রিনা আমার প্রায় ষাট বছরের বন্ধু। আমাদের বন্ধুত্ব সময়ের গায়ে লেগে থাকা এক গভীর সম্পর্ক। সম্পর্কের শুরু ছিল পারিবারিক পরিচয় থেকেই।

গ্রাফিক্স-দ্য ওয়াল।
শেষ আপডেট: 25 October 2025 12:33
রিনা আমার প্রায় ষাট বছরের বন্ধু। আমাদের বন্ধুত্ব সময়ের গায়ে লেগে থাকা এক গভীর সম্পর্ক। সম্পর্কের শুরু ছিল পারিবারিক পরিচয় থেকেই। আমার মামা হরিসাধন দাশগুপ্ত (বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা) ছিলেন চিদানন্দ দাশগুপ্তর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। চিদানন্দবাবু, (ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা, চলচ্চিত্র সমালোচক, চলচ্চিত্র ইতিহাসবিদ) অর্থাৎ রিনার বাবা। আমাদের বন্ধুত্বের শুরু, যখন রিনা ‘সমাপ্তি’ ছবিতে অভিনয় করল। মনে আছে, ছবিমুক্তির পর মামা একটি বিশাল পার্টির আয়োজন করেছিলেন। রিনাই ছিল উপলক্ষ্য। তখন রিনার বয়স মাত্র পনেরো-ষোলো। প্রাণবন্ত এক মেয়ে।
সেই শুরু... বন্ধুত্বের রং আরও গাঢ় হয়, ধীরে-ধীরে। তারপর একসঙ্গে কলেজে পড়া, জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে রিনার বিয়ে, ডিভোর্স—সবই দেখেছি কাছ থেকে। কিন্তু এই সমস্ত ঘটনার মাঝেও আমাদের বন্ধুত্ব কখনও শিথিল হয়নি। দৃঢ় হয়েছে। কারণ আমাদের সম্পর্কের ভিতর ছিল সমমনস্কতা, একে অপরের প্রতি সম্মান, নিখাদ ভালোবাসা। হয়তো এগুলো না থাকলে, এত বছরের বন্ধুত্ব শুধু পরিচয়ের গণ্ডিতেই থেকে যেত।
আমরা একসঙ্গে বহু বছর থিয়েটার করেছি। মঞ্চের আলোছায়ার মধ্যে একে অপরকে দেখেছি বেড়ে উঠতে, লড়তে, জয় পেতে। পরে রিনা থিয়েটার থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়—কারণ তখন ওর জীবনে একের পর এক চলচ্চিত্রের প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে। সিনেমার ব্যস্ততা টেনে নিয়েছিল অন্য পথে। কিন্তু বছর কয়েক পর আবার ফিরে এল মঞ্চে। তখনও আমরা পাশাপাশি ছিলাম। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছি, মতভেদ হয়েছে, তর্ক হয়েছে—অনেক সময় রীতিমতো ঝগড়াও। কিন্তু দূরত্ব আসেনি।
আসলে, আমরা দু’জনেই স্বাধীনচেতা, স্পষ্ট কথা বলার মানুষ। সে কারণেই হয়তো অনেকের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে, নিজেদের মধ্যেও হয়েছে। কিন্তু শেষে আমরা সবসময় একে অপরের কাছে ফিরে এসেছি। এই সম্পর্কের ভিতরে কোনও চাওয়া-পাওয়ার হিসেব ছিল না, আজও নেই। অন্য বন্ধুদের মতো পেশাগত কারণে আলাদা হয়ে যাইনি আমরা। কারণ রিনার সঙ্গে আমার এই টান এমনভাবে জুড়ে ছিল, যা সময় বা দূরত্ব কোনও কিছুই নষ্ট করতে পারেনি।

