক্তিকা।
তবে পিতা-পুত্রীর মাঝে আরও বাকি শিল্পীরাও জমিয়ে দিলেন অনুষ্ঠান। কিশোর সোধা, আইকনিক ট্রাম্পেট প্লেয়ার লাইভ পারফর্ম করলেন। যিনি আর ডি বর্মণের সঙ্গেও বাজিয়েছিলেন। 'এই যে নদী যায় হারিয়ে' গানের সুর বাজিয়ে মুগ্ধতা তৈরি করলেন তিনি।

আরও বেশ কিছু গায়ক-গায়িকা নজর কাড়লেন শৈলজা সুব্রমনিয়ামের নাম প্রথমেই বলতে হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই 'আগে ভি জানে না তু' গানে স্বর্গীয় মুগ্ধতা তৈরি করলেন তিনি। অমিত কুমারের সঙ্গে আশা ভোঁসলের গানেও শৈলজা দুরন্ত। অলোক গদ্দার কিশোর কুমারের জমাটি গান গেয়ে নজরুল মঞ্চ জমিয়ে দিলেন।
এ দিনের কিশোর স্মরণে দর্শক আসনে এমন এক ঝাঁক বৃদ্ধ ছিলেন যারা আজও কিশোর কুমারের কোনও অনুষ্ঠান ছাড়েন না। হাত তুলে বললেন ১৯৮৬ সালে তখন তাঁরা তরুণ, যখন সল্টলেক স্টেডিয়ামে 'হোপ ৮৬' অনুষ্ঠানে লাইভ কিশোর কুমারের গান শুনেছিলেন। সেই মানুষ গুলোই আজ কিশোর কুমারের নাতনির গান শুনতে গেলেন। এই প্রাণের টানই কিশোর কুমারের জন্মদিনে সবথেকে বড় শ্রদ্ধার্ঘ্য।