Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
‘কোভিড ভ্যাকসিনই হার্ট অ্যাটাকের কারণ!’ শেন ওয়ার্নের মৃত্যু নিয়ে ছেলের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক এবার রক্তদান শিবিরেও কমিশনের ‘নজরদারি’! রক্তের আকাল হলে কী হবে রোগীদের? প্রশ্ন তুললেন কুণালমারাঠি না জানলে বাতিল হবে অটো-ট্যাক্সির লাইসেন্স! ১ মে থেকে কড়া নিয়ম মহারাষ্ট্রেআশা ভোঁসলেকে শ্রদ্ধা জানাতে স্থগিত কনসার্ট, গায়িকার নামে হাসপাতাল গড়ার উদ্যোগউৎসবের ভিড়ে হারানো প্রেম, ট্রেলারেই মন কাড়ছে ‘উৎসবের রাত্রি’‘বাংলাকে না ভেঙেই গোর্খা সমস্যার সমাধান’, পাহাড় ও সমতলের মন জিততে উন্নয়নের ডালি শাহেরথাকবে না লাল কার্ড, খেলা ৫০ মিনিটের! ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করতে ছকভাঙা প্রস্তাব নাপোলি-প্রধানেরনতুন সূর্যোদয়! নীতীশের ছেড়ে যাওয়া মসনদে সম্রাট চৌধুরী, প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী পেল বিহারমাত্র ৫০০ টাকার পরীক্ষা বাঁচাবে কয়েক লাখের খরচ, কেন নিয়মিত লিভারের চেকআপ জরুরি?অভিষেক ও তাঁর স্ত্রীর গাড়িতে তল্লাশির নির্দেশ! কমিশনের ‘হোয়াটসঅ্যাপ নির্দেশ’ দেখাল তৃণমূল

অপর্ণার বয়স বাড়ে ক্যালেন্ডারে, শিল্পের আঙিনায় আজও তিনি চিরচঞ্চল মৃণ্ময়ী

২৫ অক্টোবর, ২০২৫। সেই মাইফলক স্পর্শ করলেন অপর্ণা সেন। আশি বছর পূর্ণ করলেন তিনি। কিন্তু অপর্ণা সেন কি বৃদ্ধ হতে পারেন কখনও? ভুল করেও?

অপর্ণার বয়স বাড়ে ক্যালেন্ডারে, শিল্পের আঙিনায় আজও তিনি চিরচঞ্চল মৃণ্ময়ী

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন

শেষ আপডেট: 25 October 2025 20:51

শমীক ঘোষ

ষাট যদি হয় বার্ধক্যের শৈশব, আশি তবে নিশ্চিন্তে তার প্রৌঢ়ত্ব। বয়সের এমন এক মাইলফলক যা পেরোলে নিশ্চিন্তে বুড়ো বলে দেগে দেওয়া যায়। অশীতিপর শব্দটাই যেন ভদ্রতার আড়াল রেখে হয়ে ওঠে অতিবৃদ্ধের সমার্থক (Aparna Sen Birthday)।

২৫ অক্টোবর, ২০২৫। সেই মাইফলক স্পর্শ করলেন অপর্ণা সেন (Aparna Sen)। আশি বছর পূর্ণ করলেন তিনি। কিন্তু অপর্ণা সেন (Aparna Sen Birthday) কি বৃদ্ধ হতে পারেন কখনও? ভুল করেও?

ভণিতাহীন, অকপট

সত্তর সালে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের (Sunil Ganguly) উপন্যাস নিয়ে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ (Aranyer Din Ratri) ছবি করেছিলেন সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray)। সেখানে ছোট্ট একটা সিন ছিল অপর্ণার (Aparna Sen 80th Birthday)। শমিত ভঞ্জ অভিনিত ‘হরি’-র বান্ধবী। হরিকে যে নাকচ করেছে। নাকচ করার কারণ হরির লেখা একটা চিঠি। প্রায় প্রফেটিক দক্ষতায় অপর্ণা অভিনীত চরিত্রটির মুখে আশ্চর্য এক সংলাপ বসিয়েছিলেন সত্যজিৎ। ‘অমন একটা চিঠি যে লেখে, তাকে কি ভালবাসা যায়?’

