সৌমিত্র সেই নায়ক, যিনি মানিকদার ক্যামেরার লাইট, সাউন্ড, অ্যাকশনের বাইরেও অসংখ্য ভাল ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং সুনাম কুড়িয়েছেন। ছবি হিটও হয়েছে।

সৌমিত্রকে অনেকে সত্যজিৎ রায়ের ‘মানসপুত্র’ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন।
শেষ আপডেট: 19 January 2026 13:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যেন ঠিক ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের মতো লড়াই। বাংলা ছবির জগতে উত্তম বড়, না সৌমিত্র বড় নায়ক! এ বিতর্ক এ পর্যন্ত চলে এসেছে। যে মীমাংসা হয়তো বঙ্গ ছবির ইতিহাসে কোনওদিন নিভবে না। সৌমিত্রকে অনেকে সত্যজিৎ রায়ের ‘মানসপুত্র’ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন। যে তকমা থেকে কোনওদিন বেরতে পারেননি পুলু (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ডাকনাম, যা সকলেই জানেন)। তবে এটা ঠিক যে, সৌমিত্র সেই নায়ক, যিনি মানিকদার ক্যামেরার লাইট, সাউন্ড, অ্যাকশনের বাইরেও অসংখ্য ভাল ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং সুনাম কুড়িয়েছেন। ছবি হিটও হয়েছে। যার মধ্যে একটি হল— বসন্ত বিলাপ।
শুধু বসন্ত বিলাপ নয়, সৌমিত্র অভিনয় করেছেন সুচিত্রা সেন, মাধবী, শর্মিলা ঠাকুর, তনুজা, অপর্ণা সেন সহ বহু মানীগুণী অভিনেত্রীর সঙ্গে। বাংলার অনেক নায়করাই নাট্যমঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করতেন। সৌমিত্রর অভিনয় জীবন মঞ্চের নাটক ছাড়িয়েও সে কালের প্রতিষ্ঠিত ব্যানার আকাশবাণীতেও শ্রুতিনাটকে ছড়িয়ে ছিল। তিনি কর্মজীবন শুরুই করেছিলেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ঘোষক হিসেবে। সৌমিত্র অভিনয় ছাড়াও ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ।
সৌমিত্রর শরীরে ছিল বাংলাদেশের কুষ্ঠিয়ার রক্ত। পরবর্তীতে তাঁরা পাকাপাকিভাবে কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা হন। সেখানে স্কুল জীবন কাটিয়ে মহানগরে এসে বাকিটা পড়াশোনা করেন। বাংলা সাহিত্যে এমএ পাশ করেন। সত্যজিৎ রায় সৌমিত্রকে বাংলা ছবিতে হাতেখড়ি দেন একথা ঠিকই। কিন্তু, সে ছবি কতজন দেখে! ওইসব ছবি পুরস্কার পায়, বোদ্ধাদের সমাদর পায়। কিন্তু, সংসার চালানোর মতো রোজগার হয় না। তাই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নেমে পড়েন বাণিজ্যিক ছবিতেও। পাশাপাশি চলতে থাকে সত্যজিৎ রায় ছাড়াও অসংখ্য গুণী পরিচালকদের সঙ্গে কাজ।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বাবা মোহিত চট্টোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী৷ বাবার বদলির চাকরি হওয়ায় জীবনের প্রথম দশ বছর কৃষ্ণনগরে কাটলেও পরে কখনও বারাসত, কখনও হাওড়া, দার্জিলিঙে তাঁর শিক্ষাজীবন কাটে৷ তবে গোড়ার দিকে কৃষ্ণনগরের সিএমএস সেন্ট জনস স্কুলে (খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল) পড়তেন৷ পরে বাবা বদলি হয়ে হাওড়ায় এলে সৌমিত্র ভর্তি হন হাওড়া জেলা স্কুলে৷ বাড়িতে বই পড়া, আবৃত্তি চর্চার রেওয়াজ ছিল৷ যা তাঁর শৈশব ও কৈশোর মনকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে৷ সাহিত্যের প্রতি সৌমিত্রের অনুরাগ তৈরি হয় তখন থেকেই৷ নিজেই সে কথা স্বীকার করে বলেছেন— ‘‘আমি যখন খুব দুরন্তপনা বা বেয়াড়াপনা করতাম তখন শাসনের চেয়ে যাতে বেশি কাজ হত তা হল একখানা বই দিয়ে আমাকে বসিয়ে দেওয়া৷’’
