শুক্রবার সন্ধে সাড়ে ৬টা। চেষ্টা করেও শাবানা আজমিকে (Shabana Azmi) ফোনে পাওয়া গেল না। তবে কলকাতার সাংবাদিক পরিচয় জেনে গীতিকার ও কবি জাভেদ আখতার মুহূর্তে টেক্সট মেসেজের জবাব দিলেন—'আপনি ফোন করতে পারেন’।

ছবি-সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 26 October 2025 13:32
শুক্রবার সন্ধে সাড়ে ৬টা। চেষ্টা করেও শাবানা আজমিকে (Shabana Azmi) ফোনে পাওয়া গেল না। তবে কলকাতার সাংবাদিক পরিচয় জেনে গীতিকার ও কবি জাভেদ আখতার মুহূর্তে টেক্সট মেসেজের জবাব দিলেন—'আপনি ফোন করতে পারেন’।
ব্যস্ত ছিলেন। বললেন, ‘অপর্ণার জন্য একরাশ শুভেচ্ছা। তবে আমি যেতে পারছি না গো। শাবানা যাচ্ছে”।
বাকি কথোপকথন এই প্রতিবেদনের জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। শনিবার ৮০ বছর পূর্ণ হচ্ছে অভিনেতা, লেখক, পরিচালক অপর্ণা সেনের (Aparna Sen 80th Birthday)। সন্ধেয় জন্মদিনের অনুষ্ঠান। আয়োজনে রয়েছেন মেয়ে কঙ্কনা সেন শর্মা। সেই অনুষ্ঠানের জন্যই মুম্বই থেকে আসছেন শাবানা আজমি।
খবর এই টুকুই। আবার বলা যেতে পারে, এ আবার কী খবর! আসল ব্যাপার হল, অপর্ণার আশি বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে শাবানা থাকবেন—এই খবরটুকুই যেন চোখের সামনে কত শত ফ্রেম মেলে ধরে। কত রকমের গল্প, অ্যানোকডোট। পারস্পরিক বন্ধুত্ব, সহযাত্রা ও এক সমান্তরাল ঘটনা প্রবাহ যা শুরু হয়েছিল ৫০ বছর আগে।
১৯৭৪ সাল। পরিচালক শ্যাম বেনেগল (Shyam Benegal) তাঁর প্রথম ছবি অঙ্কুরের (Ankur) ‘লক্ষ্মী’ চরিত্রে প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিলেন অপর্ণা সেনকে। ততদিনে অপর্ণা পরিচিত মুখ—শিশুশিল্পী থেকে সত্যাজিৎ রায়ের ‘সমাপ্তি’-র নায়িকা হয়ে উঠেছেন। ‘লক্ষ্মী’ চরিত্রটি ছিল অন্ধ্র প্রদেশের গ্রামীণ দলিত এক গৃহপরিচারিকার। অপর্ণা পরবর্তীতে বলেছিলেন,“আমি ভয় পেয়েছিলাম চরিত্রটা ঠিকঠাক করতে পারব কি না। তাই না করেছিলাম।”

অপর্ণার এই ‘না’-এর ফলেই চলচ্চিত্রজগৎ পেয়েছিল এক নতুন মুখ—শাবানা আজমি। অপর্ণার বয়স তখন ২৯। শাবানা ঠিক ৫ বছরের ছোট। তাঁর বয়স তখন ২৪। এক তরুণী, যে তখনও গ্রামে পা রাখেননি। অথচ অঙ্কুরে তাঁর অভিনয় বদলে দিয়েছিল হিন্দি সিনেমার গতিপথ। অঙ্কুরের মুক্তির পর শাবানার উত্থান শুধু একজন অভিনেত্রী হিসাবে ঘটেনি, বরং এক প্যারালাল সিনেমা আন্দোলনেরও সূচনা করে দেয়। আর সেই সঙ্গে শুরু হয়ে যায় এক শিল্পী–সম্পর্কেরও, যার অদৃশ্য ডোরে বাঁধা পড়েন অপর্ণা ও শাবানা।

বেশ কয়েকটি ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন অপর্ণা ও শাবানা। ১৯৮৯ সালে অপর্ণা সেন পরিচালনা করেন ‘সতী’ যেখানে শাবানা অভিনয় করেছিলেন ‘উমা’ চরিত্রে। এক মূক বাঙালি তরুণী, যাকে বিয়ে দেওয়া হয় একটি গাছের সঙ্গে। এই ছবির সময়েই তাঁদের বন্ধু সম্পর্ক আরও গভীর হয় বলে জানা যায়। শাবানা নিজের মতো করে চরিত্রটি কল্পনা করেছিলেন, আর অপর্ণা দেখেছিলেন অন্যভাবে। শেষ পর্যন্ত দু’ভাবে শুট করে শাবানাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন অপর্ণা। সেটাই ছিল তাঁদের পেশাদার সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রথম বড় উদাহরণ।

একই বছরে তাঁরা একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন পরিচালক মৃণাল সেনের এর ‘এক দিন আচানক’-–এ (Ek Din Achanak) । এরপর বহু বছর পরে ২০০৫ সালে আবার একসঙ্গে কাজ করেছিলেন ১৫ পার্ক আভেনিউতে ( 15 Park Avenue) । শাবানা সেই ছবিতে পারিশ্রমিক নিতে চাননি। অপর্ণাকে বলেছিলেন, “ভেবে নাও, ভাল সিনেমার জন্য এটা আমার অবদান” ।
পরে ২০১৭ সালে আবার তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেন সোনাটা (Sonata) ছবিতে। অপর্ণার জেদে, তাঁর উৎসাহে এই ছবিতে শাবানাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেও দেখা যায়। শাবানা পরে মজা করে বলেছিলেন, “ওই দুই মিনিটই আমার জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং শট ছিল।”
অপর্ণা-শাবানার সম্পর্ক শুধুমাত্র পর্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পেশাগত সাফল্য, মতভেদ, এমনকি জীবনের কঠিন সময়েও তাঁরা ছিলেন একে অপরের পাশে। অপর্ণা বহুবার বলেছেন, শাবানার অভিনয়শৈলী তাঁকে মুগ্ধ করে—“ও প্রস্তুতি নেয়, কিন্তু ক্যামেরার সামনে এলে সব ছেড়ে দিয়ে কেবল চরিত্রটাকে বাঁচে।” অপরদিকে শাবানার কথায়, “অপর্ণা পরিচালকের মতো অভিনেতাকে জায়গা দেয়, শোনে, বোঝে। এই বিশ্বাস না থাকলে এই পথ এত দীর্ঘ হতো না।”
এবার সেই বন্ধুর জন্মদিন। আশি পূর্ণ করলেন অপর্ণা। পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ জনের কথায়, শাবানা আজমির আসাটা নিছকই ‘ইনভাইট’ রক্ষা নয়। বলতে পারেন বন্ধুত্বের প্রতি সম্মান, শিল্পীজীবনের এক বন্ধুর পাশে থাকা। আসলে এই সম্পর্কটাও বিরল। ভিন্ন দুই শহর, ভিন্ন দুই ভাষা, তার পরেও দুই শিল্পী তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্ব দিয়ে গড়েছেন এক সেতুবন্ধ।