ন্যাকামো নেই। ভণিতা নেই। অকপট। প্রত্যাখানের কারণ অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক নয়। এমনকী শারীরিকও নয়। বরং নিছকই একটা চিঠিতে ভাবপ্রকাশের মধ্যে দিয়ে মানসিক তফাতের প্রকাশ। অসম্ভব সেরেব্রাল। অসম্ভব ইন্টেলেকচুয়াল।

সাতের দশকের ছবি। সেই সময় সবে অন্দরমহলের বদ্ধ ছৌখুপি ছাড়িয়ে ভারতীয় তথা বাঙালি নারীর বাইরে বেরিয়ে আসাটা সামাজিক দস্তুর হয়ে উঠছে। এখনকার মতো নারী-পুরুষের সমানাধিকারের প্রসঙ্গও জাঁকিয়ে বসেনি জনমানসে। পশ্চিমের ফেমিনিস্ট আন্দোলনের মৃদু তরঙ্গ শুধু স্পর্শ করেছে শিক্ষিত সমাজকে।

তেমন এক সময়ে, এই সংলাপ যেন আসলে নারীমনের গভীর অন্তরমহল থেকে উঠে আসা। আইকনিক। ঠিক একই রকম প্রফেটিক অপর্ণার প্রথম অভিনয়– সত্যজিৎ রায়েরই ‘তিনকন্যা’-র ‘সমাপ্তি’-ও। এখানে ‘মৃণ্ময়ী’ চরিত্রে অপর্ণার ইন্ট্রোডাকশান ক্লোজ আপে। আটপৌরে শাড়ি পড়া মৃণ্ময়ী, নদীর ঘাটে আখ চিবোচ্ছে নির্বিকারভাবে। নৌকা থেকে নামতে গিয়ে কাদায় পিছলে অমূল্যের পড়ে যাওয়া দেখেও সে হেসে ফেলে অকপটে। পুরুষতন্ত্র তাকে নিয়ে কী ভাবল, কী ভাবল না, তা নিয়ে কোনও চিন্তা নেই তার। সে যা, সে ঠিক তাই-ই।

আবার সেই অমূল্যরই জুতো সরাতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার পর, দুরন্ত, ডানপিটে, ‘পাগলি’ সেই মৃণ্ময়ী ছুট দেয় কাদা মাখা রাস্তায়। ছুটতে ছুটতে আছাড় খায় বারবার। থামে না। ছুটে যায় ঠিক। এই ছুটে যাওয়া পালানো নয় আসলে। এ আসলে নারীর নিজেকেই আবিষ্কার। তার এই ছুটে যাওয়া যেন নিজেরই দিকে।

বিয়ের পর মৃণ্ময়ীর এই ডানপিটেপনাই তাকে আলাদা করে দেয় অমূল্যর থেকে। কিন্তু ছবির শেষে, গাছ বেয়ে অমূল্যরই ঘরে ফিরে আসে মৃণ্ময়ী। তার এই ফিরে আসার কারণ বিস্মিত অমূল্যকে সে জানায় ছোট্ট  সংলাপে। ‘আমার ইচ্ছে!’

দুটো শব্দ। কিন্তু তার মধ্যেই যেন ধরা রয়েছে নারীর আত্ম-উপলবব্ধির, আত্ম-স্বীকৃতির সম্পূর্ণ উপাখ্যান।

আর্মি ক্যান্ডি নয়, নারীর স্বকীয় স্বর

বাবা স্বনামধন্য চিদানন্দ দাশগুপ্ত। অপর্ণা নিজেও ভর্তি হয়েছিলেন সেই সময়কার প্রেসিডেন্সি কলেজে। কাজ শুরু করেছেন খোদ সত্যজিতের সঙ্গে। তিনি তো চাইলেই এড়িয়ে যেতে পারতেন বাংলা বাণিজ্যিক ছবিকে। কিন্তু সেখানেও নিজের আলাদা নিশ তৈরি করে নিলেন অপর্ণা। তাঁর পরিশীলিত উচ্চারণ, তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তি, মেধাবী অভিনয় দিয়ে।

বাংলা সিনেমার গদগদ, ‘ছবির ফ্রেম সাজানো’ হিরোইন মোটেই হতে চাননি অপর্ণা। বরং অন্যরকম চরিত্র নিয়ে বারবার আলাদা করেছেন নিজেকে।