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বইপড়ার অভ্যাসও বেড়ে যায় সৌমিত্রের৷ কৈশোর থেকেই রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল খুব বেশি৷ মা আশালতা রবীন্দ্রনাথের কবিতা শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন বালক সৌমিত্রকে৷ সঙ্গে বাবাও শোনাতেন রবীন্দ্র কবিতার আবৃত্তি৷ এ সমস্ত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পরবর্তী সময়ে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উচ্চারণের অধিকারী বা ‘বাচিক’ শিল্পে অদ্বিতীয় করে তুলেছিল৷ হাওড়ার পঞ্চাননতলার ভাড়া বাড়িতে বসত সাহিত্যের আসর৷ খুদে সাহিত্যিক হিসেবে নিয়মিত সেই আসরে যোগ দিতেন সৌমিত্র৷ স্বরচিত কবিতাগুলি তিনি পাঠ করতেন সেখানে৷ সৌমিত্র কবিতা লেখা শুরু করেন কৈশোর থেকেই৷ তখন তাঁর ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড এবং আইডল ছিলেন গৌরমোহন মুখোপাধ্যায়৷ গৌরমোহনের পর যাঁর উৎসাহ ও উদ্দীপনায় সৌমিত্রের কবিতা লেখা চলেছিল পূর্ণমাত্রায়, তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়৷ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেরণাতেই সৌমিত্রের প্রথম কবিতার বই বেরোয় ১৯৭৫ সালে৷
শিশিরকুমার ভাদুড়ীর থিয়েটার দেখতে দেখতে অভিনেতা হওয়ার সুপ্ত বাসনা জেগে ওঠে সৌমিত্রের মনে৷ তখন থেকেই নাটক, নাট্যতত্ত্ব, নাট্যশালা, অভিনয় ইত্যাদি নিয়ে পড়াশোনার দিকে ঝোঁকেন সৌমিত্র৷ পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রাভিনয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে থাকলেও সমান গুরুত্বে অভিনয় করে গেছেন অর্ধশতাধিক নাটকে৷ মাঝে মাঝেই ফিরে যেতেন থিয়েটারের মঞ্চে৷ নিজের প্রযোজনায় করেছেন— ‘ঘটক বিদায়’, ‘রাজকুমার’, ‘ফেরা’, ‘নীলকণ্ঠ’, ‘ন্যায়মূর্তি’, ‘টিকটিকি’, ‘দর্পণে শরৎশশী’, ‘হোমাপাখি’, ‘বিল্বমঙ্গল’, ‘আরোহন’, ‘প্রাণতপস্যা’ ইত্যাদি জনপ্রিয় কাজগুলি৷
সত্যজিৎ রায়ের পাশাপাশি মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, অসিত সেন, অজয় কর, তপন সিংহ, গৌতম ঘোষ, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলা চলচ্চিত্রের দিকপাল পরিচালকদের ছবিতেও একের পর এক সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করে গিয়েছেন সৌমিত্র৷ অভিনয় জীবনে সৌমিত্রের উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি— ‘অতল জলের আহ্বান’ (১৯৬২), ‘কিনু গোয়ালার গলি’ (১৯৬৪), ‘মহাশ্বেতা’ (১৯৬৭), ‘প্রথম কদম ফুল’ (১৯৬৯), ‘আলেয়ার আলো’ (১৯৭০), ‘স্ত্রী’ (১৯৭২), জীবন সৈকতে (১৯৭২), ‘বসন্তবিলাপ’ (১৯৭৩), ‘ছুটির ফাঁদে’ (১৯৭৫), ‘গণদেবতা’ (১৯৭৮), ‘প্রতিশোধ’ (১৯৮১), কোনি (১৯৮৪) ‘আতঙ্ক’ (১৯৮৬), ‘কাকাবাবু হেরে গেলেন’ (১৯৯৫), ‘লাঠি’ (১৯৯৬), ‘বাবা কেন চাকর’ (১৯৯৮), ‘অসুখ’ (১৯৯৯), ‘হেমলক সোসাইটি’ (২০১২), ‘বেলাশেষে’ (২০১৫), ‘পোস্ত’ ‘সমান্তরাল’ (২০১৭), ‘সাঁঝবাতি’ (২০১৯), ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ (২০২০) ইত্যাদি৷
মহানায়ক উত্তমকুমারের সঙ্গে সৌমিত্রের ছবিগুলিও একসময় পাল্লা দিয়ে উঠতে থাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে৷ তৈরি হতে থাকে উত্তম যুগের সমান্তরাল সৌমিত্র যুগও৷ উল্লেখ্য, অপরিচিত (১৯৬৯), ‘দেবদাস’ (১৯৭৯), ‘ঝিন্দের বন্দি’ (১৯৬১), স্ত্রী (১৯৭২) ছবিতে সৌমিত্রের অভিনয় সমান পাল্লা দিয়েছে উত্তমকুমারের অভিনয়ের সঙ্গে৷ বিশেষ করে ঝিন্দের বন্দি ও স্ত্রী ছবিতে দুজনের দক্ষতা সমান উচ্চতা নিয়েছে।