রিনা, নীল ও আমি
আমার জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায় ছিল ছেলের অসুস্থতা, মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ—যে লড়াইয়ে আমি শেষ পর্যন্ত হেরে গিয়েছিলাম। সেই ভয়ংকর সময়ে রিনা ছিল আমার পাশে। ও আমার বাড়িতেই থাকত সে সময়ে। কোন ডাক্তার দেখাব, কখন যাব, কী করতে হবে—সব কিছুই সামলাতো রিনা। আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা থাকতে দেয়নি।
এই কিছুদিন আগে রিনার জীবনে এল এক গভীর শোক। ওর শৈশবের বন্ধু জয়শ্রী দাশগুপ্ত মারা গেলেন। ছ’বছর বয়স থেকে ওরা একে অপরের বন্ধু। জয়শ্রী ছিল আমারও প্রিয়। ওর মৃত্যুতে রিনা একেবারে ভেঙে পড়েছিল। আমি গিয়েছিলাম ওর বাড়ি, পাশে ছিলাম কয়েকটা দিন। দেখেছি, রিনা কেমন করে মানুষের জন্য সব করতে পারে। কেউ অসুস্থ, কেউ কষ্টে আছে—রিনা যেন স্বভাববশতই ঝাঁপিয়ে পড়ে সাহায্য করতে। সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হোক বা দূরের, তাতে কিছু আসে যায় না।
রিনার একটা ‘দোষ’ আছে—ও ভীষণ ভদ্র! আর সে কারণেই আজও একটু মজা করে ক্ষ্যাপাই। ওর মুখে সারাক্ষণ ‘সরি’ আর ‘থ্যাঙ্ক ইউ’। যেন ওর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই দুটি শব্দ। কিছু ঘটলেই—‘সরি!’ বন্ধুরা হাসি পায়, অপেক্ষা করি, কখন রিনা বলবে সেই শব্দটা। ওকে বললে, আবার বলে, ‘এমন করিস না, সরি!’ আমি নিশ্চিত, ওর জীবনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত দুটি শব্দ এই দুটি—‘সরি’ আর ‘থ্যাঙ্ক ইউ’।

ক্যাফের আড্ডায় আমি-রিনা
আজ রিনার জন্মদিন। আশিতে পা দিল ও। একটা ভাল মানুষের জন্মদিন। ভাল মানুষ হওয়া সহজ নয়, কিন্তু রিনা পারে—কারণ ওর মধ্যে রয়েছে সব প্রয়োজনীয় গুণ। স্বাধীনচেতা, দৃঢ়, আবার তেমনই স্পষ্ট। নিজের মতো করে বাঁচতে জানে, নিজের মতো করে জীবনকে গড়ে তুলেছে। আমার জীবনে রিনা এক বিশেষ জায়গায় রয়েছে—আত্মার কাছাকাছি এক জায়গায়।
ও আজ আশিতে, আমি পরের বছর হব। বয়স হচ্ছে আমাদের, কিন্তু মনে প্রাণে আমরা এখনও সেই আগের মতোই—একজন আরেকজনের পাশে, হাসিতে, কান্নায়, জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে। শুধু চাই, রিনা যেন নিজের শরীরের যত্ন নেয় আরও একটু, নিজের জন্য সময় রাখে। আর হ্যাঁ—আরও অনেক ভাল কাজ করুক, যেমন সবসময় করে এসেছে।
আজ সন্ধেবেলায় দেখা হবে আমাদের। রিনার আশি বছরের গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন। কঙ্কনা, ডোনা থাকবে—আর আমরা, যারা ওকে ভালোবাসি। প্রিয় বন্ধুর জন্মদিনে গিয়ে আমি আবার একবার বলব, “তুই আমার দেখা অন্যতম ভাল মানুষ, রিনা।”
একটা আলো আছে রিনার মধ্যে—যে আলো শুধু তার নিজের জীবনের নয়, আমাদের মতো বন্ধুদের জীবনেও আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। সেই আলো যেন জ্বলতে থাকে আরও বহু বছর...।