রমাপদ চৌধুরী উপন্যাস নিয়ে তপন সিনহার ছবি ‘এখনই’-তে যেমন। এই ছবিতে অপর্ণা সমকালীন এক তরুণী ‘ঊর্মি।’ প্রাক-বৈবাহিক সম্পর্কে জড়িয়ে অন্তঃস্বত্ত্বা। তাকে ছেড়ে তার প্রেমিক চলে গেছে বিদেশে। ভ্যাদভ্যাদে মেলোড্রামায় না গিয়ে, ঊর্মি নিজেই সিদ্ধান্ত নেয় বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে গর্ভপাত করানোর। এমন অবস্থাতেও বন্ধুর থেকে বিবাহ প্রস্তাব পেয়ে প্রথমে রাজি হয় না ঊর্মি। সে কারও অনুকম্পার পাত্রী হতে রাজি নয়।

মাত্র কয়েক দশক আগেও এমন চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হতেন না অনেক অভিনেত্রীও। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে ‘খারাপ’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে। কিন্তু অপর্ণা অকুতোভয়।

উত্তমকুমারের সঙ্গে অভিনীত ‘এখনই পিঞ্জর’ ছবিতে আবারও ‘খারাপ’ মেয়ের চরিত্রে অপর্ণা। এমন এক মেয়ে যে পরিবারের দুরবস্থায় সংসার চালাতে স্মাগলিং করতেও পিছপা হয় না।

আবার সেই উত্তমকুমারের সঙ্গেই ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’ ছবির অনুসরণে বানানো ‘জয়জয়ন্তী’ ছবিতে শিক্ষিত, রুচিশীল এক তরুণীর চরিত্রে অপর্ণা। যিনি গভর্নেস হিসেবে কাজ করতে গেছেন এক ধনী পরিবারে। পরিবারের কর্তার কঠোর অনুশাসন। নতুন গভর্নেসকে মেনে নিতেও রাজি নয় বাচ্চারা। অথচ তাদের ‘বুলি’ সামলে কঠোর অনুশাসনের বদলে ভালবাসা দিয়ে মন জিতে নেয় সে। এও যেন নারীরই অন্য এক রূপ। যে হার মানে না কিছুতেই। বরং মমতা ও স্নেহ দিয়ে বদলে দিতে পারে অনেক কিছুই।

অপর্ণা সেন বললেই যে ছবি সব বাঙালির চোখে ভাসে তার নাম ‘বসন্ত বিলাপ।’ রোম্যান্টিক কমেডি এই ছবিতেও অপর্ণা এক আদ্যন্ত মডার্ন মেয়ে। যে পুরুষের প্রেমে গদগদ হয়ে ভেসে যায় না। বরং সমানে সমানে টক্কর দেয় তার সঙ্গে।

সাতের দশক। সিনেমার পর্দা থেকে তখনও স্বেচ্ছা-নির্বাসন নেননি সুচিত্রা সেন। বাংলার হিরোইন বললেই ভেসে আসে ‘এক সে বড়কর এক’ নাম। অথচ তার মধ্যেও নিজের জায়গা করে নিয়েছেন অপর্ণা সেন। বোধহয় সাতের দশকের বাংলা ফিল্মের নায়িকাদের মধ্যে সেরা হয়ে। হিরোর আর্ম-ক্যান্ডি হিসেবে নয়, বরং নারীর নিজস্ব আইডেন্টিটি খোঁজার প্রতিনিধি হয়ে। সত্তর-আশি দশকের স্বকীয় পরিচিত খুঁড়তে চাওয়া বাঙালি নারী তাঁর আয়নাতেই দেখতে চেয়েছে নিজেকে। বাণিজ্যিক মাস-মিডিয়ার জগতেও অপর্ণা তাঁর আইডেন্টিটি তৈরি করেছেন তাঁর বিপ্রতীপে গিয়ে। তাঁর অ্যাপিল হয়ে উঠেছে ইন্টেলেকচুয়াল।

কৌমের বিরুদ্ধে একা

এই সহস্রাব্দের দোড়গোড়ার কথা হবে সেটা। ২০০০ সালের আশপাশে। ততদিনে বদলাতে শুরু করেছে ভারতবর্ষ। সহনশীলতাকে পুণ্য নয়, পাপ বলে ভাবতে শেখাচ্ছে রাজনীতি। দেশ তখন উত্তাল মকবুল ফিদা হোসেনকে নিয়ে। শিল্পী কি পারেন কৌমের বিশ্বাসকে আঘাত করতে!