১৯৮৮ সালের জানুয়ারি মাস। বাংলার অন্যান্য জায়গার মতো ধান্যকুড়িয়া গ্রামেও শীত পড়েছে। কিন্তু কেউই প্রায় জবুথুবু হয়ে বসে নেই। সবার মধ্যেই একটা চাপা উত্তেজনা। কী এমন ঘটল গ্রামে? একটু পরেই বোঝা গেল আসল ঘটনা। ওই যে দেখা যাচ্ছে শুটিংয়ের দল। একটি সিনেমার জন্য তারকাদের ভিড় জমেছে গ্রামে। তাও যে সে সিনেমা নয়, ফরাসি সিনেমা। শাবানা আজমি, সুপ্রিয়া ঘটকদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন ব্রিটিশ অভিনেতা হিউ গ্রান্টও। আর তাঁদের মাঝে…ওই যে ফেলুদা! সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে চিনতে এতটুকুও দেরি করেনি গ্রামের মানুষ। সত্যজিতের পরিচালিত ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। সেইসঙ্গে অন্যান্য বাংলা ছবি তো আছেই।
মির্চা এলিয়াদের লেখা ‘লা নুই বেঙ্গলি’ বইটি আমাদের সকলেরই অত্যন্ত পরিচিত। সেখান থেকেই ফরাসি পরিচালক নিকোলাস ক্লটস তৈরি করলেন নিজের পরবর্তী সিনেমার চিত্রনাট্য। সিনেমার নাম ‘দ্য বেঙ্গলি নাইট’। তিরিশের দশকের এক বিদেশি ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে এক বাঙালি তরুণীর প্রেমের গল্প। মূল নায়ক অ্যালানের ভূমিকায় এলেন অভিনেতা হিউ গ্রান্ট। নিকোলাস ঠিক করলেন, অন্যান্য চরিত্রে ভারতীয় অভিনেতাদেরই নেবেন। সেই সূত্রেই যুক্ত হলেন শাবানা আজমি, সুপ্রিয়া পাঠক। যুক্ত হলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও।
এত কিছু সত্ত্বেও বলিউডের ময়দানে সেভাবে প্রায় দেখাই যায়নি সৌমিত্রকে। বাংলার প্রতি ভালবাসা, সিনেমা, নাটক এবং সাহিত্য জগত নিয়েই তিনি মেতেছিলেন। একেবারেই কি আসেননি হিন্দি সিনেমার জগতে? সেইভাবে দেখলে, দুটি হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ১৯৮৬ সালে বিজয় চ্যাটার্জির ‘নিরুপমা’ (রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প অনুসরণে) এবং ২০০২ সালে প্রশান্ত বলের ‘হিন্দুস্তানি সিপাহী’ (উৎপল দত্তের লেখা ফেরারি ফৌজ নাটক অবলম্বনে)। এই দুটি সিনেমার সঙ্গেও যুক্ত ছিল বাংলা আখ্যান। ‘নিরুপমা’ ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘দেনাপাওনা’র হিন্দি চিত্রনাট্য। আর সেই সিনেমাতেই অভিষেক হয়েছিল অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের। আর ‘হিন্দুস্তানি সিপাহী’র ক্যামেরার দায়িত্বে ছিলেন আরেক অভিনেতা ভিক্টর ব্যানার্জি।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রস্থানটি অত্যন্ত বেদনার হলেও আবির্ভাবটিও সিনেমার মতোই নাটকীয়। ১৯৫৮ সালে সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘জলসাঘর’ সিনেমার শুটিং করছিলেন। সেই শুটিং দেখার জন্য যান সৌমিত্র। তিনি তখনও জানতেন না, সত্যজিৎ রায় তাকে বিখ্যাত অপু চরিত্রের জন্য নির্বাচিত করে রেখেছেন। সেদিন শুটিং সেট থেকে চলে যাওয়ার সময় সৌমিত্রকে ডাক দেন সত্যজিৎ রায়। তারপর অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের কাছে গিয়ে বলেন, ‘ও হচ্ছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, আমার পরবর্তী সিনেমায় অপুর চরিত্রে অভিনয় করবে’।