সেলুলয়েডে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা শুধুই চরিত্র নয়, সময়কেও ধরে রাখে। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত যখন বেলা দে’র ভূমিকায় প্রথমবার পর্দায় ধরা দিলেন, যেন একই সঙ্গে নাড়া পড়ল বাঙালির এক চেনা অতীতে—এক ধীর, সংযত, অথচ উজ্জ্বল সময়ের।

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত যখন বেলা দে
শেষ আপডেট: 18 July 2025 11:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেলুলয়েডে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা শুধুই চরিত্র নয়, সময়কেও ধরে রাখে। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত যখন বেলা দে’র ভূমিকায় প্রথমবার পর্দায় ধরা দিলেন, যেন একই সঙ্গে নাড়া পড়ল বাঙালির এক চেনা অতীতে—এক ধীর, সংযত, অথচ উজ্জ্বল সময়ের।
সাদামাটা সুতির শাড়ি, ছোট্ট টিপ, লম্বা বিনুনি আর কানে রেডিওর বড় হেডফোন—এমন সাজে যে নারীকে দেখা গেল, তিনি শুধুমাত্র একজন অভিনেত্রীর চরিত্রের লুকে আসা নন, তিনি যেন হয়ে উঠলেন এক জীবন, এক সংগ্রাম, এক অনুপ্রেরণা।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যে অভিনেত্রী একাধিকবার নিজেকে ভেঙে গড়েছেন, কখনও প্রেমিকা, কখনও যোদ্ধা, কখনও গৃহিণী, কখনও নেতা—তিনি এবার হয়ে উঠেছেন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলার সেই নারী, যিনি সময়ের আগে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন এক বহুমাত্রিক পরিচয়ে। রান্নার দিদিমণি, লেখিকা, রেডিও উপস্থাপক, সরকারি আধিকারিক, এমনকি কার্টুনিস্ট—বেলা দে ছিলেন এক অসাধারণ বৈচিত্র্যের প্রতীক।
পরিচালক অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ছবি ‘বেলা’ ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই সময়ের গল্পে, যেখানে একজন নারীর জীবনের বাঁধা ছিল না কোনও সীমায়, বরং ছড়িয়ে দিয়েছিলেন আলো, সুগন্ধ আর শব্দের মাধুর্য্যে। এই চরিত্রেই এখন ঋতুপর্ণা, যাঁর অভিনয় ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। পরিচালকের কথায়, ‘এই চরিত্রের জন্য ও ছাড়া আর কাউকে ভাবাই যেত না।’
ছবিতে দেখা যাবে বেলা দের দুই দাদার চরিত্রে পদ্মনাভ দাশগুপ্ত এবং দেবদূত ঘোষকে, আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর চরিত্রে রয়েছেন দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত। এ ছাড়াও আছেন ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়, বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়, সৌরভ চক্রবর্তী, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, ভদ্রা বসু প্রমুখ। প্রযোজনায় ‘গ্রেমাইন্ড কমিউনিকেশন’।

প্রায় দেড় মাস ধরে কলকাতার অলিতে-গলিতে চলছে শুটিং, নিঃশব্দে, নির্জনে, যেন সময়ের ভার যেন নিজেই বলে দিতে চায়—এই গল্পটি আসলেই পরিচালকের মনের কেন্দ্রবিন্দুতে। বেলার জীবন শুধুই রান্না নয়, তাঁর রন্ধন ছিল শিল্প, তাঁর লেখা ছিল ইতিহাসের চিহ্ন। ‘রান্নার অমনিবাস’, ‘হেঁশেল’, ‘সহস্র এক রান্না’, ‘বাঙালির রান্নাঘর’ কিংবা ‘টিফিনের টুকিটাকি’—এগুলো শুধু রেসিপি বই নয়, এ ছিল এক নারীর সমাজের সঙ্গে কথোপকথন। তাঁর রান্নায় ছিল মায়ের মতো মমতা, আর লেখায় ছিল স্বাধীনচেতা কণ্ঠ।
এই চরিত্রটি এমনই এক শক্তিশালী নারী, যিনি সব প্রতিকূলতা, সমাজের চাপ, পুরুষতান্ত্রিক চোখ রাঙানো উপেক্ষা করে নিজের পথ গড়ে নিয়েছিলেন। অথচ সেই মানুষটিকেই অন্ধকারে কাটাতে হয়েছিল জীবনের শেষ অধ্যায়ে। এই ট্র্যাজেডিই যেন এক গভীর আবেগে রাঙিয়ে দেয় গল্পকে।
ছবির অনেকটা অংশ জুড়েই থাকবে রান্না। নায়িকা নিজেও জানিয়েছেন, ‘রান্না করতে ভালোবাসি, কিন্তু সময় পাই না।’ তবে এই চরিত্রের মাধ্যমে যে রান্নার চেয়েও অনেক বেশি কিছু তুলে ধরা হবে, তা স্পষ্ট। ছবিটি মুক্তি পেতে চলেছে আগামী ২৯ অগস্ট। এক সাদামাটা নারীর গল্প, যে আসলে ছিল এক বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি—এই ছবি শুধুই চোখে দেখার নয়। আসলে, সবটা হারিয়েও শেষ পর্যন্ত কিছু না কিছু থেকে যায়। থেকে যায় কিছু স্বাদ, কিছু শব্দ, আর একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধ আলো।