মনে আছে, সেই সময় ‘দেশ’ পত্রিকায় শিল্পী স্বাধীনতা নিয়ে এক মনোজ্ঞ প্রবন্ধ লিখেছিলেন অপর্ণা। উপনিষদের শ্লোক থেকে খুঁড়ে বার করেছিলেন শিল্পী স্বাধীনতার কথা। কবি তো দ্রষ্টা। তাঁকে বেঁধে দিলে সমাজও বেঁধে যায়। বহতা নদীর মতো জঙ্গম নয়, হয়ে যায় ডোবার মতো বদ্ধ।

যিনি নিজে শিল্পী, যিনি নিজে প্রশ্ন করেন সমাজকে তাঁর একথাই তো মনে হবে বারবার। কিন্তু সিনেমা তো কৌমের শিল্প। একজন অভিনেতা, তিনি যতই অসাধারণ হোন না কেন, অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর কথা বলার পরিসর সেখানে সীমিত। তিনি বড়জোড় তাঁর পছন্দসই চরিত্র বেছে নিতে পারেন। অভিব্যক্তিতে, অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলতে পারেন তাঁর বোধ। কিন্তু নিজের কথা? নিজের কথা তিনি বলবেন কী ভাবে?

আটের দশকের দোড় গোড়ায় তাই তাঁর প্রথম ছবি ‘থার্টি সিক্স চৌরঙ্গী লেন’ পরিচালনা করলেন অপর্ণা। এই ছবির কেন্দ্রে এক বয়স্ক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলা। ভায়োলেট স্টোনহ্যাম। শেক্সপিয়র পাগল ভায়োলেট যেন বাতিল হয়ে গেছে বদলে যাওয়া কলকাতায়। ইংরেজদের হাত ধরে বড় হওয়া যে শহর তাঁর ইংরেজ পরিচয় মুছে ফেলছে আস্তে আস্তে। সেই শহরেই এক বাতিল রেলিক যেন ভায়োলেট।

সিনেমার শেষে এই শহরেই আর এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান রেলিক – ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে একা বসে থাকে ভায়োলেট। সলিলকির মতো উচ্চারণ করে শেক্সপিয়রের কিং লিয়ার। ‘I am a very foolish fond old man, Fourscore and upward, not an hour more nor less. And to deal plainly I fear I am not in my perfect mind.’

এই ছবি যেন এই বদলে যাওয়া শহরের পাশে দাঁড়িয়ে আত্ম-পরিচয় খোঁজা। এমন এক মানুষের, যে ভীষণ একা। আবার তার সেই আইডেন্টিটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার নারী স্বত্ত্বা। আটের দশকের দোরগোড়ায়, লিবারেলাইজেশানের ঠিক আগে, পতনশীল সমাজতন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে যেমন আইডেন্টিটি খুঁজছিল চিন্তাশীল মানুষেরা। যেমন আটের দশকের দোড়গোড়া আত্মসচেতন নারীরা আত্মপরিচয় খুঁজছিল।

শেক্সপিয়রের কিং লিয়ারের এই উচ্চারণ আত্মোপলব্ধির। আঘাত পেতে পেতে খুঁজে পাওয়া নিজস্ব বোধের। নিজের সেই বোধকেই কি ব্যক্ত করছিলেন অপর্ণা? গল্প বলিয়ে হিসেবে?

আমার তো কোনও অপরাধবোধ নেই

‘সমাপ্তি’ যতটা অপর্ণার, তার থেকেও বেশি সত্যজিতের। আর সত্যজিতের মৃণ্ময়ীকে দেখা খোদ রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়ে। ডানপিটে মৃণ্ময়ী যতই ‘আমার ইচ্ছে’ বলুক না কেন, তার সেই ইচ্ছে সমাজের ভাবনার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই। ডানপিটে, দুরন্ত, টমবয় মৃণ্ময়ীর আত্মাবিষ্কার শেষ অবধি পুরুষতন্ত্রের নিয়মের সঙ্গেই খাপে খাপে মিলে হয়তো ‘সমাপ্তি’ সময়ের সঙ্গেই সেটাই যায়।  

কিন্তু অপর্ণার ‘পরমা’ সমাজ তথা পুরুষতন্ত্রের সঙ্গে সেই আপসে যায় না। বরং নিরুচ্চারে নিয়ে যায় আরও ‘বেহিসাবি’ আচরণের দিকে। পরমাকে ভালবাসত তার পরিবারের সবাই। আপাতভাবে যত্নই নিত তার। সেই খাঁচা ভাঙেনি পরমা। তার প্রশ্ন আবারও ভীষণ সেরেব্রাল। ভীষণ ইন্টেলেকচুয়াল। পরমা আসলে নিজেকে অন্য কারও চোখে নতুন করে দেখতে পেয়েছিল। বিবাহিতা মহিলার পরপুরুষের সঙ্গে প্রেম ‘লিবারেশান নয়।’ সংসারের নিগড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলা পরমার কাছে এই সম্পর্ক আসলে এক ব্যক্তিগত বিদ্রোহ। আর সেই বিদ্রোহের মূল্যও চোকাতে হয়েছিল তাকেই।

পরমাকে ‘বাঁচিয়ে দিতে’ চাননি অপর্ণা। বরং ‘মৃণ্ময়ী’-র সেই ‘আমার ইচ্ছে’ এখানে যেন অনেক বেশি তীব্র। নিজের মুছে ফেলার স্বত্ত্বাকে খুঁজে পাওয়ার নিরুপায় প্রয়াস। কিন্তু প্রেমের পরিণতিতে তা শেষ হয় না। শেষ হয় এক অসম্পূর্ণতায়। পরমার মুক্তি তাই নতুন সম্পর্কে নয়। কাজে। চাকরিই খুঁজতে চায় সে। তার ‘নিজের সংসার’-এর বাইরে।

সত্যজিতের ‘সমাপ্তি’  মিলনাত্মক। অপর্ণা শেষ করেন অসম্পূর্ণতায়। ঠিক জীবনের মতোই। নারীর নিজেকে দেখতে চাওয়া আসলে সব সমীকরণই বদলে দেয়। আত্ম-আবিষ্কার ছাড়া তার আর কোনও লাভ নেই।

Fourscore and upward

নিজেকে ফেমিনিস্ট বলেন অপর্ণা সেন। কিন্তু একই সঙ্গে বলেন, তাঁর ছবি আসলে কোনও ইজম্‌-এর নয়। বরং তাঁর গল্প আসলে ব্যক্তির। ব্যক্তি আসলে সিস্টেমেরই অংশ। তাঁর জীবনে মিলিত মিশ্রিত হয় বিভিন্ন রাজনীতি -মতাদর্শ।

পরিচালক অপর্ণাও তাই কখনও ঊনবিংশ শতকের প্রেক্ষিতে পুরুষতন্ত্রের দানবীয় রূপ তুলে ধরতে ‘সতী’ বানিয়েছেন। কখনও আবার সমকালের রাজনীতির কথা বলেছেন ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এ। যেখানে নারী-পুরুষের সম্পর্কে লিঙ্গকে ছাপিয়ে স্পর্শ করেছে মানবিকতা। আবার ‘জাপানিস ওয়াইফ’-এ মানুষের একাকীত্বকে তিনি দেখিয়েছেন অলীক সম্পর্কের প্রেক্ষিতে।

‘থার্টি সিক্স চৌরঙ্গী রোড’-এ ভায়লোট শেষ অবধি কিং লিয়ার আবৃত্তি করেছিল। রাজা লিয়ারের বয়স তখন ফোরস্কোর– আশিই। আশিতে পৌঁছে নতুন করে জীবনকে দেখতে শিখেছিল লিয়ার।

কী আশ্চর্য! আশি পূর্ণ করলেন অপর্ণাও। কিন্তু বৃদ্ধ হলেন কি অপর্ণা?

বৃদ্ধ মানে তো স্থবির। বৃদ্ধ মানে তো শুধুই রোমন্থন। কিন্তু অপর্ণা তো থেমে যাননি। বরং বারবার নিজেকে ভেঙেছেন তিনি। তৈরি করেছেন নতুন স্বকীয় গ্রামার। জীবনেরও। শিল্পেরও। নারীত্বের সীমাকে আবিষ্কার করেছেন নতুন করে। সমাজকে শিখিয়েছেন আত্মপরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা, নারীত্বের ডিকশানে।

রাজা লিয়রের মতোই তিনি যেন অভিজ্ঞতার আগুনে পুড়ে নিজেকেই আবিষ্কার করেছেন নতুন করে। বারবার। এমন মানুষ কি কোনওদিন বুড়িয়ে যেতে পারেন?


```